সোমবার,

০৮ জুন ২০২৬

|

জ্যৈষ্ঠ ২৪ ১৪৩৩

XFilesBd

নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়

এক অনন্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সংকট: ডা. শেখ মহিউদ্দিন ও আদ্-দ্বীনকে দমানোর নেপথ্যে কী?

ড. অখিল পোদ্দার (Dr. Akhil Podder)

প্রকাশিত: ০২:২৪, ৮ জুন ২০২৬

আপডেট: ০৪:২৭, ৮ জুন ২০২৬

এক অনন্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সংকট: ডা. শেখ মহিউদ্দিন ও আদ্-দ্বীনকে দমানোর নেপথ্যে কী?

এক অনন্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সংকট: ডা. শেখ মহিউদ্দিন আদ্-দ্বীনকে দমানোর নেপথ্যে কী?

           -ড. অখিল পোদ্দার

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের করুণ বাস্তবতা সাধারণ মানুষের সুচিকিৎসা পাওয়ার অন্তহীন লড়াইয়ের গল্প নতুন কিছু নয়। সরকারি হাসপাতালের সীমাহীন ভিড় আর নামী-দামী বেসরকারি হাসপাতালগুলোর আকাশচুম্বী বিলের মাঝে পড়ে দেশের মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত মানুষ যখন প্রতিনিয়ত দিশেহারা, ঠিক তখনই গত কয়েক দশক ধরে এক পরম ভরসার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল। ঢাকার মগবাজারে অবস্থিত এই ৭০০ বেডের সুখ্যাতিসম্পন্ন হাসপাতালটি আজ শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয়, বরং লাখ লাখ অসহায় মানুষের জীবন বাঁচানোর এক শেষ আশ্রয়স্থল। সাম্প্রতিক সময়ে এই হাসপাতালে ছয়টি শিশুর মৃত্যুর অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেভাবে পুরো প্রতিষ্ঠানটিকেশাটডাউনবা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য চারপাশ থেকে এক ধরণের তোড়জোড় শুরু হয়েছে, তা কেবল দুঃখজনকই নয়, বরং গভীর রহস্যের জন্ম দেয়। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনাকে পুঁজি করে দেশের অন্যতম মানসম্মত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত একটি হাসপাতালকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার এই আত্মঘাতী প্রয়াস কি আসলেই জনস্বার্থের জন্য, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গভীর চক্রান্ততা আজ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।

প্রথমেই যে সত্যটি স্বীকার করতে হবে তা হলো, এই পুরো শহরের বুকে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের আসলে কোনো বাণিজ্যিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। কেন নেই? কারণ, আদ্-দ্বীন কখনো অন্য আট-দশটি বেসরকারি হাসপাতালের মতো মুনাফালোভী কর্পোরেট নীতিতে পরিচালিত হয়নি। এটি মূলত দেশের দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত নিম্নবিত্ত মানুষের চিকিৎসার প্রধানতম কেন্দ্র। শুধু কি দরিদ্র? দেশের বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণী, যারা না পারে সরকারি হাসপাতালের বারান্দায় শুয়ে থাকতে, না পারে পাঁচ তারকা হাসপাতালের লাখ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করতে, তাদের জন্য আদ্-দ্বীন এক পরীক্ষিত ভরসার নাম। অত্যন্ত কম টাকায়, নামমাত্র খরচে আন্তর্জাতিকমানের প্রসূতি সেবা, এনআইসিইউ (NICU) এবং অন্যান্য জটিল রোগের কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা এই হাসপাতালে যেভাবে পাওয়া যায়, তার দ্বিতীয় কোনো নজির এই শহরে মেলা ভার। যে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ সময় ধরে কোটি কোটি মানুষের আস্থা অর্জন করেছে, তাকে এক ঝটকায় বন্ধ করে দিলে দেশের বিদ্যমান চিকিৎসা সংকট যে কতটা তীব্র আকার ধারণ করবে, তা ভাবলেও শিউরে উঠতে হয়।

