কেরাণীগঞ্জের দিগন্তজোড়া আঁধারের বুকে সুরের এক মায়াবী প্রদীপ জ্বেলেছিলেন মরমি সাধক ও মাতাল কবি রাজ্জাক দেওয়ান। সেই মরমী কবির স্মৃতিকে অম্লান রাখতে তাঁরই সমাধিকে ঘিরে আয়োজিত হলো এক আধ্যাত্মিক সাধুসঙ্গ ও বাউল গানের আসর। রাজধানীর উপকণ্ঠের এই নিভৃত জনপদে সুরের যে মূর্ছনা বেজে উঠেছিল, তা যেন কেবল গান নয়, বরং ছিল আত্মার এক গভীর হাহাকার ও সত্যের অনুসন্ধান। কবির সুযোগ্য সন্তান সুজন দেওয়ানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাউল, সাধক ও সঙ্গীত অনুরাগীরা ছালামি আর আরজ নিয়ে সমবেত হয়েছিলেন এই পুণ্যভূমিতে। রাতভর চলা এই আসরে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস আর প্রবীণদের মরমী তত্ত্বে এক অপূর্ব মিলনমেলা তৈরি হয়, যেখানে কেউ খুঁজেছিলেন শান্তি, আবার কেউবা মজেছিলেন দেহতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্যে।

তবে এই সুরের আবহেও মিশে ছিল এক চাপা দীর্ঘশ্বাস ও প্রতিবাদের সুর। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, কবি ও গবেষক ড. অখিল পোদ্দার। তাঁর বক্তব্যে ফুটে ওঠে সমকালীন বাউল সমাজের ওপর নেমে আসা এক অন্ধকার অধ্যায়ের ছবি। তিনি অত্যন্ত ব্যথিত চিত্তে স্মরণ করিয়ে দেন, সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে কীভাবে এক উগ্র মৌলবাদী চক্র ও তাদের মদতপুষ্ট পেটোয়া বাহিনীর হাতে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে বাংলার প্রাণের সম্পদ বাউলদের। শত শত মাজার পুড়িয়ে দেওয়া, বাউলদের সম্মানহানি করে চুল কেটে দেওয়া এবং এমনকি কবর থেকে সাধকদের পবিত্র দেহ তুলে রাজপথে পোড়ানোর মতো পৈশাচিক ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি এক চরম শঙ্কার কথা তুলে ধরেন। ড. পোদ্দার আক্ষেপ করে বলেন, যখন এইসব বর্বরোচিত হামলা ও হত্যাকাণ্ড চলছিল, তখন সেনাবাহিনী, পুলিশ কিংবা বিজিবি কাউকেই আক্রান্ত বাউলদের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি।

বক্তব্যের শেষে তিনি আশার আলো ফুটিয়ে বলেন, সেই বৈরী ও অস্থির সময় এখন অতীত। ডক্টর ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সেই বিতর্কিত শাসনের অবসানের পর বাংলার মাঠ-ঘাটে আবার গান ও বিচিত্রার শান্তিময় আসর বসবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তবে সুরের এই সাধকেরা যে কেবল সহিষ্ণু নন, প্রয়োজনে তারা যে গর্জে উঠতে জানেন, সেই হুঙ্কারও ধ্বনিত হয় তাঁর কণ্ঠে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, বাঙালির হাজার বছরের এই সংস্কৃতি ও বাউলদের সাধনায় যদি পুনরায় কোনো বাধা আসে, তবে এবার আর নিরবে সহ্য করা হবে না; বরং বাউল সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ে তুলবে। রাজ্জাক দেওয়ানের সমাধি প্রাঙ্গণে রাতের শেষ প্রহরে যখন পুব আকাশে আলো ফুটছিল, তখন উপস্থিত সবার চোখেমুখে ছিল নিজেদের অস্তিত্ব আর সংস্কৃতি রক্ষার এক দৃঢ় সংকল্প।
