এক শব্দ-ব্রহ্মের মেলায় পেয়েছিল ধানমণ্ডি ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জ। যান্ত্রিক ঢাকা যখন ক্লান্তিতে ঘরমুখো, ঠিক তখনই ‘ধানমণ্ডি আড্ডা’র ১৫তম আসর মুখর হয়ে ওঠে গভীর এক তাত্ত্বিক এবং কাব্যিক জিজ্ঞাসায়। যার সারসত্তা ‘বাংলা গানের বাণী ও এর সাহিত্যমূল্য’। সুরের রেশ কি শুধুই কানের পর্দা ছুঁয়ে ফিরে যায়, নাকি শব্দের কারুকাজ তাকে পৌঁছে দেয় সাহিত্যের অমোঘ সিংহাসনে-তাও তর্কের খাতিরে ছুঁয়ে যায় আগত শ্রোতার মন।

এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে রোববার ধানমন্ডি আড্ডার পুরো আয়োজন।
অনুষ্ঠানের মূল সুরটি ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ-গান যখন কানে ঢোকে, তখন তা সুরের মূর্ছনায় মন দোলায়; কিন্তু সেই গান যখন মনে গিয়ে বাজে, তখন তা হয়ে ওঠে শব্দ বা বাণীর কারুকার্য।

বক্তাদের আলোচনায় উঠে এসেছে এক অমোঘ সত্য, বাংলা গানের বাণী কেবল লিরিক্স নয়, তা কবিতারই এক অবিকল্প রূপ। চর্যাপদের সেই প্রাচীন পদাবলি থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথের নান্দনিক দর্শন কিংবা নজরুলের দ্রোহী উচ্চারণ-সবখানেই গানের প্রতিটি কলি একেকটি শিল্পোত্তীর্ণ সাহিত্যের অংশ।

বক্তারা বিশদ ব্যাখ্যায় দেখিয়েছেন, কীভাবে রূপক ও চিত্রকল্পের মাধ্যমে গানের ভাষায় জীবনের গভীরতম বোধ-প্রেম, কষ্ট, বেদনা আর প্রতিবাদ মূর্ত হয়ে ওঠে। আমাদের বাংলাসাহিত্য যে আজ বিশ্ব দরবারে সগৌরবে আসীন, তার অন্যতম প্রধান সারথি তো রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’, যা মূলত গানেরই এক সংকলন।

আড্ডার মধ্যমণি সুমন সরদার তাঁর উপস্থাপিত প্রবন্ধে বাংলা গানের আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর প্রায় ১৮ হাজার শব্দের সুবিশাল গবেষণালব্ধ প্রবন্ধটির আংশিক পাঠে মুগ্ধ হয়েছেন উপস্থিত শতাধিক সাহিত্যিক ও সুধীজন।

তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে লোকগানের গূঢ় দর্শন থেকে শুরু করে আধুনিক গানের সরাসরি জীবনমুখী প্রশ্নের কথা।

অনুষ্ঠানের সভাপতি আহমাদ মাযহার এবং আলোচক কবি আমিনুল ইসলাম গানের এই সাহিত্যিক স্থায়িত্ব নিয়ে মূল্যবান পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। বরাবরের মতো ধানমন্ডি আড্ডা সঞ্চালনা করেন সংগঠনের হরফুনমৌলা হিসেবে পরিচিত সাধারণ সম্পাদক নূর কামরুন নাহার।

তাঁর নিপুণ গাঁথুনিতে আলোচনা পূর্বাপর প্রাণবন্ত রূপ পায়। পুরো আনুষ্ঠানিকতায় নতুন মাত্রা দান করেন ধানমন্ডি আড্ডার প্রাণপুরুষ তথা সভাপতি বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী লেখক কবি ও শব্দঘর সম্পাদক ডা. মোহিত কামাল।

