একটি বিশেষায়িত গণপরিবহনব্যবস্থা চালুর জন্য নেওয়া প্রকল্পের পরিণতি দাঁড়িয়েছে সাধারণ মহাসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্তে। ঢাকা–গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পে প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে; অথচ যে দ্রুতগতির বাসসেবা চালুর উদ্দেশ্যে এই উদ্যোগ, তা বাস্তবায়িত হয়নি। দীর্ঘ নির্মাণকাল, ব্যয় বৃদ্ধি, নকশা নিয়ে আপত্তি ও বাস্তবায়নগত জটিলতার পর এবার প্রকল্পের অবকাঠামো সরিয়ে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়ককে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে শুধু একটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নয়, সরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনা ও জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে এসেছে।
গত ১৮ অক্টোবর ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিআরটি প্রকল্প বাতিল করে করিডোরটিকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরদিন ১৯ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের চিঠিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিআরটি স্টেশন, লেন বিভাজক ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সরিয়ে সড়কের উভয় পাশে তিনটি করে লেন চালু করা হবে। পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় নির্মিত দুটি দুই লেনের উড়ালসড়ক চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ রয়েছে। ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসির কার্যক্রম বন্ধ করে তা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতায় নেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে।
তবে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে প্রকল্প বন্ধের সব আনুষ্ঠানিকতা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা এবং আইনি জটিলতা নিষ্পত্তি করে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রাথমিক অগ্রগতি প্রতিবেদন ১৫ দিনের মধ্যে এবং পরবর্তী সময়ে প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি জানাতে বলা হয়েছে। ২০১২ সালের নভেম্বরে অনুমোদিত প্রায় ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত নির্দিষ্ট লেনে দ্রুত বাস চলাচলের ব্যবস্থা করা। প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ২ হাজার ৩৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও নানা জটিলতায় সময়সীমা একাধিকবার বাড়ানো হয়।
প্রকল্পের ব্যয়ের বিভিন্ন অঙ্ক নিয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে তিনটি হিসাব আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা; পরবর্তী সংশোধিত প্রাক্কলন দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে, প্রকল্পে বাস্তবে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেছে - এমন দাবি সঠিক নয়; এটি সংশোধিত ব্যয়ের হিসাব।
২০২৫ সালে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে প্রায় ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা করা এবং মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেনি। প্রকল্পের নকশা ও সম্ভাব্যতা যাচাই নিয়েও তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বিআরটি প্রকল্পের অন্যতম বড় ব্যর্থতা হলো অবকাঠামো নির্মাণের অগ্রগতিকে কার্যকর পরিবহনসেবায় রূপ দিতে না পারা। বাস সংগ্রহের দুটি উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ায় পরিকল্পিত বিশেষ বাসসেবা চালু করা যায়নি। এদিকে নকশাগত সীমাবদ্ধতা, পরিচালনাগত জটিলতা এবং বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের অবকাঠামোগত কাজের অগ্রগতি ছিল প্রায় ৯৭ শতাংশ। কিন্তু প্রকল্পের সামগ্রিক ভৌত অগ্রগতি ছিল ৭৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এই দুই হিসাবের পার্থক্য দেখায়, নির্মাণাধীন অবকাঠামোর অগ্রগতি এবং একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবহনব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি এক বিষয় নয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনায় নকশার ত্রুটি ও সীমিত সক্ষমতার বিষয় উঠে আসে। তাঁদের সুপারিশে বিদ্যমান অবকাঠামোকে সাধারণ যানবাহনের উপযোগী করে ব্যবহারের বিকল্প গুরুত্ব পায়। ২০২৫ সালেও অতিরিক্ত ব্যয় ও সময়ের প্রয়োজন বিবেচনায় বিআরটি বাসসেবা চালুর পরিকল্পনা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
সরকারের নতুন পরিকল্পনার তাৎক্ষণিক লক্ষ্য সড়কে চলাচলের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিদ্যমান অবকাঠামোকে অন্যভাবে কাজে লাগানো। কিন্তু সড়কের লেন বাড়ালেই দীর্ঘমেয়াদে যানজট কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। যানবাহনের চাপ, গুরুত্বপূর্ণ মোড়, গণপরিবহনের ব্যবস্থাপনা, পথচারীদের নিরাপত্তা এবং আশপাশের সড়কের সঙ্গে সংযোগ—সবকিছুর ওপর ফলাফল নির্ভর করবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছে, বিশেষায়িত গণপরিবহন থেকে সরে আসা টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণপরিবহনের জন্য একটি পশ্চাৎপদ পদক্ষেপ হতে পারে। সংগঠনটির মতে, এই সিদ্ধান্ত গাজীপুর পরিবহন মহাপরিকল্পনা এবং ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার সুপারিশের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে, নতুন সড়ক বিন্যাস বাস্তবায়িত হলে বর্তমান অবকাঠামোর কতটা ব্যবহার করা যাবে, অপসারণ ও পুনর্নির্মাণে কত অর্থ লাগবে এবং কাজ শেষ করতে কত সময় প্রয়োজন হবে—এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত নতুন পরিকল্পনার আর্থিক ও পরিবহনগত সুফল নিশ্চিতভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।
ঢাকা–গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পের পরিণতি শুধু একটি পরিবহন প্রকল্পের পরিকল্পনা পরিবর্তনের ঘটনা নয়। এটি উন্নয়ন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা অনুমোদন, বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয়, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সেবা চালুর প্রস্তুতি নিয়ে বড় ধরনের পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তার পাশাপাশি কেন নির্ধারিত সময়ে সেবা চালু করা যায়নি, কোন পর্যায়ে সিদ্ধান্তগত বা কারিগরি দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায় কোথায়—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন সড়ক নির্মাণের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় হলে তার যৌক্তিকতা ও সম্ভাব্য সুফলও জনসমক্ষে তুলে ধরা উচিত। শেষ পর্যন্ত ছয় লেনের সড়ক যান চলাচল সহজ করতে পারে কি না, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের মান ও সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনার ওপর। কিন্তু বিআরটি প্রকল্পের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিলে শুধু অবকাঠামোর ধরন বদলালেই জনদুর্ভোগের অবসান হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা ব্যয়ের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নতুন সড়ক কতটা কার্যকর হবে, আর যে পরিকল্পনা কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারল না, তার ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে?
