বুধবার,

১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

|

মাঘ ২৮ ১৪৩২

XFilesBd

বেগতিক রাজশাহীর হিজড়া সম্প্রদায়

তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের ভোটবিমুখতা। রাজশাহীর ৩৯ আসনে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত

বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী

প্রকাশিত: ০২:২৮, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের ভোটবিমুখতা। রাজশাহীর ৩৯ আসনে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত

কটূক্তি, হয়রানি ও বৈষম্যের অভিজ্ঞতা—এসব কারণ দেখিয়ে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন সংসদীয় আসনের তৃতীয় লিঙ্গের অনেক ভোটার এবার ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, ভোটকেন্দ্রে নারী নাকি পুরুষ বুথে দাঁড়াবেন—এ নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা বা আলাদা ব্যবস্থা না থাকায় প্রায়ই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক কটূক্তি ও অপমানের অভিজ্ঞতা। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সাংগঠনিকভাবে ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের দাবি, তাঁদের অনেকেই বৈধ ভোটার এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) রয়েছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এমন যে, ভোট দিতে গিয়ে হয়রানি ও বিভ্রান্তির মুখে পড়ে অনেকেই আর ভোটকেন্দ্রে যান না। রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় তাঁদের সংগঠন রয়েছে। এসব সংগঠনের পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমেই ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সংগঠন ও নেতৃত্বের অবস্থান
রাজশাহীতে ‘দিনের আলো হিজড়া সংঘ’ নামে একটি বড় সংগঠন রয়েছে, যার সদস্য সংখ্যা শতাধিক। ২০২৩ সালের জুনে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ১৯, ২০ ও ২১ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডে বিপুল ভোটে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন এই সংগঠনের নেত্রী সাগরিকা। তবে এবার তিনিও ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।
ভোটকেন্দ্রে অপমানের অভিজ্ঞতা
রাজশাহী মহানগরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার মিস পূর্ণিমা (৩৭) বলেন, তাঁর এনআইডিতে নাম রয়েছে ‘মারুফ’। ২০১৮ সালে ভোট দিতে গিয়ে নানা বিড়ম্বনার শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোট না দিয়েই ফিরে আসেন। এরপর আর কোনো নির্বাচনে ভোট দিতে যাননি। তাঁর ভাষায়, “আমাদের দেখলেই অনেকেই বাঁকা চোখে তাকায়। আমরা নারীদের লাইনে দাঁড়াব, নাকি পুরুষদের লাইনে—তার কোনো নির্দেশনা নেই। নারীদের লাইনে গেলে দূরে সরে যান, পুরুষদের লাইনে গেলে তাড়িয়ে দেন।”
নওগাঁ থেকে রাজশাহী শহরে এসে বসবাস শুরু করা মিস বিজলি (২৯) জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একটি কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে নারীদের লাইনে দাঁড়ালে তাঁকে লাইন থেকে বের করে দেওয়া হয়। পুলিশকে জানালেও কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকতে পারেননি। শেষে ভোট না দিয়েই ফিরতে হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার বলেন, জন্মপরিচয়ে এনআইডিতে পুরুষ লিঙ্গ থাকলেও তাঁদের সামাজিক পরিচয় নারী। ফলে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে বিভ্রান্তি ও অস্বস্তির মুখে পড়তে হয়। “পুরুষ বুথে গেলে নেয় না, নারী বুথে গেলে দূরে সরিয়ে দেয়—এই বাস্তবতায় আমরা আর ভোটকেন্দ্রে যাই না,” বলেন তিনি।
সামাজিক ট্যাবু ও আইনি বাস্তবতা
রাজশাহীর নারী আইনজীবী আইরিন সুলতানা বলেন, সংবিধান অনুযায়ী তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিক অধিকার স্বীকৃত হলেও ভোটকেন্দ্রে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সমাজে এখনও তাঁদের নিয়ে ট্যাবু ও অস্বস্তি রয়েছে, যা ঘৃণামূলক মন্তব্য ও বৈষম্যের জন্ম দেয়। তাঁর মতে, তাঁদের জন্য পৃথক পোলিং বুথ বা বিশেষ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
পরিসংখ্যান ও বাস্তব চিত্র
‘দিনের আলো হিজড়া সংঘ’–এর তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী মহানগর ও জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ২১১ জন তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই ভোটার হলেও বিভিন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি সামাজিক অস্বস্তি, হয়রানি ও বিড়ম্বনার কারণে।
রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্যে জানা যায়, এ অঞ্চলের ৩৯টি সংসদীয় আসনে হালনাগাদ তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারের সংখ্যা ১৭২ জন। তবে অনেকেই ভোটার তালিকা হালনাগাদ করেননি। আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের জন্য আলাদা বুথ থাকছে না; নারী বা পুরুষ—যেকোনো লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁরা ভোট দিতে পারবেন।
ভোটারদের অভিজ্ঞতা ও হতাশা
নগরীর ১ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার শাবনুর (এনআইডিতে নাম জনি হোসেন) জানান, এনআইডি করতে গিয়ে অনেকেই হয়রানির শিকার হয়েছেন। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে কটূক্তি ও অপমানের অভিজ্ঞতার কারণে এবার কেউ আর ভোট দিতে যেতে চান না।
নওহাটার মিস রাত্রি বলেন, “আমাদের পোশাক–পরিচয় দেখে কেন্দ্রে ঢুকতেই বাধা দেওয়া হয়। কেউ বলে না কোন লাইনে দাঁড়াব, কোথায় ভোট দেব। শেষ পর্যন্ত অপমান নিয়ে ফিরতে হয়।”
সংগঠনের দাবি
দিনের আলো হিজড়া সংঘের সভাপতি মোহনা মুহিন বলেন, ভোটকেন্দ্রগুলো এখনও তৃতীয় লিঙ্গবান্ধব নয়। আলাদা লাইন বা বুথ না থাকায় এবং কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় ভোট দিতে গেলে অনীহা ও অসহযোগিতার মুখে পড়তে হয়। তিনি পৃথক বুথ, কর্মকর্তাদের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি ও হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
বিশেষজ্ঞ মত
তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করা সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর নাহিদা পারভিন বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। সময়মতো উদ্যোগ নেওয়া হলে তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে।