জ্ঞানেই মুক্তি, আগামীর ভিত্তি—এই দৃপ্ত স্লোগানকে সামনে রেখে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস উপলক্ষ্যে এক প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে পালিত হলো সম্মিলিত পাঠাগার আন্দোলনের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। গত ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার জাতীয় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে বিকেল ৫টায় এই আয়োজনের সূচনা হয়। অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ছিল পাঠাগার আন্দোলনের গুরুত্ব জনমানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তৃণমূল পর্যায়ের পাঠাগারগুলোর সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে নীতিনির্ধারণী আলোচনা করা। সেমিনার, সাহিত্যপাঠ এবং মিনি বইমেলার সমন্বয়ে সাজানো এই আয়োজনটি লেখক, গবেষক ও পাঠাগার সংগঠকদের এক মহামিলনমেলায় পরিণত হয়।

অনুষ্ঠানের মূল সেমিনারে কবি, প্রাবন্ধিক ও প্রকাশক সৈকত হাবিব “গ্রামে গ্রামে কেন পাঠাগার প্রয়োজন” শীর্ষক একটি সময়োপযোগী প্রবন্ধ পাঠ করেন। প্রবন্ধে তিনি আধুনিক ডিজিটাল যুগেও গ্রামীণ জনপদে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে পাঠাগারের অপরিহার্যতার কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, একটি পাঠাগার কেবল বই সংগ্রহের স্থান নয়, বরং তা একটি এলাকার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিবর্তনের প্রাণকেন্দ্র।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরেণ্য কথাসাহিত্যিক, মনোশিক্ষাবিদ ও শব্দঘর সম্পাদক ডা. মোহিত কামাল। তিনি তার বক্তব্যে পাঠাগারের মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন, সুস্থ ও মানবিক প্রজন্ম গঠনে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। পাঠাগার একটি মানুষকে অন্ধত্ব ও সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি দেয়। উপস্থিত শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, হালজমানার শিশু শিক্ষার্থীদের আচরণ খুবই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। মোবাইল তাদেরকে গ্রাস করেছে। এখনই সময় মোবাইল আক্রান্ত শিশু কিশোরদের খুব সাবধানে এই নেশা থেকে বের করে নিয়ে আসা। এর জন্য সর্বপ্রথম বাবা মাকে সচেতন হতে হবে এবং শিশুদের বইয়ের সঙ্গে নিবিষ্টচিত্তে বেঁধে ফেলতে হবে।

উল্লেখ্য, ডা. মোহিত কামাল যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো দর্শকেরা তাঁর কথা শুনছিলেন। কারণ আধুনিক সমাজে শিশু ও কিশোরেরা কিভাবে বেড়ে উঠতে পারে তার আদ্যোপান্ত সিাজেশান আকারে তিনি উপস্থাপন করেন। এমনকি শিশু কিশোরদের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলির গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন তিনি।

সম্মিলিত পাঠাগার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক জুলিয়াস সিজার তালুকদারের শুভেচ্ছা বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই আয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গুণীজন আলোচনায় অংশ নেন। বক্তাদের বৈচিত্র্যময় পেশাগত অবস্থান আলোচনার গভীরতা বৃদ্ধি করে। লেখক ও জিরো-কার্বন এনার্জি সিস্টেম স্পেশালিস্ট ড. মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাসেল প্রযুক্তিনির্ভর যুগে পাঠাগারের আধুনিকায়ন নিয়ে কথা বলেন। ইউরোপ ও আমেরিকার লাইব্রেরির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শিশুদের হাতে মোবাইল তুলে না দেয়ার বিনীত আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে মিডল ইস্টের রাষ্ট্রগুলোতে ছাত্র ছাত্রীদের কিভাবে বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করাতে বাবা মা কোন পদ্ধতি অবলম্বর করেন তাও বর্ননা করেন পেট্রোলিয়াম মাইনিং সোলার ও জিরো কার্ব কার্বন এনার্জি সিস্টেম স্পোলিস্ট।

কথাসাহিত্যিক ও ্উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক পরিচালক ড. আনিস রহমান তাঁর নিবিড় পর্যবেক্ষন তুলে ধরেন। তাঁর দাবি গ্রামীণ পাঠাগার এখনো সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম সহায়ক। কিন্তু দিন দিন যেভাবে এটি বিলুপ্ত হতে বসেছে তাতে চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লেখক-গবেষক ও প্রকাশক মোস্তফা সেলিম প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে পাঠাগারের নিবিড় সম্পর্কের দিকটি উন্মোচন করেন। এ ব্যাপারে তিনি তাঁর এলাকা বৃহত্তর সিলেট বিশেষকরে সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় কিভাবে গ্রামীণ পাঠাগার বিস্তৃতি লাভ করেছে তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

