বৃহস্পতিবার,

২২ জানুয়ারি ২০২৬

|

মাঘ ৮ ১৪৩২

XFilesBd

মুক্তারের রাজ্যে সবাই বোবা

শ্যামলাপুর ভূমি অফিসের সাথে ভূমিদস্যুদের বন্ধুত্ব এখন তুঙ্গে

প্রকাশিত: ০২:৫৬, ২২ জানুয়ারি ২০২৬

শ্যামলাপুর ভূমি অফিসের সাথে ভূমিদস্যুদের বন্ধুত্ব এখন তুঙ্গে

সাভারের শ্যামলাপুর এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে ‘মুক্তার কোম্পানি’ এখন এক আতঙ্কের সমার্থক শব্দ। এলাকার অঘোষিত অধিপতি এই মুক্তার হোসেনের ক্ষমতার দাপটে তটস্থ প্রান্তিক জনপদ থেকে শুরু করে বাইরে থেকে আসা সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও। অনুসন্ধান বলছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এই ভূমিদস্যুতার সিন্ডিকেট এতটাই ভয়ংকর যে, এখানে জমির মালিকানা টিকে থাকা না থাকা নির্ভর করে মুক্তারের মর্জির ওপর। বিশেষ করে সাভারের বাইরের কোনো ব্যক্তি যদি এই অঞ্চলে একখণ্ড জমি কেনেন, তবে তাঁর জন্য অপেক্ষা করে এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। জমি রক্ষা করতে হয় মুক্তারকে মোটা অংকের চাঁদা দিতে হবে, না হলে সেই জমি ফেলে রেখে নিঃস্ব হয়ে পালিয়ে যেতে হবে—এমনই এক অলিখিত নিয়ম জারি হয়েছে শ্যামলাপুরে।

মুক্তারের এই রাজত্ব পরিচালনার প্রধান হাতিয়ার এখন রাজনৈতিক পরিচয়। ক্ষমতার পালাবদলে নিজেকে বিএনপির লোক পরিচয় দিয়ে তিনি স্থানীয় পর্যায়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। দলটির নাম ভাঙিয়ে তিনি দেদারসে দখলবাজি ও চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছেন, যা খোদ দলের ভাবমূর্তিকেও সংকটে ফেলছে। তবে মুক্তারের এই দাপট একক প্রচেষ্টায় নয়, বরং তাঁর পেছনে রয়েছে সাভার ভূমি অফিসের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর শক্তিশালী যোগসাজশ। বিশেষ করে নামজারি বা মিউটেশন নিয়ে এক অভিনব জালিয়াতির জাল বুনেছেন তিনি। অনুসন্ধানে দেখা যায়, শ্যামলাপুর এলাকার একটি জমির নামজারি দুই বছর আগে বৈধভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরও সম্প্রতি সেই নামজারির বিরুদ্ধে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘রিভিউ’ আবেদন করা হয়েছে। মূলত জমির প্রকৃত মালিককে হয়রানি ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতেই এই চাল চালা হয়েছে।

এই ভূমি দস্যুতার নেপথ্য কারিগর হিসেবে আঙুল উঠেছে সাভার ভূমি অফিসের কাননগোর দিকে। এ ব্যাপারে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, উপর মহলের অনুমতি ছাড়া কোন সাংবাদিকের সাথে তিনি কথা বলবেন না। উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি স্পষ্ট জানান, কানুনগোর কোন অপরাধের দায়ভার তিনি নিবেন না। এসি ল্যাণ্ডকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, জমির কাজে নানান পক্ষের সমস্যা থাকে। সবকিছু না শুনে বক্তব্য দেয়া যাবে না।  

অভিযোগ রয়েছে, মুক্তারের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে তিনি সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের সাথে চরম অপেশাদার আচরণ করেন। ভুক্তভোগী যখন তাঁর জমির নামজারির বিষয়ে খোঁজ নিতে ভূমি অফিসে যান, তখন প্রতিকারের বদলে কাননগোর মুখ থেকে শুনতে হয় বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য। তিনি ভুক্তভোগীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “মানুষের বালিশের নিচের জায়গাই তো থাকে না, আর আপনি ঐখান থেকে শ্যামলাপুরে কেন জমি কিনতে আসছেন?” সরকারি দপ্তরে বসে এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন মন্তব্য মূলত মুক্তার কোম্পানির প্রতি তাঁর প্রত্যক্ষ সমর্থনেরই বহিঃপ্রকাশ। একজন জমির মালিক তাঁর পছন্দের এলাকায় কেন জমি কিনলেন, সেই কৈফিয়ত চাওয়ার মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয় যে, সাভারের এই জনপদে সরকারি আইন নয় বরং মুক্তারদের ইচ্ছাই শেষ কথা। শ্যামলাপুরের সাধারণ মানুষের দাবি, মুক্তার কোম্পানির এই আগ্রাসন ও ভূমি অফিসের যোগসাজশ অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক ছত্রছায়া ব্যবহার করে যারা সাধারণ মানুষের রক্তে ভেজা জমি গ্রাস করতে চায় এবং সরকারের দায়িত্বশীল আসনে বসে যারা তাদের ইন্ধন জোগায়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এই অঞ্চল পুরোপুরি জনশূন্য বা অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে। মুক্তারের এই ভূমিদস্যুতার জাল এতটাই গভীরে যে, প্রশাসন কঠোর না হলে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়টুকুও এই সিন্ডিকেটের পেটে চলে যাবে। পুরো ব্যাপারটি নিয়ে মুক্তারের একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা কিরেও ব্যর্থ হয়েছে আমাদের সংবাদদাতা। বারংবার তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। এমনকি ফোনে কথা বলার চেষ্টা হলে তিনি কোন কিছু বলবেন না-এমন কথা বলেন।