বুধবার,

২৮ অক্টোবর ২০২৬

|

কার্তিক ১৩ ১৪৩৩

XFilesBd

চীনের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ও আইনের শাসন

প্রকাশিত: ২২:০০, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

চীনের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ও আইনের শাসন

দুর্নীতিবিরোধী সুশাসনে বৈশ্বিক নেতৃত্বের পথে নিজেদের অবস্থান জোরদারের ইঙ্গিত দিয়ে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ আইনের মাধ্যমে বিদেশে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে স্থায়ী আইনি কাঠামোর আওতায় আনা হবে। এর মধ্যে রয়েছে পলাতকদের দেশে ফিরিয়ে আনা, বিদেশে অবৈধভাবে রাখা সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং বিদেশে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের ব্যবস্থাপনা।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, চীনের আইনপ্রণেতাদের পর্যালোচনাধীন খসড়াটি আন্তঃসীমান্ত দুর্নীতি দমনে যুক্ত বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্ব স্পষ্ট করবে। পাশাপাশি, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়া কিংবা অবৈধ অর্থ বিদেশি আবাসন ও অফশোর ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের দীর্ঘদিনের সমস্যাও মোকাবিলা করবে। 

প্রস্তাবিত আইনটিকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণাঙ্গ ও কঠোর আত্মশাসন প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা বাস্তবায়নের একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। 
২০১২ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ১৮তম জাতীয় কংগ্রেসের পর থেকে পার্টির আচরণ ও কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি আরও কঠোর হয়েছে এবং দুর্নীতিবিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে বেইজিং একটি নতুন আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পলাতকদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং অবৈধ সম্পদ পুনরুদ্ধারে নতুন অগ্রগতি অর্জনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের চেয়ারম্যান প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সহযোগিতা ও বিনিময় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। 

২০১৬ সালের জানুয়ারিতে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ১৮তম শৃঙ্খলা পরিদর্শনবিষয়ক কেন্দ্রীয় কমিশনের ষষ্ঠ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে সি বিদেশে পালিয়ে যাওয়া দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করা এবং তাদের আত্মসাৎ করা অর্থ পুনরুদ্ধারে আরও জোরালো প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি জি২০, এশিয়া প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা (এপেক) এবং দুর্নীতিবিরোধী জাতিসংঘ কনভেনশনের মতো বহুপক্ষীয় কাঠামোর আওতায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। একইসঙ্গে বিশ্বব্যাপী অপরাধীদের শনাক্তকরণ, পলাতকদের খুঁজে বের করা এবং তাদের আশ্রয়দাতাদের সতর্ক করতে বিশেষ কর্মসূচি পরিচালনার ওপর জোর দেন।

২০১৭ সালের মে মাসে বেইজিংয়ে বেল্ট অ্যান্ড রোড আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ফোরামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য দেওয়ার সময় সি আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগকে নৈতিকতার পথে পরিণত করতে হবে।‘
২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত চীনের বার্ষিক আন্তবিভাগীয় অভিযান ‘স্কাই নেট’-এর মাধ্যমে ৬ হাজার ৯০০ পলাতককে দেশে ফিরিয়ে আনা হয় এবং ৩২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ইউয়ান (৪.৯ বিলিয়ন ডলার) অবৈধ অর্থ পুনরুদ্ধার করা হয়। 

২০২৫ সালে কর্তৃপক্ষ আন্তঃসীমান্ত দুর্নীতির ৫০৫টি মামলা নথিভুক্ত করে, ৯৬৩ জন পলাতককে দেশে ফিরিয়ে আনে এবং ইন্টারপোলের সর্বাধিক ১০০ জন পলাতকের রেড নোটিশ তালিকায় এশিয়া-ভিত্তিক সব সন্দেহভাজনকে আটক করে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চীনের অনুরোধে ইন্টারপোলের ১০০ জন সর্বাধিক সন্ধানী পলাতকের তালিকায় থাকা সাবেক ব্যবসায়ী চৌ চিংহুয়াকে থাইল্যান্ড থেকে চীনে ফিরিয়ে আনা হয়। তার প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে এশিয়ার অন্যান্য দেশে পালিয়ে থাকা ওই তালিকার সব পলাতককে চীনে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বেইজিং নরমাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক চাং লেই বলেন, ‘এ সাফল্য পলাতকদের খুঁজে বের করা এবং অবৈধ সম্পদ পুনরুদ্ধারে চীনের সক্ষমতা তুলে ধরে।‘
তিনি বলেন, ‘এটি প্রমাণ করে যে, চীনের দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টায় কোনো নিষিদ্ধ এলাকা নেই। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা যেখানেই পালিয়ে যাক না কেন, তাদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনা সম্ভব।‘ 

