আকাশে ওঠার গল্প : ঈশ্বর, মানুষ ও সভ্যতার আত্মরক্ষা
মানুষ যখন প্রথম আকাশের দিকে তাকিয়েছিল, তখন সে দেবতাকে খোঁজ করেনি; সে খুঁজেছিল আশ্বাস। অনিশ্চিত পৃথিবী, ভাঙা নৈতিকতা আর মৃত্যুর অমোঘ ছায়ার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ বারবার অনুভব করেছে এই মাটি তাকে একা ধরে রাখতে পারছে না। তখনই জন্ম নিয়েছে আকাশে ওঠার গল্প, স্বর্গে যাওয়ার কাহিনি, আরোহণের মিথ। এগুলো কেবল ঈশ্বরের গল্প নয়, এগুলো মানুষের আত্মরক্ষার গান।
ভারতীয় স্বর্গলোক
ভারতীয় সভ্যতা এই গান গেয়েছে ভেতরের স্বরে। এখানে আকাশে ওঠা মানে আকাশে যাওয়া নয়, নিজের গভীরে নামা। নচিকেতা কোনো দেবলোকের সিঁড়িতে পা রাখেননি; তিনি দাঁড়িয়েছিলেন মৃত্যুর দরজায়। যমের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন সেই প্রশ্ন, যেটা সব সভ্যতার ভিত কাঁপিয়ে দেয়—মৃত্যুর পরে কী থাকে? যম তাঁকে কোনো আইন দেননি, কোনো আদেশ দেননি; তিনি দিয়েছিলেন জ্ঞানের আলো। নচিকেতার আরোহণ ছিল মৃত্যুভয়ের ঊর্ধ্বে ওঠা, যেখানে ঈশ্বর কোনো দূরবর্তী সিংহাসনে বসে থাকা শাসক নন, বরং চেতনার নীরব গভীরতা।
এই সভ্যতায় আরেকটি কাহিনি আছে, যেখানে ঈশ্বর আকাশে ওঠেন না, বরং জলে নামেন। প্রলয়ের সময় যখন বেদ হারিয়ে যায়, তখন বিষ্ণু মৎস্যরূপে অতল জলে অবতরণ করেন। এটি উল্টো দিকের আরোহণ—উপরে ওঠার বদলে গভীরে নেমে যাওয়া। এই কাহিনী বলে দেয়, সভ্যতার সবচেয়ে বড় বিপদ আইন হারানো নয়, জ্ঞান হারানো। আর জ্ঞান ফিরিয়ে আনতে ঈশ্বরকেও মানুষের মতোই গভীরে নামতে হয়।
সেমেটিক স্বর্গালোক
এরপর একদিন আকাশ আর শুধু অন্তরের প্রতীক থাকে না। ইয়াকুব স্বপ্নে দেখেন মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত এক সিঁড়ি। দেবদূতরা ওঠানামা করছে, আকাশ তখনো বন্ধ নয়। কোনো তালা নেই, কোনো পাহারা নেই। ঈশ্বর মানুষের খুব কাছে, আর মানুষ প্রশ্ন করতে ভয় পায় না। এই সময়ের আকাশ খোলা, বিশ্বাস নমনীয়, আর ঈশ্বরের ভাষা তখনো সংলাপের মতো।
ইরানীয় স্বর্গালোক
কিন্তু ইতিহাস চিরকাল কোমল থাকে না। ইরানের মাটি রক্তে ভিজে যায়, গ্রন্থ পুড়ে যায় আলেকজান্ডারের সন্ত্রাসে ;নৈতিকতা ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। তখন সমাজ নিজেই 'বিরাজ' নামের এক নীতিশ্রেষ্ঠ মানুষকে বেছে নেয়। তিনি নবী নন, দেবতাও নন, তিনি মানুষের প্রতিনিধি। তাঁকে পাঠানো হয় স্বর্গে, যেন তিনি দেখে আসেন সত্যিই কি ভালো ও মন্দের পার্থক্য আছে। তাঁর পাশে থাকেন স্রোশ(নৈতিক শৃঙ্খলার প্রতীক), আর আতর, (পবিত্র অগ্নির আলো)। বিরাজ ফিরে এসে কোনো নতুন শাসন আরোপ করেন না, তিনি শুধু বলেন—নৈতিকতা মিথ্যে নয়, অন্যায়ের পরিণতি ও প্রতিফল আছে। তাঁর আরোহণ ছিল ভেঙে পড়া সমাজের জন্য এক গভীর নৈতিক শ্বাস।
আরবীয় আসমান
সবশেষে আসে সেই সময়, যখন আকাশ আর গান গায় না, আকাশ আদেশ দেয়। আরবের মরুভূমিতে বিশৃঙ্খলা চরমে পৌঁছালে মুহাম্মদের মেরাজ ঘটে। তিনি স্বর্গে যান, কিন্তু ফিরে আসেন বিধান নিয়ে। এখানেই আরোহণ একটি নাটকীয় মোড় নেয় ,এটি আর শুধু অভিজ্ঞতালব্ধ থাকে না, হয়ে ওঠে আইন। এবং এই আইনের সঙ্গে সঙ্গে আসমানী উত্তরণ হয়ে ওঠে একটি ঐশ্বরিক উচ্চারণ"এটাই শেষ কথা" । আকাশ আর খোলা থাকে না, স্বর্গ হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের ভিত্তি।
এই সব কাহিনী একসঙ্গে শুনলে বোঝা যায়, ঈশ্বর বদলাননি। বদলেছে মানুষ, বদলেছে তার সভ্যতা। যখন মানুষ ভেতরে শান্তি খুঁজেছে, ঈশ্বর ছিল চেতনার গভীরে। যখন সমাজ নৈতিক ভাঙনের মুখে পড়েছে, ঈশ্বর হয়ে উঠেছে ন্যায়বিচারের সাক্ষী। আর যখন সভ্যতা টিকে থাকার জন্য শৃঙ্খলা চেয়েছে, ঈশ্বর রূপ নিয়েছে আইনে।আকাশে ওঠার গল্প তাই স্বর্গে যাওয়ার গল্প নয়। এটি পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার মানুষের নিরন্তর প্রচেষ্টা। মানুষ যখন আর কোনো আশ্রয় খুঁজে পায় না, তখন সে আকাশের দিকে তাকায় আর সেই তাকানোর মধ্যেই জন্ম নেয় সভ্যতার সবচেয়ে গভীর মিথ।
[তারিফ হোসেন বিশিষ্ট জনপ্রিয় শিল্পি, কবি, গল্পকার ও ভক্তিবাদের বিশিষ্ট আলোচক]
