লুকানো চোখের নজরদারি ও লাগেজের খোঁজে হাহাকার: শাহজালালের রানিং বেল্টে সিন্ডিকেটের অমানবিকতা
- ড. অখিল পোদ্দার
বিদেশের মাটিতে রেমিট্যান্স যুদ্ধ শেষে যখন একজন ক্লান্ত প্রবাসী দেশের আকাশে ডানা মেলেন, তখন তাঁর চোখে থাকে এক বুক আবেগ আর পরিবারের জন্য পরম মমতায় গোছানো কিছু স্বপ্ন। অথচ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাস্টমস ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কতিপয় চক্রের কাছে সেই আবেগ ও ঘামঝরানো উপার্জনকে কেবলই এক একটি লাভজনক ‘শিকার’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
কেনোনা বছরের পর বছর ধরে টার্মিনালের চকচকে মেঝের নিচে লাগেজ চুরি, ট্রলি গায়েব এবং মালামাল কেটে খোয়া যাওয়ার যে অন্ধকার চক্রান্ত জাল বিছিয়ে রাখা হয়েছে, তা আজ আর কোনো প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার সাধারণ গল্প নয়; এটি একটি সংঘবদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ। রানওয়েতে বিমান ল্যান্ড করার পর থেকে ইমিগ্রেশন পেরিয়ে বের হওয়া পর্যন্ত প্রবাসীদের প্রতিটি পদক্ষেপকে এখানে আটকে দেওয়া হয় কৃত্রিম ভোগান্তি ও হয়রানির এক সুনির্দিষ্ট নীল নকশায়।

মঙ্গলবার দুবাই ফেরত আফতাবুল আলম জানাচ্ছিলেন তার কষ্টের কথা। লক্ষীপুর রামগঞ্জের বাসিন্দা আফতাব গেল ১৩ বছর ধরে দুবাই রয়েছেন। এর আগে লাগেজ চুরি, খোয়া যাওয়া ও কাটার অভিযোগ শুনেছেন। এবার তিনিই হলেন ভূক্তভোগী। কথা হচ্ছিল, দোহার নবাবগঞ্জের আলবার্ট সুমনের সঙ্গে। ফ্রান্স থেকে দেশে ফেরার সময় তার আত্মীয় দু’বছর আগে লাগেজ হারিয়েছিলেন। কমপ্লেন করেছিলেন। তার সুরাহা মেলেনি। একইভাবে মঙ্গলবার কাটা লাগেজ দেখান দিনাজপুর চিরিরবন্দরের মাসুমা খাতুন। জর্ডানের ক্লাসিক পোশাক কারখানায় কাজ করেন তিন বছর। সেখান থেকে এর আগে একবার দেশে এসেছিলেন। এবার চলে এলেন চুক্তি শেষ করে। আবার যাবেন কি না সেটা পরে সিদ্ধান্ত নিবেন। চিরিরবন্দর থেকে তার পরিবারের লোকজন এসেছেন তাকে নিতে। কিন্তু কারও মুখে হাসি নেই। কারণ তার লাগেজ কাটা রয়েছে। মাসুমা ঠিক বুঝতে পারছেন না, এটা কি আম্মান থেকে কাটা হয়েছিল নাকি দেশেই হয়েছে এই হঠকারিতা। না জেনে না বুঝে দেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে নারাজ মাসুমা, এই হঠকারিতা বন্ধের দাবি জানান।

