রোববার,

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

|

ফাল্গুন ২ ১৪৩২

XFilesBd

সমালোচনার শেষ নেই বামেদের

বামরাজনীতির দিন কী শেষ হতে বসেছে বাংলাদেশে

শিউলী সিকদার

প্রকাশিত: ০৫:৩৪, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বামরাজনীতির দিন কী শেষ হতে বসেছে বাংলাদেশে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে এসে বর্তমান নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বামপন্থী দলগুলো আজ এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। একসময়ের তুখোড় ছাত্র আন্দোলন, শ্রমিক রাজনীতি আর বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত এই রাজনৈতিক ধারাটি কেন আজ জনবিচ্ছিন্নতার অতলে তলিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাংলাদেশের বামপন্থার এই পতনের মূলে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী আদর্শিক বিভাজন, কৌশলী রাজনীতির অভাব এবং জনগণের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে ব্যর্থতা। ষাট ও সত্তরের দশকে যে বামপন্থীরা এ দেশের স্বাধিকার আন্দোলনে মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছিল, কালক্রমে তারা শতধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। মস্কোপন্থী, পিকিংপন্থী কিংবা নকশালবাড়ী আন্দোলনের প্রভাবে তারা নিজেদের মধ্যেই এমন এক তাত্ত্বিক যুদ্ধে লিপ্ত হয় যে, সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির লড়াইয়ের চেয়ে তাদের কাছে ‘কার্ল মার্ক্স’ বা ‘মাও সেতুং’-এর দর্শনের ব্যাখ্যাই মুখ্য হয়ে ওঠে। এই তাত্ত্বিক জটিলতা সাধারণ গ্রামীণ ও নগরীর শ্রমজীবী মানুষকে তাদের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

বাম দলগুলোর বর্তমান বিতর্কিত অবস্থানের একটি বড় কারণ হলো গত দেড় দশকে তাদের রাজনৈতিক মিত্রতা। বিশেষ করে জাসদ (ইনু), ওয়ার্কার্স পার্টি ও সাম্যবাদী দলের মতো বড় বাম দলগুলো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অংশ হয়ে ক্ষমতার স্বাদ নিতে গিয়ে নিজেদের মৌলিক চারিত্র্য হারিয়ে ফেলে। রাজপথের বিরোধী শক্তি হিসেবে পরিচিত এই দলগুলো যখন সরকারের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের নিঃশর্ত সমর্থন দিতে শুরু করে, তখন সাধারণ মানুষের চোখে তারা ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় অনেক বাম নেতার বিতর্কিত ভূমিকা এবং জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া তাদের রাজনৈতিক কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। অন্যদিকে, সিপিবি বা বাসদ-এর মতো দলগুলো জোটে না গেলেও তারা বিকল্প শক্তি হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের কর্মসূচিগুলো কেবল প্রেস ক্লাব বা শাহবাগের নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে, যা তৃণমূলের ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি।

আরেকটি গভীর বিতর্কিত বিষয় হলো বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সঙ্গে বামপন্থীদের দূরত্ব। ধর্মকে ‘আফিম’ হিসেবে গণ্য করার মার্ক্সবাদী তত্ত্বকে তারা এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের সামনে যেভাবে উপস্থাপন করেছে, তাতে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী তাদের ওপর ‘নাস্তিক্যবাদে’র তকমা সেঁটে দিয়েছে। এই সুযোগটি দক্ষিণপন্থী ও রক্ষণশীল দলগুলো সুনিপুণভাবে ব্যবহার করেছে। আধুনিক বিশ্বের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারা এবং পুরোনো আমলের ‘বিপ্লবী’ স্লোগান নিয়ে পড়ে থাকা তাদের আরও সেকেলে করে তুলেছে। বর্তমান প্রজন্মের তরুণ ভোটাররা, যারা কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অধিকার নিয়ে সচেতন, তাদের কাছে বামপন্থীদের পুরোনো ধাঁচের রাজনীতি কোনো আবেদন তৈরি করতে পারেনি। ২০২৬-এর এই চ্যালেঞ্জের নির্বাচনে বাম দলগুলোর ভরাডুবি প্রমাণ করে যে, কেবল তাত্ত্বিক বুলি দিয়ে রাজনীতি টেকানো সম্ভব নয়। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও জনআকাঙ্ক্ষার নতুন যে জোয়ার দেশে বইছে, সেখানে বামপন্থীরা আজ এক দিশেহারা নাবিকের মতো। যদি তারা আমূল সংস্কার ও নতুন প্রজন্মের চাহিদাকে ধারণ করতে না পারে, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে তাদের নাম কেবল ইতিহাসের পাতায় বা সেমিনারের আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।