ফাল্গুনের তপ্ত পলাশরাঙা দিন, ফেব্রুয়ারি তথা ভাষা আন্দোলনের অবিনাশী চেতনা আর বসন্তের উদাস করা হৃদস্পন্দন-এই তিনের অপূর্ব এক ত্রিবেণী সঙ্গমে প্রাণবন্ত হয়ে উঠল হিউস্টনের ‘বৈঠকখানা’।এবার ছিল বৈঠকখানার দ্বিতীয় পাক্ষিক আড্ডা। প্রবাসের কর্মব্যস্ত জীবনে যেখানে বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রবল প্রতাপ, সেখানে এক টুকরো বাংলাদেশ আর শৈশবের সেই চেনা সুরকে বুকে আগলে রাখার এক অনন্য প্রয়াস লক্ষ্য করা গেল এই আসরে। যান্ত্রিকতার মোড়ক ছিঁড়ে বিদেশের মাটিতে বাংলা সংস্কৃতির অনিঃশেষ চর্চা এবং নতুন প্রজন্মের ধমনীতে মাতৃভাষার বীজ বুনে দেওয়ার লক্ষ্যেই সেজেছিল এই মিলনমেলা।

এবারের আড্ডার আঙিনা ছিল শিরিন চৌধুরীর গৃহকোণ। যেখানে আতিথেয়তার উষ্ণতা আর আড্ডার স্বতঃস্ফূর্ততা একাকার হয়ে গিয়েছিল। অনুষ্ঠানের শুরুতেই বুকের গভীরে বেজে উঠল একুশের শোকগাথা।কারণ যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন শহরেই গর্বের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঢাকার বাইরে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহ্ত্তম শহীদ মিনার।

মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অমর শহীদদের স্মরণে বাংলাদেশ এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি খালেদ জুলফিকার খানের কণ্ঠে যখন বেজে উঠল “ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়” তখন মুহূর্তেই আসরের গাম্ভীর্য ও আবেগ এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়। দরাজ কণ্ঠে গান বেজে ওঠে গোলাম ফারুক পারভেজের কণ্ঠে। যিনি একাধারে সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী ও সমাজকর্মী।

আড্ডার দুই মূল কাণ্ডারি ছিলেন প্রদীপ ঘোষ ও রূপা ঘোষ। হিউস্টনের কেটির বাড়িতে তুমুল এ আড্ডায় ওঠে আসে বাঙালির নানা যজ্ঞের প্রসঙ্গ।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের বিশিষ্ট শিল্পী রূপা ঘোষ ছিলেন অনুষ্ঠানের পরিচালক। তাঁর নিপুণ ভাবনায় সংগীতের ডালিটি ছিল বৈচিত্র্যে ভরপুর। স্বদেশি গানের দেশপ্রেম, লোকসংগীতের মাটির টান, রবীন্দ্র-নজরুলের ধ্রুপদী আভিজাত্য আর আধুনিক গানের মূর্ছনায় পুরো সন্ধ্যাটি যেন এক সুরের নদীতে পরিণত হয়।

রূপা ঘোষ, কমল প্রিয়া, অলোক রয় থেকে শুরু করে অনিরুদ্ধ, অঞ্জলী, পারভীন, বিথী, অর্ঘ্য, খায়রুন, অলি, বাপন, সুকন্যা, গোপা, মধুমিতা, অনির্বান ও বিশ্বরুচির সমবেত ও একক পরিবেশনা ছিল আড্ডার প্রাণ। তাঁদের সুরের লহরী যখন জয়ন্তের তবলার ছন্দে মিলেমিশে একাকার হচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল এ যেন কোনো বিদেশ বিভুঁই নয়, বরং ফেলে আসা সেই প্রিয় স্বদেশ।

বাঙালি আড্ডা মানেই তো চায়ের কাপে ঝড় আর সাথে ঘরোয়া খাবারের ঘ্রাণ। সদস্যদের নিজ হাতে তৈরি নানা পদের মুখরোচক নাস্তা সেই আড্ডাকে যেন আরও রসালো আর প্রাণবন্ত করে তুলেছিল।
কারিগরি দিক থেকে অনুষ্ঠানটিকে নিখুঁত রূপ দিতে নেপথ্যে ছিলেন প্রদীপ আর রূপা ঘোষ। সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় জুলফিকার কার্নির সক্রিয় উপস্থিতি ছিল প্রশংসনীয়।

আসরের সমাপনী ছিল হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এক অঙ্গীকার। সমবেত কণ্ঠে যখন বেজে উঠল “আমি বাংলায় গান গাই”, তখন সেই ঐকতানে মিশে ছিল বাংলা ভাষার প্রতি অকৃত্রিম মমত্ববোধ আর সকল ভাষা শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। বিদেশের বৈরী পরিবেশে বাংলার শিকড়কে আঁকড়ে ধরার এমন শৈল্পিক ও সংস্কৃতিক উদ্যোগ সত্যিই এক বিরল প্রেরণার আলোকবর্তিকা হয়ে রইল।

