৫আগষ্টের নির্বাসনের পরে এই প্রথমবারের মতো কোন বাংলাদেশী সাংবাদিকের কাছে ইন্টারভিউ প্রদান করলেন ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এর পূর্বে তিনি ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সবশেষ ১৯ অক্টোবর ওয়াশিংটন ডিসিতে ভার্চুয়াল ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন। ডিসেম্বরে দেশে ফেরার আকাঙ্খা, বিচার, প্রতিশোধ, পূণর্মিলন, জাতীয় নির্বাচন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, ধানমন্ডি ৩২ ভাঙচুর প্রসঙ্গ, ড. মোহাম্মদ ইউনুসের শাষন আমল ও রাজনীতির ভবিষ্যত নিয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন তিনি। সূধাসদন গুড়িয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে ২৮ অক্টোবর সাংবাদিক সুলতানা রহমানের কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশে ফেরার পরে ঢাকায় তার থাকার জায়গার অনিশ্চয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। “ আকাশ আমার ছাদ, মাটি আমার ঘর ” বিশ্ববাসীর সামনে তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ট্রাভেল পাশের মাধ্যমে ঝুঁকি নিয়ে হলেও ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন বলে আবারও আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছেন তিনি।
তার দেশে ফেরার তীব্র আকাঙ্খা প্রমাণিত কিন্তু ফেরার সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনও নিশ্চিত নয়, এমনকি এখন পর্যন্ত এমন কোন দৃশ্যমান রাজনৈতিক পটভূমি নির্মাণ হয়নি যার উপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, আওয়ামীলীগ তথা শেখ হাসিনা ডিসেম্বরেই দেশে ফিরছেন। ৫ আগষ্টের পরে আওয়ামীলীগের দৃশ্যমান বৃহৎ কোন কর্মসূচীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছিল ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবারের মিছিলটি। কারণ, ওই মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান, দুটি ককটেল বিস্ফোরণ, পুলিশের রাবার বুলেট নিক্ষেপ এবং গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনায় ব্যাপক ধরপাকড় হয় এবং গুলশান বিভাগের ডিসি ও থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়। এছাড়া অদ্যাবধি মাঠ দখল তো দূরের কথা ১০-২০ মিনিট স্থায়ী এমন কোন মিছিলেরও দৃশ্যমান কর্মসূচী আওয়ামীলীগের নেই অথচ কাউন্ট ডাউন ডিসেম্বর আরমাত্র ৩০ দিন পরে। এটুকু সুষ্পষ্ট দৃশ্যমান যে, দলের নেতাকর্মীরা মাঠ দখলে নিয়ে আসছে ডিসেম্বরেই তাকে দেশে ফেরাতে পারবেনা এবং কোন সিকিউরিটিও দিতে পারবেনা। অন্যদিকে শুধুমাত্র নিজো ঘোষণা বাস্তবায়নের জন্য জেদের বশে ট্রাভেল পাশ নিয়ে ডিসেম্বরে দেশে এসে গ্রেফতার হয়ে রেডী থাকা ফাঁসির দড়িতে ঝুলে পড়বেন এমন শ্রীহীন রাজনীতিবিদও তিনি নন কখনই। যদি তাই হতেন তাহলে ২৪ এর ডিসেম্বরে না আসলেও ২৫ এর ডিসেম্বরেই চলে আসতেন ; ২৬ এর ডিসেম্বরের জন্য অপেক্ষাই করতেন না। তাহলে কি ঘটবে আসছে ডিসেম্বরে ? নাকি কুটনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ভারত সরকারই তাকে ডিসেম্বরে দেশে ফেরার অনুরোধ করেছে ? এ বিষয়ে শুধুমাত্র উদ্ধৃতি প্রকাশ ব্যতিত আমাদের কারও কিছু ষ্পষ্ট করে বলা সম্ভব নয় কারন এ বিষয়ে নরেন্দ্র মোদী বা শেখ হাসিনা কেউই আমাদেরকে আসল সত্য বলবেন না কারন এটা পলিটিক্যাল সিক্রেট। তবে ধারনা করা যেতেই পারে যে, আশ্রয় প্রদানের দুই বছর হতে চললো এখনও শেখ হাসিনা বা আওয়ামীলীগ দেশের অভ্যন্তরে কোন গ্রাউন্ডেই তৈরি করতে পারেনি যার উপড় ভিত্তি করে ভারত বা মিত্র দেশগুলো শেখ হাসিনার ব্যাপারে পজিটিভ কোন ষ্টেপ নিতে পারে ।
