শুক্রবার,

০৯ জানুয়ারি ২০২৬

|

পৌষ ২৫ ১৪৩২

XFilesBd

লালনের সুরে মানবের খোঁজের প্রত্যয়

জন্মদিনে ছাত্রছাত্রী ও শিল্পীদের ভালোবাসায় সিক্ত কাজল রেখা

ইউ এস অনন্যা

প্রকাশিত: ০৪:৫১, ৮ জানুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ০৪:৫৩, ৮ জানুয়ারি ২০২৬

জন্মদিনে ছাত্রছাত্রী ও শিল্পীদের ভালোবাসায় সিক্ত কাজল রেখা

বাংলার মাটি, নদী, বাতাস আর মানুষের দীর্ঘশ্বাসে যে সুর জন্ম নেয়লোকসংগীত তারই নাম। সেই সুরের ভেতর দিয়ে যুগে যুগে মানুষ নিজের পরিচয় খুঁজেছে, ঈশ্বরকে প্রশ্ন করেছে, ভালোবাসা আর বিচ্ছেদের ভাষা নির্মাণ করেছে। এই লোকসংগীতের ধারায় যাঁরা নিঃশব্দ সাধনায় নিজেদের উৎসর্গ করেছেন, কাজল রেখা তাঁদেরই একজন। তিনি কেবল একজন কণ্ঠশিল্পী ননতিনি লোকজ দর্শনের বাহক, লালনচিন্তার এক নিবেদিত সাধক।

৫ জানুয়ারি ছিল শিল্পী কাজল রেখার জন্মদিন। তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে মিরপুরের মেঘবরণী রেস্টুরেন্টে জড়ো হন শিল্পীর ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকেরা। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার বিশিষ্টজনেরা ফুল দিয়ে জনপ্রিয় শিল্পী কাজল রেখাকে বরণ করে নেন। শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে স্মৃতি চারণ করেন একুশে টেলিভিশনের বিদায়ী প্রধান বার্তা সম্পাদক ড. অখিল পোদ্দার, বিশিষ্ট কবি ও সংস্কৃতিকর্মী রেজাউল শাহ, কাওয়ালি শিল্পী আজাদ দেওয়ান মুক্তিসহ অন্যরা। অতিথিদের ভালোবাসা দিয়ে বরণ করে নেন শিল্পীর ছেলে অন্তর। অনুষ্ঠানে আগত কাজল রেখার শিল্পী বন্ধুরা সংগীত পরিবেশন করেন। নৃত্য করেন তাঁরই ছাত্রীবৃন্দ। সবমিলে জন্মদিনের অনুষ্ঠানটি ছিল বহুমাত্রিক তাল, লয় ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।

উল্লেখ্য, লোকসংগীতের বিস্তৃত পরিসরে কাজল রেখার নাম উচ্চারিত হয় বিশেষ মর্যাদায়- বিশেষত লালন সাঁইজীর বাণী পরিবেশনের ক্ষেত্রে। লালনের গান কেবল গাওয়া যায় নাতা অনুভব করতে হয়, উপলব্ধির গভীরতায় নামতে হয়। কাজল রেখার কণ্ঠে সেই উপলব্ধির স্পষ্ট ছাপ পাওয়া যায়। তাঁর কণ্ঠে লালনের গান শুনলে মনে হয়, শব্দগুলো শুধু সুরে বাঁধা নয়সেগুলো জীবনের প্রশ্ন হয়ে উঠে আসে, মানুষের অন্তর্গত দ্বন্দ্বকে স্পর্শ করে। কারণেই লোকসংগীতাঙ্গনে তিনি হয়ে উঠেছেনলালনের গানে এক অনন্য নাম

লোকসংগীতের প্রাণভূমি কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার পানটি গ্রামে তাঁর বাড়ি। এই অঞ্চল লালন সাঁইজীর স্মৃতি দর্শনে ঋদ্ধ। শৈশব থেকে এই মাটির গন্ধ, এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক আবহ কাজল রেখার শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে নির্মাণ করেছে। এখানকার মানুষ, তাদের জীবনসংগ্রাম, আচার-আচরণসবই তাঁর গানের ভিত গড়ে দিয়েছে।

