নিউ ইয়র্ক শহরের কোলাহলপূর্ণ হৃদপিণ্ড ‘টাইমস্ স্কয়ার’—যা বিশ্বের আলোকোজ্জ্বল সংস্কৃতির অন্যতম মূল কেন্দ্র। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা কোটি কোটি মানুষের পদচারণায় দিন-রাত মুখরিত থাকে এই চত্বর। সেই বিশ্বমঞ্চের বিশাল ডিজিটাল স্ক্রিনগুলোর নিচে, ঝলমলে আলোর সমারোহে যখন দেবী দুর্গার আগমনী ঘণ্টা বাজে এবং কাঁসরের শব্দে বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে, তখন বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য পৌঁছে যায় এক বৈশ্বিক উচ্চতায়। টাইমস্ স্কয়ারে দুর্গোৎসব উদযাপন কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি বিশ্বমঞ্চে প্রবাসী বাঙালি সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক ও গর্বিত জয়যাত্রা।

বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম এই চত্বরে শ্রীশ্রী শারদীয়া দুর্গাপূজার মতো একটি বিশালাকার উৎসবের সূচনা করা ও তা নিখুঁতভাবে পরিচালনা করা সহজ কথা নয়। প্রশাসনিক জটিলতা, নিরাপত্তা ছাড়পত্র, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সমন্বয় এবং প্রবাসে বাঙালি সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করার এই দুঃসাধ্য কাজকে যিনি বাস্তবে রূপ দিয়েছেন, তিনি ‘টাইমস্ স্কয়ার দুর্গোৎসব অ্যাসোসিয়েশন’-এর সাধারণ সম্পাদক নিরুপমা সাহা। তাঁর নেতৃত্ব, নিষ্ঠা এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হিসেবেই আজ আমেরিকার বুকে বাঙালি সংস্কৃতি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।

প্রবাসে থেকেও নিজের শিকড়কে ভুলে না যাওয়া এবং সেই ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করার এক অদম্য বাসনা নিরুপমা সাহাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। নিউ ইয়র্কের বুকে বাঙালি সংস্কৃতিকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ তিনি একক প্রচেষ্টায় শুরু করেননি; বরং বিগত বহু বছর ধরে প্রবাসে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও কমিউনিটি সেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত রেখে তিনি এই ভিত্তিমূল তৈরি করেছেন।
নিরুপমা সাহার বিগত দিনের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রবাসী বাঙালি নারীদের ক্ষমতায়ন, সংস্কৃতি চর্চা এবং অনাবাসী বাঙালিদের সামাজিক ঐক্য সুদৃঢ় করতে তিনি সবসময় সামনের সারিতে ছিলেন। নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সাথে যুক্ত থেকে বাঙালি উৎসব উদযাপনে তাঁর ভূমিকা সর্বজনবিদিত। বিশেষ করে, প্রবাসী নতুন প্রজন্মের বাঙালি শিশুদের কাছে নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ছড়িয়ে দিতে তিনি নানা সাংস্কৃতিক কর্মশালা ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছেন। তাঁর এই সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সংগঠন পরিচালনায় দক্ষতা পরবর্তীতে টাইমস্ স্কয়ারের মতো বিশাল মঞ্চে দুর্গোৎসব আয়োজনের মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করেছে।

ইউনেস্কো (UNESCO) কর্তৃক কলকাতার দুর্গাপূজাকে ‘মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ (Intangible Cultural Heritage of Humanity) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর, প্রবাসে এই উৎসব উদযাপনের গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। টাইমস স্কয়ারের মতো জায়গায় দেবীর আরাধনা সেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গা হলেন আদ্যাশক্তি—যিনি অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে শুভ ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠা করেন। আজকের যুদ্ধ-বিগ্রহ, হানাহানি এবং অনিশ্চয়তায় ভরা বিশ্বে দেবীর দুর্গার এই আগমনী বার্তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। টাইমস স্কয়ারে যখন বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ, চণ্ডীপাঠ এবং ঢাকের আওয়াজ ধ্বনিত হয়, তখন তা কেবল বাঙালিদের হৃদয় ছুঁয়ে যায় না, বরং সেখানে উপস্থিত বিভিন্ন জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষকেও এক অলৌকিক শান্তিতে ভরিয়ে তোলে। ধুনুচি নাচ, সিঁদুর খেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিশ্বের দরবারে ফুটে ওঠে একতা ও সম্প্রীতির আসল রূপ।
আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে বড় ধরনের পাবলিক ইভেন্ট করার ক্ষেত্রে নানা ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা পার হতে হয়। নিউ ইয়র্ক সিটি কর্পোরেশন, পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (NYPD) এবং ট্রাফিক কন্ট্রোল বিভাগের অনুমতি লাভ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। নিরুপমা সাহা তাঁর প্রশাসনিক দূরদর্শিতা ও সুসংগঠিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছেন। তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে স্থানীয় আমেরিকান প্রশাসন ও বাঙালি প্রবাসীদের মধ্যে একটি চমৎকার মেলবন্ধন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

নিরুপমা সাহার নেতৃত্বে টাইমস্ স্কয়ার দুর্গোৎসব অ্যাসোসিয়েশন প্রমাণ করেছে যে, সদিচ্ছা ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে নিজের সংস্কৃতিকে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে উজ্জ্বলভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। তাঁর এই নেতৃত্ব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা। আজ যখন টাইমস্ স্কয়ারের বিলবোর্ডে মহিষাসুরমর্দিনীর রূপ ফুটে ওঠে, আর হাজার হাজার মানুষ একসাথে গেয়ে ওঠে শারদীয়ার গান, তখন প্রতিটি বাঙালির হৃদয় গর্বে ভরে ওঠে। নিরুপমা সাহার দূরদর্শী নেতৃত্ব ও নিষ্ঠার কারণে নিউ ইয়র্কের এই দুর্গোৎসব বিশ্ব সাংস্কৃতিক মানচিত্রে আজ বাঙালির এক অবিনাশী স্বাক্ষর হয়ে টিকে থাকবে। জয়তু নিরুপমা সাহা, জয় হোক নিউ ইয়র্ক টাইমস স্কয়ার পূজা উদযাপন কমিটি।