এদিকে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় প্রদানের জন্য আমেরিকা সহ অন্যান্য আমেরিকাপন্থী দেশগুলোর সঙ্গেও ভারতের কুটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি দৃশ্যমান। এভাবে চলতে থাকলে ভারত আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে পড়বেই এবং শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে বাধ্য হবেই। এক কথায়- নিজেদের দেশকে সিকিউরিটিলেস করে বছরের পর বছর ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিবেনা ; এমন উদারপন্থী ও স্বার্থহীন জাতি ইন্ডিয়ানরা কখনই হতে পারেনা। ইন্ডিয়ানরা স্বার্থ ছাড়া এক চুল পরিমাণও ছাড় দেয়না। যদি দিতো তাহলে বাংলাদেশের মানচিত্র এমন হতোনা। শেখ হাসিনা সরকারের সাথে চুক্তি করে তারা এদেশের সাথে অনেক কিছুই করেছে যার সবই বাণিজ্যিক, স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিন্তু আজও তিস্তা ও ফারাক্কা অমীমাংসিত। তাই স্বার্থে যখন আঘাত লাগবে তখন তারা শেখ হাসিনাকেও চিনবেনা কারন আর যাইহোক ইন্ডিয়ানরা সাচ্ছা দেশপ্রেমিক। ইন্ডিয়ানদের ব্যাপারে এর চেয়ে ভালো কিছু বলা যায়না, বলা উচিতও না। অন্যদিকে বাঙ্গালীরা বেশীরভাগ লোক দেখানো দেশপ্রেমিক, আসলে এই দেশকে বেশীরভাগই ভালবাসেনা। শুধু ভালোবাসার অভিনয় করে। আরও ষ্পষ্টভাবে বললে- “এই দেশটা একটা ডাইনিং টেবিল, যেকেউ বসামাত্রই খাওয়া শুরু করে ; এটাই সত্য। শেখ হাসিনা সরকার করেছেও যেমন, খেয়েছেও তেমন আর অন্যান্যরা (এরশাদ ব্যতীত) করতেও পারেনি তেমন, তাই খেতেও পারেনি তেমন। বাট এবার তারা খাবে দীর্ঘদিন , এটাই তাদের প্রতিজ্ঞা। যদি শেখ হাসিনা পারে তবে তারা কেন নয় ?
সুতরাং শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আইনী বেআইনী যেকোন প্রক্রিয়াতেই হোক না কেনো তাকে হত্যা করা হবেই, এব্যাপারে তারা জিরো টলারেন্স, কারন ছাড় দিলেই আবার শেখ হাসিনার ধাক্কা তারা আর সামাল দিতে পারবেনা। যদিও তিনি সুলতানা রহমানের সাথে সাক্ষাৎকারে প্রতিশোধের বিপরীতে পূণর্মিলনের আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু একথাও সত্য যে, এই পূণর্মিলনের আহ্বানও ব্যার্থ হবে কারন ৫ আগষ্ট থেকে অদ্যাবধি এমনকিছু দুর্ধর্ষ ঘটনা আওয়ামীলীগের সাথে হয়ে গেছে যার প্রতিশোধ ভুক্তভোগী ক্ষিপ্ত আওয়ামী নেতাকর্মীরা নিবেই, এই বিষয়টি শেখ হাসিনার কন্ট্রোলেও থাকবেনা, যেমনটি আওয়ামী নিধনের ব্যাপারে ইউনুস বা তারেক রহমান সাহেবের কন্ট্রোলেও নেই । তাই খেলা হবেই। প্রশ্ন: কোন খেলা – প্রতিশোধ, নাকি পূণর্মিলন ? উত্তর – প্রতিশোধ । পূণর্মিলন এদেশে কখনই হবেনা কারন এই দেশটাই রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ন দেশ। এজন্যই দেশের আপামর জনগণ সবাই তৃতীয় পক্ষের আগমনের মাধ্যমে এই প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান চেয়েছিলো; কিন্তু কাঙ্খিত সেই তৃতীয় পক্ষ এসে রাজনীতিকে আরও প্রতিহিংসার দিকে ঠেলে দিয়েছে। লোভ লালসার ভাগার বানিয়ে ফেলেছে দেশকে; তার প্রমাণ গত দুই বছরে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশী টাকার পরিমাণের রেকর্ড। সুতরাং প্রশ্ন এখন একটাই- এই দেশের ভবিষ্যত কি ? সার্বিক বিবেচনায় উত্তরও একটাই- তা জেনে আপনার কাম কি ? অর্থাৎ বাংলাদেশের ভবিষ্যত নিয়ে এখন শুধু প্রশ্নের উত্তরে পল্টা প্রশ্ন আছে কিন্তু সঠিক উত্তর নেই । আমরা এখানেই হতাশ, তাই দেশ সম্পর্কে বলতে হচ্ছে এভাবেই – সবশেষ ছিলো “স্মার্ট বাংলাদেশ, এখন চলছে “সবার আগে বাংলাদেশ আর অপেক্ষমান ”হতাশ বাংলাদেশ।
সাংবাদিক সুলতানা রহমানের নেওয়া শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কয়েকটি প্রশ্ন । বাংলাদেশে তাঁর প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা, জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা, সম্ভাব্য নির্বাচন, আন্দোলনকারীদের প্রতি তাঁর অবস্থান এবং ক্ষমতাচ্যুতির পর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর বক্তব্য। সাক্ষাৎকারটি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি নয়; এটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট, ক্ষমতার বৈধতা, বিচারপ্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক পুনর্মিলনের প্রশ্নগুলোও সামনে নিয়ে আসে। সাক্ষাৎকারের বক্তব্য বিশ্লেষণ করতে হলে দুটি বিষয় আলাদা রাখা জরুরি: শেখ হাসিনা কী বলেছেন, এবং তাঁর বক্তব্যের পক্ষে বা বিপক্ষে যাচাইযোগ্য তথ্য কী বলছে। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন না করেই মূল বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