দীর্ঘ ভ্রমণের ধকল শেষে ব্যাগেজ বেল্টের সামনে অপেক্ষমাণ একজন যাত্রীর জন্য প্রতিটি মিনিট যেন এক একটি শতাব্দীর সমান। বেল্ট ঘুরতে থাকে, অন্য যাত্রীদের লাগেজ আসে, কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও অনেকের সুটকেসের দেখা মেলে না। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্যাগেজ মেক-আপ এরিয়া থেকে শুরু করে ট্রলি ট্রিপ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় একটি চক্র সক্রিয় থাকে, যারা বেছে বেছে প্রবাসীদের ব্যাগগুলো বিলম্বে বেল্টে তোলে কিংবা কৌশলে সরিয়ে ফেলে। লাগেজের চেইন কেটে মূল্যবান জিনিসপত্র, উপহার সামগ্রী কিংবা প্রসাধন সামগ্রী সরাতে এদের হাত কাঁপেনা। কোনো যাত্রী যদি তাঁর ক্ষতিগ্রস্ত বা হারিয়ে যাওয়া ব্যাগেজ নিয়ে বিমানবন্দরে স্থাপিত কাস্টমস বা বিমান গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাছে অভিযোগ জানাতে যান, তবে তাঁকে পড়তে হয় আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার বদলে যাত্রীকে ঠেলে দেওয়া হয় এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে, যেখানে চরম অবহেলা ও অপমানজনক আচরণই হয়ে ওঠে তাঁদের একমাত্র পাওনা।
কাস্টমসের কথিত ‘গ্রিন চ্যানেল’ ও ‘রেড চ্যানেল’ নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রবাদের মতো ঘুষের রাজত্ব। মালামাল তল্লাশির নামে সাধারণ যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা, লাগেজ তল্লাশির সময় অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করা এবং সামান্য ছাড় পাওয়ার বিনিময়ে অবৈধ বকশিস দাবি করাটা এখানকার নিয়মে পরিণত হয়েছে। অথচ প্রকৃত স্মাগলার বা বড় মাপের প্রভাবশালীদের লাগেজ কোনোরকম বাধা ছাড়াই ইমিগ্রেশন পার হয়ে যায় অদৃশ্য সংকেতে। অন্যদিকে, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের জন্য ব্যবহৃত ট্রলির কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখা হয় আরেক বাণিজ্যিক ধান্ধা হিসেবে। বিমানবন্দরের অসাধু কর্মী ও বহিরাগত একটি সিন্ডিকেট গোপনে ট্রলি আটকে রেখে যাত্রীদের কাছ থেকে চড়া দামে তা ব্যবহারে বাধ্য করে। কোনো বৃদ্ধ বা নারী যদি পরিবারের ভারী মালামাল নিয়ে একা পড়েন, তবে তাঁদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কীভাবে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া যায়, সেই চর্চা চলে সেখানে প্রকাশ্যে। যদিও বিমানবন্দন অথরিটি বহুদিন ধরে এই চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে আসছে। বিভিন্ন সময় চিহ্নিতও হয়েছে। কিন্তু পরে কি হয় তা আর কেউ জানে না।

বিভিন্ন সময়ে নামকাওয়াস্তে তদন্ত কমিটি, ঝটিকা পরিদর্শন কিংবা মোবাইল কোর্টের অভিযানের কথা বলা হলেও শাহজালালের এই অন্ধ কুঠুরির অপরাধচক্র ভেঙে ফেলার মতো টেকসই কোনো পদক্ষেপ আজও দেখা যায়নি। সিভিল অ্যাভিয়েশন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মধ্যে পারস্পারিক দায় চাপানোর সংস্কৃতি এতটাই প্রবল যে, ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের ক্ষোভ শোনার মতো কোনো অভিভাবক এখানে নেই। সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে দিনের পর দিন ব্যাগেজ কেটে জিনিসপত্র চুরি হয়—এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর মেলা ভার। একজন প্রবীণ সাংবাদিক হিসেবে বহু বছর ধরে এই অঙ্গনের অনাচার প্রত্যক্ষ করতে গিয়ে স্পষ্ট হয়েছে যে, সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনিক সদিচ্ছা ও জিরো টলারেন্স নীতি ব্যতিরেকে এই লাগেজ সিন্ডিকেট গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রবাসী ও যাত্রীদের চোখের জল ও ক্ষোভ দিয়ে শুরু হওয়া এই যাত্রাবিরতি বন্ধ করতে না পারলে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কেবল দেশের প্রবেশদ্বার নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতীয় লজ্জার এক প্রতীক হয়েই থেকে যাবে। সম্প্রতি সরকারও এ ব্যাপারে বেশ কঠোর ভূমিকা পালন করছে। আন্তমন্ত্রণালয় শক্তিশালীভাবে এটি দূর করার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করে সংশ্লিষ্ট দফতরকে নির্দেশ দিয়েছে।
[ড. অখিল পোদ্দার, বিশিষ্ট সম্প্রচার সাংবাদিক ও এক্সফাইলস পত্রিকার চিফ এডিটর]
