চিকিৎসা সংকটে ধুঁকছে দেশ: আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত কি আসলেই সমাধান?
-তারিকুল ইসলাম মুকুল
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর দশা কোনো গোপন বিষয় নয়। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে প্রয়োজনের তুলনায় রেজিস্টার্ড ডাক্তারের সংখ্যা যেমন অপ্রতুল, তেমনি বিশ্বমানের ও সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার মতো মানসম্মত হাসপাতালের সংখ্যাও হাতেগোনা। যখনই কোনো নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবার বড় কোনো রোগে আক্রান্ত হয়, তখনই তাদের সামনে ঢাকার দুই-একটি বিশ্বস্ত নাম ভেসে ওঠে। তার মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানে রয়েছে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল।
সম্প্রতি আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় শিশুর দুঃখজনক মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ 'শাট ডাউন' বা বন্ধ করে দেওয়ার একটি গুঞ্জন ও প্রাথমিক প্রক্রিয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। যেকোনো প্রাণহানিই বেদনার, আর তা যদি হয় শিশুর-তবে তা পুরো জাতির জন্য নির্মম। এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া এবং কোনো অবহেলা থাকলে তার কঠোর বিচার হওয়া আবশ্যক। কিন্তু তার জের ধরে ৭০০ বেডের একটি পূর্ণাঙ্গ, সুখ্যাতিসম্পন্ন এবং সেবামূলক হাসপাতাল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কি কোনো যৌক্তিক সমাধান? নাকি এটি দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা সংকটকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে—তা আজ গভীরভাবে ভেবে দেখার সময় এসেছে।
১. আদ্-দ্বীন হাসপাতাল: দেশের স্বাস্থ্য খাতে এক লাইফলাইন
আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কেবল একটি ইট-পাথরের ভবন নয়; এটি গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের বিশেষ করে মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং চোখের চিকিৎসায় এক অনন্য বিপ্লব ঘটিয়েছে। অত্যন্ত সুলভ মূল্যে, কখনো কখনো নামমাত্র খরচে আধুনিক চিকিৎসা সেবা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি লাখ লাখ মানুষের আস্থা অর্জন করেছে।
- ৭০০ বেডের বিশাল অবকাঠামো: ঢাকার বুকে ৭০০ বেডের একটি বেসরকারি হাসপাতাল পরিচালনা করা এবং সেটিও অলাভজনক বা স্বল্প লাভে চালানো চাট্টিখানি কথা নয়। প্রতিদিন এখানে হাজার হাজার রোগী বহির্বিভাগে সেবা নেন।
- দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের ভরসা: দেশের বড় বড় কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর খরচ যেখানে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, সেখানে আদ্-দ্বীন আন্তর্জাতিক মানের আইসিইউ, এনআইসিইউ এবং ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেবা দিয়ে আসছে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে।
- মেডিকেল শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র: আদ্-দ্বীন শুধু হাসপাতাল নয়, এর সাথে জড়িত রয়েছে মেডিকেল কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউট। হাসপাতাল বন্ধ হলে শত শত চিকিৎসা শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।
২. ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনা: আবেগ বনাম বাস্তবতা
ছয়টি শিশুর অকাল মৃত্যু অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং হৃদয়বিদারক ঘটনা। অভিভাবক হিসেবে তাদের ক্ষোভ ও বিচার চাওয়ার অধিকার শতভাগ যৌক্তিক। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতো একটি নীতি-নির্ধারণী সংস্থাকে আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে পেশাদারিত্ব ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো বিষয়টি মূল্যায়ন করতে হবে। ইতোমধ্যে আদ্ দ্বীন হাসপাতাল কতৃৃপক্ষ ভূক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে একের পর এক বৈঠক করেছে। তাদের যতো সব দবি ছিল তা ইতোমধ্যে মিটিয়ে দিয়েছে হাসপাতাল পরিচালনা পর্ষদ। ৮০ লাখ করে অর্থ সাহায্য দেয়ার পাশাপাশি চাকরি বিভিন্ন সময়ে পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন আদ্ দ্বীন হাসপাতালের চেয়ারম্যান মহোদয়। এরপরও কিছু কিছু মিডিয়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে নানান ধরণের কথাবার্তা লিখছে। এতে রাগী ও তাদের স্বজনদের কারও কারও মন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

মেডিকেল জটিলতা বনাম চিকিৎসকের অবহেলা: আইসিইউ বা এনআইসিইউতে (NICU) আসা শিশুরা সাধারণত অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় ভর্তি হয়। অনেক সময় চরম চেষ্টার পরও চিকিৎসকদের কিছু করার থাকে না। এই ছয় শিশুর মৃত্যু কোনো নির্দিষ্ট ভাইরাসের সংক্রমণ (যেমন: সেপসিস বা হাসপাতাল-অর্জিত সংক্রমণ), যান্ত্রিক ত্রুটি, নাকি সত্যিই চিকিৎসকদের গাফিলতির কারণে হয়েছে—তা সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ হওয়া জরুরি। যদিও হাসপাতাল পরিচালনা বোর্ড এরইমধ্যে বেশ কয়েকজনকে চাকরিচ্যুত করেছে। অন্যদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
আংশিক শাটডাউন বনাম পূর্ণাঙ্গ বন্ধ: যদি হাসপাতালের কোনো একটি নির্দিষ্ট ওয়ার্ড বা আইসিইউ ইউনিটে সংক্রমণ বা ত্রুটি দেখা দেয়, তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী সেই নির্দিষ্ট অংশটিকে সাময়িকভাবে 'আইসোলেট' বা বন্ধ করে স্যানিটাইজ করা হয়। কিন্তু পুরো হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই বিজ্ঞানসম্মত বা প্রশাসনিকভাবে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হতে পারে না।