তীব্র যুক্তি আর পাল্টা যুক্তিতে আড্ডাটি হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত বিতর্কসভা। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, সুর ছাড়া কি গান বাঁচে? উত্তরটি মিলেছে আলোচনা থেকেই-গান যদি সুর ছাড়াও বেঁচে থাকে, তবে তার সেই অবিনশ্বর সত্তাটিই হলো সাহিত্য। সুরের রেশ হয়তো একসময় স্তিমিত হয়ে যায়, কিন্তু গানের যে লাইনটি মানুষের মনে চিরস্থায়ী বসতি গড়ে তোলে, কোনো এক হারানো বিকেলের স্মৃতি বা প্রিয় মানুষের মুখ ফিরিয়ে আনে, সেটিই মূলত গানের সাহিত্যিক সার্থকতা।

শতাধিক সৃজনশীল মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটিকে এক অনন্য উচ্চতা দান করেছে। ধানমণ্ডি ক্লাবের হলরুম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠেছিল প্রাণের টানে। শেষে একটি সারকথা সবার মনে গেঁথে গেছে-ভালো গানের বাণী মানেই এক অনন্য কবিতা। সুর ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু সেই সুরের নৌকায় চড়ে যে শব্দগুলো মানুষের হৃদয়ে থেকে যায়, তা-ই সাহিত্যের স্থায়ী সম্পদ।

কথার পিঠে কথা জমিয়ে, শেষ হয়েও না হওয়া এক তৃপ্তি নিয়ে শেষ হলো এই আয়োজন, যা আগামীর জন্য রেখে গেল নতুন কোনো জিজ্ঞাসার বীজ। এবারের আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন- আব্দুল হালিম, কবির হুমায়ন, আহমাদ মাযহার, শামীম আমিনুর রহমান, আমিনুল ইসলাম, রোকসানা পারভীন, রেজিনা খন্দকার, শরাবান তহুরা, সুমন সরদার, ড. তপন বাগচী, হামিদুর রহমান, হরমিত বালা, কামরুল হাসান, মাহবুব হক নীলা, নিগার সুলতানা, আফরোজা ছিদ্দিকী, দিলারা মেসবাহ, শিশির বন্ধু, মালিহা ত্বিষা, ড. শামীম আরা, নাহিন শিল্পী, রফিকুল আজিজ, ফরিদা ইয়াসমিন, অসিত আচার্য, মতিন রায়হান, ইকবাল মিয়াজী, সৈয়দা নাজনীন আখতার, তন্ময় হারিস, ড. গোলাম মোস্তফা, এম রফিক, রানা জামান, রমজান মাহমুদ, শওকত হোসেন চৌধুরী, জুয়েল আচার্য্য, প্রিয়াংকা আচার্য্য, মো: আল আমিন, ফয়সাল চৌধুরী, শামীম আহমদ, ডা: ইশরাত শিল্পী, হোসেন আব্দুল মান্নান, আশফাকুজ্জামান, শামছুর রহমান, গোলাম ফারুক, প্রফেসর মো. আবু জাফর, কাজী ফারজানা হক, মো: মঞ্জুরুল আলম, আঁখি সিদ্দিকা, দীপা আফ্রিদি, টোটন চন্দ্র দাস, কবিতা কস্তা, ইয়াসমীন আফরীন লিজা, মো: আব্দুল মান্নান, সুজন বড়ুয়া, সবুজ খান, মাহফুজা হিলালী, বিশিষ্ট কবি নাসির আহমেদ, উম্মে সালমা, কামাল খান, তজিরুল ইসলাম, মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, মাহবুব ফারুক, শ্যামলি খান, সাগর, মো: আব্দুর রাজ্জাক, অরুণিত ভোর, রীমা চিশতি, পারভীন সুলতানা, আনিস রহমান, নাসরিন আকতার, চন্দ্রশিলা ছন্দা, অনমিক ত্রিপুরা, মিলা মাহফুজা, দিলরুবা আক্তার কলি, ওয়াহিদ মুরাদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এ বি এম শাহ আলম, শরীফ খান দীপ, মাহফুজা আকতার, নদিব রহমান অর্ক, জাহিদ নূর, মামুন খান, গুলজার, রুম্মান, মারুফ জাহান মুক্তি, মুশতারী বেগম, ড. নাঈমা খানম, শরীফ লুৎফর রহমান, সুমাইয়া আজিজ, দন্তস্য রওশন, ইসরাত শিউলি, মাসুদ মনিরুল, মেহতাজ নূর প্রমুখ।

