ঢাকার কেরাণীগঞ্জে দেওয়ান পরিবারের সুপ্রাচীন আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য অনুযায়ী পীরে কামেল দরবেশ হযরত আলেপচান শাহ (রহ.)-এর ৯৯তম পবিত্র ওরশ মোবারক ও সাধু সঙ্গ শুরু হয়েছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি অধিবাসের মধ্য দিয়ে নাগদা, বামুনসুর এলাকার দেওয়ান বাড়ি দরবার শরীফে বর্ণিল এই আয়োজনের উদ্বোধন হয়। পুরো অনুষ্ঠান তত্ত্বাবধান করছেন দরবার শরীফের খাদেম ও জনপ্রিয় বাউল শিল্পী আরিফ দেওয়ান।
আজ দুপুরে মাজার শরিফের স্নান ও পরিচ্ছন্নতার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। বিকেল গড়াতেই দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও ভারত, নেপাল ও মধ্যপ্রাচ্যের নানা প্রান্ত থেকে আগত ভক্তদের ভিড়ে দরবার প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে। সন্ধ্যায় কয়েক হাজার মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ইফতার মাহফিল ওরশকে ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করে।
আয়োজক সূত্রে জানা যায়, ওরশ উপলক্ষে দেশ–বিদেশের বহু গুণী শিল্পী, বাউল সাধক, পীর-মাশায়েখ ও সুফি দর্শনের গবেষকেরা ইতোমধ্যে উপস্থিত হয়েছেন। আরিফ দেওয়ানের অসংখ্য ভক্তও দিনভর দলে দলে দরবার শরীফে সমবেত হচ্ছেন।
ওরশের অন্যতম আকর্ষণ বাউল সঙ্গীত পরিবেশনা আজ মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু হয়ে আগামীকাল বুধবার রাতভর চলবে। দেশের খ্যাতিমান মরমি শিল্পীরা ধারাবাহিকভাবে গান পরিবেশন করবেন। আয়োজকদের ভাষ্য, বাউল সঙ্গীতের মাধ্যমে মানবতা, প্রেম, সহিষ্ণুতা ও আধ্যাত্মিক চেতনার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া ওরশের অন্যতম উদ্দেশ্য।
দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে সেহরি ও ইফতারের বিশেষ ব্যবস্থাসহ পুরো এলাকা জুড়ে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ব্যবস্থা। স্বেচ্ছাসেবীরা সার্বক্ষণিকভাবে দর্শক-শ্রোতাদের সহায়তা করছেন। বিভিন্ন স্টল, আলোকসজ্জা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন ঘিরে দরবার এলাকা এখন উৎসবের আবহে মুখর।
আলোচনা পর্বে খ্যাতিমান বক্তারা বাউলবাদ, সুফিবাদ ও হযরত আলেপচান শাহ (রহ.)-এর জীবনদর্শন নিয়ে বক্তব্য দেন। তারা বলেন, মানবকল্যাণ, সত্যের অনুসন্ধান ও পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ—এই দর্শনই হযরতের শিক্ষা।
দেওয়ান বাড়ি দরবার শরীফ কর্তৃপক্ষ জানায়, ভক্ত-অনুরাগীদের ঢল সামলাতে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হয়েছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতাও রয়েছে। আগামী দুই দিন ওরশকে ঘিরে আরও বেশি ভক্তের আগমন প্রত্যাশা করছে দরবার কর্তৃপক্ষ।

এ ব্যাপারে জাতীয়তাবাদী বাউল দলের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম বলেন, ভক্তদের সকল সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে সাধু সঙ্গে। ইতোমধ্যে প্রশাসনকেও অবহিত করা হয়েছে। কোন ধরণের মৌলবাদী রক্তচক্ষু ও হেনস্থার শিকার যেনো কোন সাধু মোহন্ত শিল্পী সাধক না হন তারজন্য সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে ইঞ্জিনিয়ার রেজাউল ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, বাউল ঘরানার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। সারাদেশে যে তাণ্ডব গেল কয়েকমাসে চলেছে তা পৃথিবীর কোথাও হয়নি। আমরা এখন থেকে সরকারের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে চিহ্নিত দু:শমনদের মোকাবেলা করব। বিভিন্ন সরকারের সময় আমরা বাউলদের নিগৃহিত হতে দেখেছি। কিন্তু আর নয়। সাধুর গায়ে আর একটি আঁচড় লাগতে দেয়া হবে না। আর কোন মাজার শরিফ পুড়তে দেয়া হবে না। কোন বাউলের চুল কাটা দূরে থাক ফুলের টোকাও যেনো ধর্মব্যবসায়ীরা দিতে না পারে তার সকল ব্যবস্থা আমরা করেছি। জাতীয়তাবাদী বাউল দল মানবতাবাদের শক্তিশালী এক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পৃথিবীর সকল ধর্মের সকল মানুষকে আমরা মূল্যায়ন করি যুক্তি ও শ্রদ্ধাবনত চিত্তে।