৩. হাসপাতাল বন্ধের ক্ষতিকর প্রভাব: সংকটের নতুন মাত্রা
এমনিতেই দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। সিট না পেয়ে রোগীদের মেঝেতে বা বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। এই বাস্তবতায় আদ্-দ্বীনের মতো একটি সচল ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিলে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা নিচে আলোচনা করা হলো:
|
সম্ভাব্য সংকটের ক্ষেত্র |
বর্তমান পরিস্থিতি |
আদ্-দ্বীন বন্ধ হলে প্রভাব |
|
মা ও শিশু স্বাস্থ্য |
দেশের অন্যতম প্রধান এনআইসিইউ ও প্রসূতি সেবা কেন্দ্র। |
প্রতিদিন শত শত গর্ভবতী নারী ও নবজাতক জরুরি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে, যা শিশুমৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিতে পারে। |
|
সাধারণ ও জরুরি চিকিৎসা |
৭০০ বেডের ধারণক্ষমতায় হাজারো রোগী চিকিৎসাধীন। |
চিকিৎসাধীন রোগীরা মাঝপথে বিপদে পড়বেন। অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের সময় অনেকের প্রাণহানি ঘটতে পারে। |
|
সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপ |
ঢাকা মেডিকেল বা সলিমুল্লাহ মেডিকেল ইতিমধ্যেই ধারণক্ষমতার বাইরে। |
আদ্-দ্বীনের প্রতিদিনের হাজার হাজার রোগীর চাপ সরকারি হাসপাতালগুলো আর নিতে পারবে না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। |
|
কর্মসংস্থান ও শিক্ষা |
হাজারো ডাক্তার, নার্স, স্টাফ এবং মেডিকেল শিক্ষার্থী জড়িত। |
এক মুহূর্তে বিপুল সংখ্যক মানুষ বেকার হবে এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন স্থবির হয়ে পড়বে। |
৪. 'শাট ডাউন' কি আসলেই কোনো সমাধান?
ইতিহাস বলে, কোনো প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা বা বন্ধ করে দেওয়া খুব সহজ, কিন্তু তা গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হচ্ছে চিকিৎসা ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো দূর করে সেবার মান নিশ্চিত করা, প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া নয়।
"একটি সুপ্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া মানে হলো হাজার হাজার রোগীকে পরোক্ষভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। এটি কোনো সমাধান হতে পারে না; এটি হলো সমস্যার মুখোমুখি হতে না পেরে পালিয়ে যাওয়ার শামিল।"
যদি আদ্-দ্বীন হাসপাতালে কোনো প্রশাসনিক বা চিকিৎসাগত ত্রুটি থেকেও থাকে, তবে তার সমাধান হতে পারে সংশোধনমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে। যেমন:
- তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন: একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে নির্দিষ্ট ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করা।
- জরিমানা ও জবাবদিহিতা: যদি কোনো ব্যক্তিবিশেষের অবহেলা প্রমাণিত হয়, তবে তাকে আইনের আওতায় আনা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সতর্ক বা জরিমানা করা।
- ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন: আইসিইউ বা ওয়ান-স্টপ সেবার প্রোটোকল আরও কঠোর করার নির্দেশ দেওয়া এবং নিয়মিত অডিট করা।
৫. স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও বড় বড় হাসপাতালে চিকিৎসাগত ভুলের কারণে বা সংক্রমণের কারণে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। কিন্তু সেসব দেশের সরকার বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কখনোই পুরো হাসপাতাল বন্ধ করে দেয় না। তারা যেটা করে তা হলো—ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করা, নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের জীবাণুনাশকরণ (Sterilization) করা এবং দায়ীদের লাইসেন্স বাতিল করা।
আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে দেশের সাধারণ জনগণের আকুল আবেদন—সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যেন জেদ বা আবেগের চেয়ে জনস্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। ৭০০ বেডের একটি হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া মানে দেশের চিকিৎসা মানচিত্রে একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি করা, যা পূরণ করতে বহু বছর লেগে যাবে।
উপসংহার
বাংলাদেশে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মতো সেবামূলক প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত বিরল। ধনীদের জন্য দেশে বহু পাঁচ তারকা হাসপাতাল রয়েছে, কিন্তু গরিবের জন্য আদ্-দ্বীনই ছিল শেষ আশ্রয়স্থল। ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে যে, দেশের সেরা হাসপাতালেও সুরক্ষার ঘাটতি থাকতে পারে। কিন্তু এই ঘাটতি দূর করার উপায় সংস্কার, সংহার নয়।
দেশকে চিকিৎসা সংকট থেকে বাঁচাতে, হাজার হাজার নিরপরাধ রোগীর জীবন রক্ষা করতে এবং দেশের স্বাস্থ্য খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি। আশা করি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের 'শাট ডাউন' করার প্রাথমিক চিন্তা থেকে সরে আসবে এবং একটি কঠোর, স্বচ্ছ ও সংশোধনমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদ্-দ্বীনকে আবারও তার স্বনামধন্য সেবার ধারায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দেবে। হাসপাতাল বাঁচলেই বাঁচবে রোগী, সুসংহত হবে দেশের স্বাস্থ্য খাত।
[তারিকুল ইসলাম মুকুল, বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গণসংযোগ বিশেষজ্ঞ ]