সাক্ষাৎকারের ০৯ টি প্রধান বিষয় :
(০১) ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা : শেখ হাসিনা বলেছেন, ডিসেম্বর বিজয়ের মাসে তিনি বাংলাদেশে ফিরতে চান। গ্রেপ্তার, কারাবাস কিংবা প্রাণহানির আশঙ্কার কথা স্বীকার করেও তিনি ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ, সময় ও পথ এখনো নিশ্চিত নয়।
(০২) ধানমন্ডি ৩২ ও হারানো আশ্রয়ের প্রসঙ্গ : সাক্ষাৎকারে নিজের পারিবারিক বাড়িঘরের অবস্থা তুলে ধরে দেশে ফিরে কোথায় থাকবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন তিনি। ‘আকাশ আমার ছাদ, মাটি আমার ঘর’—এই বক্তব্য ব্যক্তিগত বেদনার পাশাপাশি ঐতিহাসিক স্মৃতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
(০৩) জুলাই–আগস্টের আন্দোলন, দায় ও বিচার : ২০২৪ সালের আন্দোলনে প্রাণহানি এবং নিজের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য সাক্ষাৎকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। অন্যদিকে, আন্দোলন চলাকালে হত্যাকাণ্ডে দায় নির্ধারণের প্রশ্নে তাঁর বক্তব্য ও আইনি অবস্থান স্বাধীন তদন্ত, প্রমাণ এবং আদালতের নথির আলোকে মূল্যায়ন করা জরুরি।
(০৪) আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুনর্মিলনের প্রশ্ন : বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নয়, বরং রাজনৈতিক সহাবস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে বক্তব্যের বাস্তব মূল্যায়ন নির্ভর করবে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের প্রতি তাঁর অবস্থান কী হয়, তার ওপর।
(০৫) নির্বাচন ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ : শেখ হাসিনা জনগণের ভোটে ক্ষমতা নির্ধারণের কথা বলেছেন এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্যে নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে নমনীয়তার ইঙ্গিত থাকলেও বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা নেই।
(০৬) তারেক রহমান, বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতি : বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্ক এবং তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে শেখ হাসিনা সমালোচনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন। এগুলো তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়ন; সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান ও স্বাধীন তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব।
(০৭) ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ও আঞ্চলিক কূটনীতি : তাঁর সাম্প্রতিক অন্যান্য সাক্ষাৎকারে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, তিস্তা ও ফারাক্কা প্রকল্প এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রসঙ্গও এসেছে। এগুলো সুলতানা রহমানের সাক্ষাৎকারের অংশ হিসেবে নিশ্চিত না করে সংশ্লিষ্ট পৃথক সাক্ষাৎকারের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
(০৮) আওয়ামী সরকারের উন্নয়নের বিবরনী পর্যালোচনা : শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময় তার বক্তব্যের বেশীরভাগ সময় বলে থাকেন তার করা উন্নয়ন ও বিরুধী পক্ষের সমালোচনা নিয়ে যা এই মুহুর্তে ভ্যালুলেস। এই সাক্ষাৎকারেও তিনি তার পূণরাবৃত্তি করেছেন অনেক সময় ধরে। এই মুহুর্তে তার দলীয় নেতাকর্মী সহ অন্যান্যদের জানতে চাওয়ার বিষয় একটাই তিনি আদৌ ফিরছেন কিনা , এমনকি ফিরলে কবে কিভাবে ফিরবেন ? এবং ফিরে কি করবেন? যা তিনি এই সাক্ষাৎকারে ষ্পষ্ট করেননি কিন্তু করা উচিত ছিলো।
