ঢাকা শহরের ব্যস্ততম সড়কের পাশে অবস্থিত সেই চেনা প্রাঙ্গণটিতে আজ ভোর হতেই দীর্ঘ লাইন। সূর্য তখনও পুরোপুরি ওঠেনি, অথচ গেটের বাইরে অপেক্ষমাণ মানুষের সারিতে কোনো বিরাম নেই। কারও কোলে অসুস্থ শিশু, কেউবা গর্ভবতী স্ত্রীকে নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন পরম আশায়। প্রায় দেড় মাসের দীর্ঘ এক নীরবতা কাটিয়ে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল যখন আবার তার রোগীদের জন্য দ্বার উন্মুক্ত করেছে, তখন যেন বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো ফিরে এসেছে মানুষের হারানো আস্থা। যে প্রতিষ্ঠানটিকে একসময় লাইসেন্স বাতিলের প্রশাসনিক জটিলতায় থমকে যেতে হয়েছিল, টানা ৪৫ দিন যার করিডোরে ছিল এক শুনশান নিরবতা, সেই আদ্-দ্বীন আজ আবার জেগে উঠেছে মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসাকে পাথেয় করে। কিন্তু এই জাগরণ এখন রূপ নিয়েছে এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জে—প্রতিদিন শত শত রোগী চিকিৎসা নিতে এসেও শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন কেবল ধারণক্ষমতার সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার কারণে।

একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারণ মানুষের কতটা গভীর অনুরাগের ভিত তৈরি হতে পারে, তা আদ্-দ্বীনের সাম্প্রতিক দৃশ্যপট না দেখলে অনুধাবন করা কঠিন। লাইসেন্স বাতিলের সেই কালো দিনগুলোতে যখন হাসপাতালের মূল ফটকে তালা ঝুলেছিল, তখন কেবল একটি ভবনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়নি, বরং হাজার হাজার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নির্ভরযোগ্য চিকিৎসার শেষ ঠিকানাটি এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। ঢাকার আনাচে-কানাচে তো বটেই, দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা যেসব প্রান্তিক মানুষ স্বল্প খরচে উন্নত চিকিৎসার কথা ভেবে এই চত্বরে পা রাখতেন, তাঁদের সামনে নেমে এসেছিল চরম অন্ধকার। কিন্তু অন্যায় বা প্রশাসনিক খড়গ যে সেবার ব্রতকে চিরতরে মুছে দিতে পারে না, তার প্রমাণ মেলে ৪৫ দিনের সেই কঠিন প্রতীক্ষার পর। আইনি প্রক্রিয়া ও মানুষের আকুল প্রার্থনার জোরে অবশেষে লাইসেন্স ফিরে পায় প্রতিষ্ঠানটি। আর সেই পুনর্জন্মের পর থেকেই শুরু হয় এক অভাবনীয় জনস্রোত।
প্রতিদিন সকালে আদ্-দ্বীনের বহিঃবিভাগে যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা একাধারে আনন্দের এবং তীব্র বেদনার। দূরদূরান্ত থেকে হাজারো মানুষ ভিড় করছেন একটুখানি উন্নত সেবার আশায়। ডাক্তারদের চেম্বারের সামনে, রেজিস্ট্রেশন কাউন্টারে কিংবা প্যাথলজি বিভাগের প্রতিটি তলায় শুধুই মানুষের মাথা। অথচ একটি নির্দিষ্ট পরিকাঠামো ও সীমার মধ্যে থেকে মানসম্পন্ন সেবা বজায় রাখতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন। ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা দিনরাত এক করে টানা ডিউটি করেও সামাল দিতে পারছেন না এই বিশাল রোগীর চাপ। প্রতিটি বিভাগ তার সর্বোচ্চ সক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেশি সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তবুও ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিদিন অসংখ্য রোগীকে অত্যন্ত আকুল মন নিয়ে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। অনেককে পরম মমতায় বুঝিয়ে অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে, কারণ একটি শয্যাও আর খালি নেই, আউটডোরের টিকিট বিক্রির সীমাও পার হয়ে গেছে অনেক আগেই।
যাঁরা সেবা পেয়ে ঘরে ফিরছেন, তাঁদের চোখে-মুখে ফুটে উঠছে এক স্বস্তির দ্যুতি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নিজের কাঙ্ক্ষিত ডাক্তারকে দেখাতে পেরে কিংবা কোনো জটিল অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর রোগীর স্বজনরা যেন নতুন জীবন ফিরে পাচ্ছেন। আদ্-দ্বীনের মূল শক্তিই ছিল সবসময় এর মানবিক মূল্যবোধ এবং সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত চিকিৎসা দেওয়া। বিশেষ করে মা ও শিশুদের চিকিৎসায় এই প্রতিষ্ঠানটি দেশে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অভিজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং সবচাইতে বড় কথা—নার্স ও স্টাফদের গভীর আন্তরিকতা রোগীদের মনে এমন এক বিশ্বাসের বীজ বুনে দিয়েছে, যা কোনো প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা সাময়িক স্থগিতাদেশ একচুলও নড়াতে পারেনি। লাইসেন্স ফিরে পাওয়ার পর সেই সেবা যেন আরও বেশি যত্নশীল ও গতিশীল রূপ নিয়েছে।