কাজল রেখার সংগীতযাত্রার শুরুটা ছিল পারিবারিক আবহে। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। এই আগ্রহের প্রথম আলোকবর্তিকা ছিলেন তাঁর বাবাকবি সাঈদ আহমেদ। বাবার কাছেই তিনি গানের হাতে খড়ি নেন। তিনিই ছিলেন তাঁর একমাত্র সংগীত শিক্ষাগুরু। পিতা-কন্যার এই সম্পর্ক কেবল রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ নয়এটি ছিল শিল্প চেতনার এক গভীর সংযোগ। কবি পিতার কাছ থেকে পাওয়া শব্দের সংবেদনশীলতা আর সুরের অনুশীলনই কাজল রেখাকে পরিণত করেছে একজন ভাবনাশীল শিল্পীতে।

কেবল মঞ্চে বা একক পরিবেশনায় নয়, সংগীতের মূল্যায়নেও কাজল রেখা রেখেছেন নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর। ২০১৯ ২০২২ সালে মাছরাঙা টেলিভিশনের সংগীত বিষয়ক রিয়েলিটি শো ম্যাজিক বাউলিয়ানা-তে শিল্পী নির্বাচনে তিনি বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। লোকসংগীতের বিচারক হিসেবে তাঁর উপস্থিতি ছিল বিশ্বাসযোগ্য, সংযত প্রজ্ঞাপূর্ণ। নতুন শিল্পীদের কণ্ঠে তিনি খুঁজেছেন কেবল সুর নয়খুঁজেছেন আত্মার ডাক।

যদিও কোনো একরৈখিক পথ ধরে এগোয়নি তাঁর সংগীতজীবন। তিনি লোকগীতির পাশাপাশি আধুনিক গান, নজরুলগীতি রবীন্দ্রসংগীতে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছেন। বাংলা গানের প্রায় সব শাখায় তাঁর সাবলীল বিচরণ রয়েছে। তবে এই বহুমাত্রিক দক্ষতার মাঝেও তাঁর আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লোকসংগীত। যেন লোকগানই তাঁর শেকড়, আর অন্য সব ধারার গান সেই শেকড় থেকে ছড়িয়ে পড়া শাখা-প্রশাখা।

বর্তমানে তিনি গানের শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘদিনের সাধনা, অভিজ্ঞতা সংগীতবোধ দিয়ে তিনি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন গানের পাঠ। তাঁর কাছে গান মানে কেবল তাল-লয়ের চর্চা নয়গান মানে মানুষ হওয়া, মানুষকে বোঝা, জীবনের প্রতি দায়বদ্ধ হওয়া। শিক্ষার্থীদের তিনি শেখানগান গাওয়ার আগে গানকে ভালোবাসতে হয়, আর ভালোবাসার আগে প্রয়োজন আত্মসংযম সাধনা।

জাতীয় পর্যায়েও কাজল রেখার শিল্পীসত্তা স্বীকৃত। তিনি বাংলাদেশ বেতার বাংলাদেশ টেলিভিশনের একজন প্রথম শ্রেণীর তালিকাভুক্ত শিল্পী। এই স্বীকৃতি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক নয়, বরং দীর্ঘদিনের নিরব সাধনা শিল্পনিষ্ঠার এক প্রামাণ্য দলিল।

আজকের দিনে যখন লোকসংগীত অনেকাংশেই মঞ্চকেন্দ্রিক বিনোদনে রূপ নিতে বসেছে, তখন কাজল রেখার মতো শিল্পীরা স্মরণ করিয়ে দেনলোকগান আসলে আত্মার ভাষা, মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন। নিরব সাধনা, শিকড়ের প্রতি আনুগত্য আর শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতাএই তিনের সমন্বয়েই কাজল রেখা হয়ে উঠেছেন লোকসংগীতের এক দৃঢ় কণ্ঠস্বর।

সময়ের প্রবাহে তিনি হয়তো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সবসময় থাকেন না, কিন্তু তাঁর কণ্ঠে লালনের বাণী যখন ভেসে আসেতখন মনে হয়, এই গান যুগের পর যুগ টিকে থাকবে। কারণ, কাজল রেখা কেবল গান করেন নাতিনি গানের ভেতর দিয়ে মানুষকে মানুষ হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।