চাং বলেন, ‘পলাতকদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং অবৈধ সম্পদ পুনরুদ্ধার আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্য আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সহযোগিতার সামগ্রিক অগ্রগতি তুলে ধরে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় চীনের উন্নয়ন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে উপস্থাপন করে।‘
বেইজিং নরমাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইয়াং ছাও বলেন, “জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশন বাস্তবায়ন এবং ২০১৪ সালের নভেম্বরে বেইজিংয়ে  অনুষ্ঠিত এপেকের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে গৃহীত ‘বেইজিং ডিক্লারেশন অন ফাইটিং করাপশন’ প্রস্তাব করার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থাপনায় চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা প্রতিফলিত হয়েছে।“

তিনি বলেন, ‘এ পরিবর্তন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচার বিভাগের মধ্যে সহযোগিতা এগিয়ে নিতে এবং আন্তঃসীমান্ত মামলার প্রতিবন্ধকতা কমাতে সহায়তা করে। একইসঙ্গে এটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিদেশে আত্মগোপন ও সম্পদ স্থানান্তরের সুযোগ সংকুচিত করে। ফলে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সহযোগিতায় চীনের কার্যকারিতা বাড়ে।‘
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এ উদ্যোগের প্রতি দৃষ্টি দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ঘাদা ওয়েলির আগে দুর্নীতিবিরোধী জাতিসংঘ কনভেনশনের (ইউএনসিএসি) শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইন প্রণয়নের জন্য চীনের প্রশংসা করেছিলেন।
চায়না ডেইলিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “ইউএনসিএসি’র শর্তের সঙ্গে চীনের দুর্নীতিবিরোধী কাঠামোর আরও বেশি সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠায় দেশটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে দেখে আমি আনন্দিত।”

তিনি ইউএনসিএসি ‘র বাস্তবায়ন পর্যালোচনা প্রক্রিয়ায় চীনের অংশগ্রহণ এবং নীতিনির্ধারণী আলোচনায় দেশটির সম্পৃক্ততারও প্রশংসা করেন। 
তিনি বলেন, ‘এ অংশগ্রহণ শুধু চীনের অঙ্গীকারই তুলে ধরে না, বরং দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক নীতি প্রণয়নে দেশটির ভূমিকা ও অবদানও প্রকাশ করে।‘
পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের  সরকারি নীতিবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রের উপ-পরিচালক চুয়াং তেশুই বলেন, ‘চীনের প্রস্তাবিত আন্তঃসীমান্ত দুর্নীতিবিরোধী আইন এ ক্ষেত্রে আরও মানসম্মত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।‘

তিনি বলেন,’দেশের অভ্যন্তরে এ আইন তদারকি কমিশন, জননিরাপত্তা সংস্থা, কাস্টমসসহ অন্যান্য বিভাগের দায়িত্ব সমন্বয়ে সহায়তা করবে। এর ফলে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত হবে, সমন্বিতব্যবস্থা গড়ে উঠবে এবং আন্তঃসীমান্ত দুর্নীতির মামলা পরিচালনার সামগ্রিক কার্যকারিতা বাড়বে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটি আত্মশাসন প্রতিষ্ঠায় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির অর্জনগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরবে।‘

চায়না ইউনিভার্সিটি অব পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ল-এর আইন বিভাগের অধ্যাপক ইয়াং ওয়েইতোং বলেন, ‘এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চীনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পার্টির পূর্ণাঙ্গ ও কঠোর আত্মশাসন প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। এর জন্য দেশের ভেতরে ও বাইরে, সব খাতে এবং সব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতি মোকাবিলা করা প্রয়োজন।‘

ইয়াং আরও বলেন, ‘কূটনীতি ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কার্যক্রম, বাণিজ্য এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে বিদেশে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে দুর্নীতিতে জড়িয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনার তুলনায় এ সমস্যা মোকাবিলা করা আরও কঠিন।‘ 
তিনি বলেন, ‘আন্তঃসীমান্ত দুর্নীতি দমনে চীনের বিদ্যমান কার্যক্রমকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উপযুক্ত সময় এসেছে।‘
ইয়াং বলেন, ‘আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থাপনায় এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করলে আমাদের প্রচেষ্টা আরও কার্যকর হবে, কঠোর আত্মশাসনের প্রতি পার্টির অঙ্গীকার প্রতিফলিত হবে এবং একটি দায়িত্বশীল বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে চীনের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে সহায়তা করবে।‘