এই অনন্য ও মানবতাবাদী প্রতিষ্ঠানের নেপথ্যে যিনি দিনরাত একক প্রচেষ্টায় কাজ করে গেছেন, তিনি হলেন আদ্-দ্বীন হাসপাতালের কর্ণধার ডা. শেখ মহিউদ্দিন। চিকিৎসা জগতে তিনি এক অত্যন্ত নিপাট, সজ্জন এবং ভদ্র মানুষ হিসেবে পরিচিত। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি যেমন প্রচারবিমুখ, তেমনি ক্ষমতার লোভ বা রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে চিরকাল নিজেকে দূরে রেখেছেন। কোনো ধরনের দলাদলি বা রাজনৈতিক বৈরিতার সাথে যার বিন্দুমাত্র সংযোগ নেই। যিনি কেবল নিজের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, মেধা ও একাগ্রতা দিয়ে এই ৭০০ বেডের বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন মানুষের সেবার জন্য। আজ তাকে এবং তার প্রতিষ্ঠানকে দমাতে কেন সবাই একযোগে উঠেপড়ে লেগেছে? এই প্রশ্নটি দেশের বিবেকবান প্রতিটি নাগরিকের মনে সুতীব্রভাবে জাগ্রত হয়েছে। ডা. শেখ মহিউদ্দিনের সবচেয়ে বড় গুণ হলো, তিনি কেবল সস্তায় চিকিৎসা দিয়েই ক্ষান্ত হননি; যেসব অসহায় ও হতদরিদ্র রোগীর আদ্-দ্বীনের সেই ন্যূনতম খরচটুকু দেওয়ার সামর্থ্য থাকে না-তাদের নিজ তহবিল থেকে আরও বড় অংকের আর্থিক সাহায্য ও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন তিনি। এই মানুষটি ও তার তিল তিল করে গড়া প্রতিষ্ঠানটি আজ কেন এমন নোংরা আক্রমণের শিকার হবে?

একটি নির্মম কিন্তু চিরন্তন সত্য হলোহাসপাতাল কোনো অমরত্বের কারখানা নয়। এটি আরোগ্য লাভের চেষ্টা করার জায়গা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ উৎকর্ষের পরও হাসপাতালে রোগী মারা যেতেই পারে। অত্যন্ত সংকটাপন্ন, জটিল এবং মুমূর্ষু অবস্থায় যেসব রোগীকে আইসিইউ বা এনআইসিইউ-তে ভর্তি করা হয়, চিকিৎসকদের শত চেষ্টার পরও অনেক সময় তাদের বাঁচানো সম্ভব হয় না। সাম্প্রতিক শিশুদের মৃত্যুর ঘটনাটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং অভিভাবক হিসেবে তাদের ক্ষোভ দুঃখকে আমরা শতভাগ সম্মান জানাই। কিন্তু আমাদের ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে, দেশের অন্য কোনো সরকারি বা নামী-দামী বেসরকারি হাসপাতালে কি রোগী মারা যায় না? সেখানে কি নবজাতক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে না? অবশ্যই ঘটে, এবং তা প্রতিনিয়তই ঘটছে। কিন্তু অন্য সবখানে যখন রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, তখন তো এভাবে পুরো হাসপাতাল শাটডাউন করার বা সেই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব মিটিয়ে দেওয়ার মতো কোনো নজিরবিহীন কাহিনী উন্মাদনা তৈরি হতে দেখা যায় না। তাহলে আদ্-দ্বীনের বেলায় কেন এই দ্বিমুখী নীতি? কেন এই পুরো ঘটনাটিকে এমন এক বিশাল ইস্যুতে রূপ দেওয়া হচ্ছে, যার শেষ পরিণতি হিসেবে হাসপাতালটিকেই বন্ধ করে দেওয়ার পাঁয়তারা করা হচ্ছে? নানাভাবে এ প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের গুড উইল নষ্ট করার হীন চক্রে মেতেছে!! অথচ এরই মধ্যে ভূক্তভোগী পরিবারগুলোকে ৮০ লাখ করে টাকা দিচ্ছে। দিচ্ছে অন্যান্য সুযোগ সুবিধা। 

