বৃহস্পতিবার,

১৫ অক্টোবর ২০২৬

|

আশ্বিন ২৯ ১৪৩৩

XFilesBd

বাংলাদেশের জেনজি মডেল অনুকরণে রাজপথে কৌশল বদলাচ্ছে ভারতীয় তরুণরা

শোভন বিশ্বাস

প্রকাশিত: ১৪:৩৯, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের জেনজি মডেল অনুকরণে রাজপথে কৌশল বদলাচ্ছে ভারতীয় তরুণরা

সম্প্রতি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তরুণ প্রজন্ম বা 'জেনজি' (Gen Z)-এর সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন, প্রতিবাদ কর্মসূচি এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের কৌশলগুলোতে এক অদ্ভুত ও দৃশ্যমান পরিবর্তন নজর কাড়ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সংস্কার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে ভারতীয় তরুণদের তুলে ধরা কৌশল ও বার্তাগুলোর দিকে নজর দিলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সেখানে কীভাবে বাংলাদেশের জেনজি আন্দোলনের সুস্পষ্ট প্রভাব বা অনুকরণ কাজ করছে। বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যেভাবে তরুণরা সংঘটিত হয়েছিল এবং সরকারের ওপর অভূতপূর্ব চাপ সৃষ্টি করে ঐতিহাসিক পরিবর্তন এনেছিল, ঠিক সেই একই আদল ও রূপরেখা এখন ভারতের তরুণদের কার্যক্রমেও প্রয়োগ করতে দেখা যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও সমাজচিন্তকদের গভীর অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার ছিল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উদ্ভাবনী ব্যবহার, ছদ্মবেশী হ্যাশট্যাগ, দেয়ালচিত্র বা গ্রাফিতি আর্ট, প্রতিবাদী মিম এবং একাতমাকেন্দ্রিক স্কেচ বা কার্টুন। ভারতীয় জেনজি কর্মীরা বর্তমানে স্থানীয় নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষ মোকাবিলায় ঠিক এই একই পদ্ধতি হুবহু গ্রহণ করছে। কলকাতা থেকে দিল্লি কিংবা ব্যাঙ্গালুরু—বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতীয় তরুণদের স্লোগান নির্বাচন, প্ল্যাকার্ডের ভাষা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ড তৈরির কৌশলে 'ঢাকা মডেল'-এর সরাসরি অনুকরণ লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি নজরদারি ও সেন্সরশিপ এড়াতে বাংলাদেশি তরুণরা যেভাবে এনক্রিপ্টেড কমিউনিকেশন চ্যানেল এবং সংকেতনির্ভর বার্তা তৈরি করেছিল, ভারতীয় তরুণরাও এখন তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সেই পথেই হাঁটছে।

তবে কেবল ডিজিটাল প্রচারণাতেই সীমাবদ্ধ নয়, রাজপথের কৌশল এবং জনসমর্থন আদায়ের ধরণেও বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রাণিত হওয়ার প্রমাণ স্পষ্ট। দলীয় রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে নিজেদের 'ছাত্র-জনতা' বা অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার যে কৌশল বাংলাদেশে সফল হয়েছিল, ভারতীয় তরুণরা এখন নিজেদের স্থানীয় আন্দোলনগুলোতে সেই একই পরিচয় তুলে ধরছে। স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যানার ব্যবহার না করে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি অর্জন করার এই ধারাটি মূলত বাংলাদেশের জেনজি আন্দোলনের হাত ধরেই এই অঞ্চলে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজিত প্রতিবাদ কর্মসূচিগুলোতে দেখা যাচ্ছে—বক্তব্যের ধরন, মানববন্ধনের জ্যামিতিক বিন্যাস এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বাধা মোকাবিলার ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজপথ থেকে উঠে আসা কৌশলগুলোকেই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এই ধরনের সরাসরি অনুকরণ ও অনুসরণের পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের মধ্যকার অভিন্ন ক্ষোভ—যেমন বেকারত্ব, মতপ্রকাশের ওপর বিধিনিষেধ এবং প্রথাগত রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি চরম অনাস্থা। বাংলাদেশি তরুণরা যেভাবে প্রচলিত ক্ষমতা কাঠামোকে কাঁপিয়ে দিয়ে নিজেদের দাবি আদায় করে নিয়েছে, তা ভারতীয় জেনজিকে এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক সাহস জুগিয়েছে। তাদের কাছে বাংলাদেশের এই আন্দোলন এখন কেবল একটি প্রতিবেশীর গল্প নয়, বরং তরুণ শক্তির সফলতার একটি বাস্তবসম্মত 'ব্লুপ্রিন্ট'। ফলে নিজেদের অধিকার আদায়ে তারা ঢাকার রাজপথের সেই সাহসী ইতিহাস ও কৌশলগুলোকে সচেতনভাবেই নিজেদের সংস্কৃতির সাথে মিলিয়ে চর্চা করছে।

বিশ্বায়নের এই যুগে সীমান্ত পেরিয়ে ধারণার আদান-প্রদান নতুন কিছু নয়, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও আন্দোলনের এই কৌশলগত হস্তান্তর এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিচ্ছে। ভারতের তরুণ প্রজন্ম বাংলাদেশি জেনজির এই ডিজিটাল ও মাঠপর্যায়ের আন্দোলন মডেল অনুকরণ করে নিজেদের কতটুকু সফলতা অর্জন করতে পারবে তা সময়ের ওপর নির্ভর করলেও, ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে প্রভূতির এই সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ছায়া স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, অধিকার আদায়ের দাবিতে এই অঞ্চলের তরুণরা এখন একে অপরের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ও আদর্শে পরিণত হয়েছে।