(০৯) বাংলাদেশী মিডিয়ায় তার কামব্যাক, একটি ইতিবাচক দিক : সুলতানা রহমানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের আগে তিনি ভারতীয় সীমাবদ্ধ মিডিয়াতে ভার্চুয়ালি যুক্ত হতেন। এই প্রথম কোন দেশী সাংবাদিককে ফ্লোর দিলেন। এটা কি তার ইচ্ছাকৃত নাকি ভারতীয় পরিকল্পনা ? অর্থাৎ তিনি কি ভারতে আশ্রয়ে আছেন, নাকি বন্ধী অতিথিশালায় আছেন? ভিডিও কনফারেন্সেও আসছেন না এমনকি ভারতের কোন রাজনৈতিক বা সামাজিক আচার অনুষ্ঠানেও দৃশ্যমান অংশগ্রহণ করছেন না, কিন্তু কেন ? বিশিষ্ট সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দিন পেশাদারিত্বকে বাজি রেখে হলেও তার ইন্টারভিউ নিতে চেয়েছিলেন। শুধু খালেদ নয় এমন আরও অনেকেই উদগ্রীব হয়ে আছেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সুলতানা রহমানকেই সাক্ষাৎকার দিলেন, কিন্তু কেন ? লক্ষনীয়- সুলতানা রহমানের প্রশ্নকরনে সহনশীলতাই ছিলো বেশী, কোন আক্রমণ ছিলোনা ! তবে এই ক্ষেত্রে এসব প্রশ্নের উত্তর না খোঁজাই ভালো তবে লক্ষনীয় এই যে, তিনি ধীরে ধীরে সম্মুখে আসছেন এবং আমরা আশাবাদী যে খুব শিঘ্রই তিনি খালেদ মহিউদ্দিনের সাথে সরাসরি ভিডিও কনফারেন্সেই যুক্ত হবেন।
বিশ্লেষণ: বক্তব্যের আড়ালে কোন তিনটি বড় প্রশ্ন?
প্রথমত, প্রত্যাবর্তন কি রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনেরও সূচনা?
দেশে ফেরার ঘোষণা কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ, দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ, চলমান মামলা এবং জনসমর্থন যাচাইয়ের প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চাওয়ার কথা বলেছেন; কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তন কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে আইনি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক পুনর্মিলন কি ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে?
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রতিশোধের বদলে সহাবস্থানের কথা বলা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে পুনর্মিলন মানে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উপেক্ষা করা নয়। নিহতদের পরিবার, আহত ব্যক্তিরা এবং অভিযুক্তদের—সবার অধিকার রক্ষায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়সংগত বিচার প্রয়োজন। একই মানদণ্ড সব পক্ষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
তৃতীয়ত, জনগণের রায় গ্রহণের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য?
নির্বাচনে জনগণের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার বক্তব্য গণতান্ত্রিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। কিন্তু তার জন্য প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো রাজনৈতিক পক্ষের বক্তব্যই এসব শর্ত পূরণের প্রমাণ নয়; প্রমাণ আসতে হবে বাস্তব প্রক্রিয়া ও পর্যবেক্ষণ থেকে।
শেষ কথা :
সুলতানা রহমানের সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশা, বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে আপত্তি এবং বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির নিজস্ব মূল্যায়ন। তাঁর বক্তব্যে ব্যক্তিগত বেদনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ক্ষমতায় ফেরার রাজনৈতিক প্রত্যাশাও।
কিন্তু এই সাক্ষাৎকারের তাৎপর্য শুধু শেখ হাসিনার বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সামনে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে—রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পথ কী? অতীতের সহিংসতার বিচার কীভাবে হবে? এবং রাজনৈতিক বিরোধ সত্ত্বেও জনগণের অধিকার ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কোনো একক সাক্ষাৎকারে পাওয়া সম্ভব নয়। উত্তর নির্ধারিত হবে প্রমাণ, আইনের শাসন, রাজনৈতিক আচরণ এবং জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগের মধ্য দিয়ে।