এই সংকটের মাঝেও ডা. শেখ মহিউদ্দিন ও তার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যে চরম দায়িত্বশীলতা ও সততার পরিচয় দিয়েছেন, তা বর্তমান সময়ে অবিশ্বাস্য। তারা কোনো সত্য আড়াল করার চেষ্টা করেননি, কোনো অহংকার দেখাননি। মালিক হিসেবে ডা. শেখ মহিউদ্দিন নিজে ভুল স্বীকার করেছেনতাৎক্ষণিকভাবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেবল মুখের কথায় সমবেদনা জানিয়েই তিনি দায়িত্ব শেষ করেননি, বরং প্রতিটি ভুক্তভোগী পরিবারকে বড় ধরনের আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতা দিয়েছেন। হাসপাতালের অভ্যন্তরে চিকিৎসাগত বা প্রশাসনিক কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। এমনকি সাংবাদিকদের সাথে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত উগ্র আচরণের দায়ে তাৎক্ষণিকভাবে দোষী ক্লিনারদের চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। যে মানুষটি নিজে অপরাধের সাথে জড়িত নন, অথচ প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে ভুল স্বীকার করে খেসারত দিচ্ছেন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন—তাকে পুরস্কৃত বা সহযোগিতা করার বদলে কেন তাকে দমানোর এই অপচেষ্টা?

এই পুরো ঘটনার পেছনে যে তীব্র পেশাদারী ঈর্ষা অন্য কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে না, তা হলফ করে বলা যায় না। ঢাকার বুকে স্বাস্থ্য খাত আজ এক বিশাল বাণিজ্যের ক্ষেত্র। কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর একচেটিয়া ব্যবসার বাজারে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল এক মস্ত বড় বাধা। কারণ আদ্-দ্বীন প্রমাণ করে দিয়েছে যে, হাজার হাজার টাকা পকেট না কেটেও সাধারণ মানুষকে মানসম্মত সেবা দেওয়া সম্ভব। এই সফলতার কারণেই হয়তো কোনো কোনো মহল ডা. শেখ মহিউদ্দিনের এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা আদ্-দ্বীনের সুনামকে সহ্য করতে পারছে না। তার নিষ্কলঙ্ক চরিত্র এবং কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়া না থাকাকেই হয়তো দুর্বলতা ভেবে, এই সুযোগে তার দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসলটিকে ধ্বংস করে দেওয়ার এক নীল নকশা তৈরি করা হয়েছে।

একটি ৭০০ বেডের হাসপাতাল এক দিনে গড়ে ওঠে না। এর পেছনে জড়িয়ে থাকে হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের ত্যাগ, শত কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং লাখ লাখ রোগীর আবেগ। আদ্-দ্বীন বন্ধ হয়ে গেলে লাভ কার হবে জানি না, তবে ক্ষতি হবে এই দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের। প্রতিদিন আদ্-দ্বীনের বহির্বিভাগে যে হাজার হাজার অসহায় মা তাদের কোলে অসুস্থ শিশুটিকে নিয়ে আসেন, তারা কোথায় যাবেন? সরকারি হাসপাতালগুলোর যে বেহাল দশা, সেখানে কি এই বিশাল বাড়তি রোগীর চাপ সামলানোর ক্ষমতা আছে? কখনই নেই। আদ্-দ্বীন শাটডাউন হলে শহরের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এক মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়বে, যা চিকিৎসা সংকটকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

অতএব, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নীতিনির্ধারকদের প্রতি বিনীত অনুরোধকোনো অদৃশ্য মহলের কলকাঠিতে বা ঈর্ষার আগুনে পা দিয়ে দেশের অন্যতম সেরা এই চিকিৎসাকেন্দ্রটিকে ধ্বংস করবেন না। ডা. শেখ মহিউদ্দিনের মতো একজন নিপাট ভদ্র সমাজসেবক মানুষকে দমানোর চেষ্টা বন্ধ হোক। আদ্-দ্বীন হাসপাতালে যদি কোনো ঘাটতি বা ত্রুটি থেকে থাকে, তবে তা সংস্কারের মাধ্যমে উন্নত করার সুযোগ দেওয়া হোক। দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করে, প্রতিষ্ঠানের মালিকের সদিচ্ছাকে মূল্যায়ন করে হাসপাতালটিকে পুনরায় পূর্ণ শক্তিতে সচল রাখাই হবে দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একমাত্র কল্যাণকর সিদ্ধান্ত। কারণ, আদ্-দ্বীন বাঁচলে বাঁচবে লাখো গরিবের প্রাণ, সুসংহত হবে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা।

[ড. অখিল পোদ্দার টেলিভিশনের অভিজ্ঞ সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক। একুশে টিভির প্রাক্তন প্রধান প্রতিবেদক ও প্রধান বার্তা সম্পাদক]