পেশায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা হলেও আন্তরিকতার সঙ্গে লেখন কবিতা ও গল্প। তিনি আর কেউ নন শিহাব আব্দুল্লাহ। কবি শিহাব আব্দুল্লাহ এবং বিশিষ্ট কবি ও চারু শিল্পী শিশির মল্লিক পাঠাগারের নান্দনিক দিক নিয়ে আলোকপাত করেন, আর কবি ও চিন্তক আলমগীর খান বইকে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করেন।
একুশে টেলিভিশনের বিদায়ী প্রধান বার্তা সম্পাদক কবি ও গবেষক ড.. অখিল পোদ্দার মনে করেন, ভিআইপিরা জেলখানায় গিয়ে বেশ বই পড়েন কিন্তু মন্ত্রী এমপি থাকতে পাঠাগার আন্দোলনকে বেগমান করেন না। গ্রামের পর গ্রাম ডুপ্লেক্স বাড়ি হচ্ছে রেমিটেন্সের টাকায় কিন্তু তাদের কেউই পাঠাগারের জন্য ডোনেশান দেন না। ড. অখিল পোদ্দারের দাবি, বাংলার আদি সংস্কৃতি রক্ষায় গ্রাম পাঠাগার অনন্য অকৃত্রিম ও অনবদ্য। এ ব্যাপারে তিনি রংপুরের একটি গ্রামের পাঠাগার পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। যখন তাঁর সঙ্গী ছিলেন কবি লেখক ও প্রাবন্ধিক সৈকত হাবিব।

তথ্যপ্রবাহের এই যুগে সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রন্থাগারের ভূমিকা ব্যাখ্যা করেন। কবি ও শিক্ষক আয়েশা জাহান নূপুর শিক্ষার্থীদের পাঠাগারমুখী করার কৌশলের কথা বলেন এবং এডভোকেট মুজিবুল হক চট্টগ্রাম বিভাগের পাঠাগার আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। মিস্টার হক মনে করেন, গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন হতে পারে জাতীয় আন্দোলনের মতো। কারণ এটি একটি পবিত্র কাজ।

সম্মিলিত পাঠাগার আন্দোলনের সভাপতি আবদুস সাত্তার খানের অনুষ্ঠানে চেয়ারের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি প্রত্যন্ত গ্রামে পাঠাগার আন্দোলনের বাধা ও সম্ভাবনার নানান অভিজ্ঞতা এবং চ্যালেঞ্জ উতরানোর বিষয়গুলি সম্পর্কে বলেন। টাঙ্গাইল জেলায় বসবাস করেও আবদুস সাত্তার খান কিভাবে এই আন্দোলনকে ধরে রেখেছেন সে বিষয়ে বিশেষভাবে আলোকপাত করেন কবি ও প্রকাশ সৈকত হাবিব।

ঢাকার জাতীয় শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তৃণমূল থেকে আসা পাঠাগার সংগঠকদের অংশগ্রহণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গ্রাম ও মফস্বল থেকে আসা সংগঠকরা তাদের কাজের অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন। তারা পাঠাগার পরিচালনায় আর্থিক সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবের মতো বিভিন্ন সমস্যার কথা সরাসরি তুলে ধরেন।

একইসাথে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ বৃদ্ধিতে তারা যে আশার আলো দেখছেন, সেই সম্ভাবনার দিকটিও আলোচনায় উঠে আসে।

সেমিনার শেষে সাহিত্যপাঠ এবং প্রাঙ্গণে আয়োজিত মিনি বইমেলা দর্শনার্থীদের মাঝে বিশেষ উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। সব মিলিয়ে ৫ ফেব্রুয়ারির এই আয়োজনটি বাংলাদেশে পাঠাগার আন্দোলনকে বেগবান করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

অনুষ্ঠানের পক্ষ থেকে ছোট আকারে বইমেলারও আয়োজন ছিল যেখানে অনেককেই দেখা গেছে বই ও পত্রিকা কিনতে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সম্মিলিত পাঠাগার আন্দোলনের সাংগাঠনিক সম্পাদক রহমান রায়হান।