তবে এই অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলানো আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষের জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এক নতুন সংগ্রাম। সকালে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেই বোঝা যায়, কেন এই প্রতিষ্ঠানটি মানুষের হৃদয়ে এত বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। এখানে সেবা কেবল একটি পেশা নয়, বরং একটি ব্রত। আউটডোরে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রবীণ ব্যক্তি থেকে শুরু করে ট্রলিতে শুয়ে থাকা মুমূর্ষু রোগী—সবাইকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে গিয়ে চিকিৎসকদের বিশ্রামের সময়টুকুও মিলছে না। চিকিৎসকরা জানান, ৪৫ দিনের বিরতির কারণে যেসব রোগী দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের ফলো-আপ চিকিৎসা নিতে পারেননি, তাঁরা তো বটেই, সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন নতুন হাজার হাজার রোগী। এক একটি বিভাগে সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত টানা চিকিৎসা দিয়েও লাইনের শেষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। আর তাই, পর্যাপ্ত শয্যা ও স্থানসংকুলান না হওয়ায় প্রতিনিয়ত বাধ্য হয়ে অনেককে না ফিরিয়ে দেওয়ার মতো কষ্টদায়ক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

যেসব রোগী সেবা না পেয়ে প্রতিদিন ফিরে যাচ্ছেন, তাঁদের চোখেমুখেও কোনো ক্ষোভ বা বিরক্তি দেখা যায় না; বরং থাকে এক পরম আকুতি ও আফসোস। ভোরের আলো ফোটার আগে থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও যখন টিকিটের কোটা শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে বাড়ি ফিরতে হয়, তখন তাঁদের মুখে একটাই কথা—কাল আবার একটু আগে এসে লাইনে দাঁড়াব, তবু চিকিৎসা এই হাসপাতালেই করাব। সাধারণ মানুষের এই নিঃশ্বাসের মতো বিশ্বাসই আদ্-দ্বীনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর আকাশচুম্বী খরচ যখন সাধারণ পরিবারগুলোর জন্য এক বিশাল অভিশাপ, তখন আদ্-দ্বীন দাঁড়িয়ে থাকে এক আশার প্রদীপ হয়ে। সামান্য খরচে আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় মনোযোগ এবং উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগ এই প্রতিষ্ঠানটিকে সাধারণ মানুষের প্রথম ও প্রধান পছন্দে পরিণত করেছে।
হাসপাতালটির পরিচালনা পর্ষদ ও প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরাও এই বিপুল জনস্রোত দেখে যেমন অভিভূত, তেমনি প্রতিনিয়ত উদ্বিগ্ন। কীভাবে এই বিপুল চাহিদার বিপরীতে সেবার পরিধি আরও বাড়ানো যায়, তা নিয়ে তাঁরা নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন। ৪৫ দিনের স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার পর সেবার মান অক্ষুণ্ণ রাখাই ছিল তাঁদের প্রাথমিক লক্ষ্য, কিন্তু এখন তাঁদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা। প্রতিটি বিভাগেই ডাক্তার ও নার্সদের অতিরিক্ত শিফটে কাজ করার পাশাপাশি অবকাঠামোগত প্রসারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসা তো কোনো যান্ত্রিক বিষয় নয় যে মুহূর্তের মধ্যে এর পরিধি দশ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া যাবে; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নিখুঁত পর্যবেক্ষণ, স্বাস্থ্যবিধি ও মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি। আদ্-দ্বীন কোনো অবস্থাতেই নিজেদের সেবার মান কমাতে রাজি নয় বলেই প্রতিদিন বাধ্য হয়ে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যার পর নতুন রোগী নেওয়া বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
এই পুরো পরিস্থিতির মাঝে সবচেয়ে উজ্জ্বল যে দিকটি ফুটে উঠেছে, তা হলো মানুষের ভালোবাসা ও প্রতিশ্রুতির জয়। একসময় যেসব চক্রান্তের কারণে হাসপাতালটির স্বাভাবিক কার্যক্রম স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তার জবাব আদ্-দ্বীন দিয়েছে নিজেদের সেবা আর সততা দিয়ে। সাময়িক বিরতি তাঁদের অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারেনি, বরং মানুষের মন থেকে আদ্-দ্বীনের নাম যে মুছে ফেলা অসম্ভব, তা প্রমাণ করেছে প্রতিদিনের এই উপচে পড়া ভিড়। মফস্বল কিংবা গ্রাম থেকে আসা সাধারণ মানুষগুলোর কাছে আদ্-দ্বীন শুধু একটি হাসপাতাল নয়, এটি এমন এক জায়গা যেখানে গেলে শুধু ওষুধ নয়, মেলে একটু সমবেদনা, একটু পরম মমতা।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কেবল একটি সফল সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের গল্প নয়, এটি একটি বিশ্বাসের মহাকাব্য। ৪৫ দিনের অন্ধকার সুড়ঙ্গ পেরিয়ে আলোর মুখ দেখা এই প্রতিষ্ঠানটি আজ তার অর্জনের চূড়ায় অবস্থান করছে। যদিও প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে সেবা দিতে না পেরে ফিরিয়ে দেওয়ার বেদনা রয়েছে, তবুও সেই বেদনার অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক পরম পাওয়ার আনন্দ—মানুষ এখনও আদ্-দ্বীনকে ভালোবাসে, মানুষ এখনও আদ্-দ্বীনকে বিশ্বাস করে। এই অটুট আস্থা আর অফুরন্ত ভালোবাসাকে সম্বল করেই আদ্-দ্বীন প্রতিদিন এগিয়ে যাচ্ছে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে, যেখানে প্রতিটি নিরাময়হীন মানুষের জন্য থাকবে সেবার উন্মুক্ত হাত এবং ভালোবাসার উষ্ণ ছোঁয়া।
