মন্ত্রী বা নেতার ক্ষমতার পালে সুদিনের হাওয়া লাগলে সংখ্যা বাড়ে মেডিকেল কলেজের। অথচ পুরোণোগুলোর জ্বরা অবস্থা। শুধু নাই আর নাই নিয়ে চললেও এসব প্রতিষ্ঠানে আছে শুধু রাজনীতি আর অপচিকিৎসা। যে কারণে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ক্রমবর্ধমান।
গেল দু’দশকের খতিয়ার গবেষণা করলে দেখা যায়, একের পর এক নতুন মেডিকেল কলেজের নামফলক উন্মোচন হয়েছে। তার বিপরীতে বছরের পর বছর ধরে চলা পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোর চেহারা কঙ্কালসার। সবমিলে দেশের চিকিৎসা শিক্ষায় আজ এক বৈপরীত্যের চিত্র ফুটে উঠেছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, ল্যাবরেটরিতে বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামের ঘাটতি, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আবাসন সংকট এবং সংযুক্ত হাসপাতালে রোগীর শয্যা কিংবা জরুরি যন্ত্রপাতির চরম সংকট। এই মৌলিক ক্ষতগুলোকে সারিয়ে তোলার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবে নতুন নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেই চলেছে শাসকদলের নেতারা। যার সবই রাজনৈতিক বিবেচনায়।

পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতার এই ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হচ্ছেন ঠিকই প্রয়োজনীয় মৌলিক পরিকাঠামো না থাকায় বিঘ্নিত হচ্ছে তাঁদের ভবিষ্যৎ। একাধিক পুরোনো সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ঘুরে দেখা যায়, অ্যানাটমি, ফিজিওলজি কিংবা প্যাথলজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকের অর্ধেকেরও বেশি পদ ফাঁকা পড়ে রয়েছে। পর্যাপ্ত প্র্যাকটিক্যাল ল্যাব ও শিক্ষক না থাকায় বইয়ের পাতায় পড়ে আর কাল্পনিক অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে পড়াশোনা শেষ করতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজের সঙ্গে যেভাবে একটি সুসজ্জিত ও সচল হাসপাতাল থাকার কথা, যেখানে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে রোগী দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন, বহু পুরোনো প্রতিষ্ঠানেও সেই ন্যূনতম সুবিধাটুকু মেলে না। রোগ নির্ণয়ের অপরিহার্য যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর নষ্ট হয়ে পড়ে থাকলেও তা মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে চিকিৎসাসেবার মানের ওপর।
এই যখন দেশের বিদ্যমান মেডিকেল কলেজগুলোর বাস্তব অবস্থা, ঠিক তখনই রাজনৈতিক বিবেচনায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপনের হিড়িক পড়েছে। নীতি নির্ধারকদের অনেকের কাছেই একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা যেন স্থানীয় ভোটারদের সন্তুষ্ট করা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব জাহির করার সবচেয়ে সহজ হাতিয়ার। কিন্তু যে স্থানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার জমি নেই, বা নিকটবর্তী হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা ও রোগী আসার সুযোগ নেই, সেখানে কেবল একটি নামমাত্র প্রশাসনিক ভবন দাঁড় করিয়ে মেডিকেল শিক্ষা শুরু করে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেমন মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তেমনি শিক্ষক সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। পুরোনো কলেজগুলো থেকেই টেনেটুনে কিংবা প্রেষণে শিক্ষক এনে নতুন কলেজগুলোর জোড়াতালি দিয়ে চালনা করা হচ্ছে। যার ফলে নতুন এবং পুরোনো—উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানই একযোগে পঙ্গু হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বমানের চিকিৎসক গড়ে তুলতে হলে প্রাক-মেডিকেল অবকাঠামো ও নিবিড় ক্লিনিক্যাল ট্রেইনিংয়ের কোনো বিকল্প নেই। অথচ রাজনৈতিক বিবেচনায় আসন সংখ্যা বাড়ানো এবং নতুন নতুন অবকাঠামো ঘোষণা করার এই প্রতিযোগিতায় পিষ্ট হচ্ছে চিকিৎসা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হচ্ছে। ফলে কলেজ শেষ করে ডিগ্রি হাতে বের হওয়া নবীন চিকিৎসকেরা অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবিক কাজের মুখোমুখি হতে গিয়ে আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছেন, যা সার্বিকভাবে দেশের পুরো স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর ওপর এক বিরাট ঝুঁকির সৃষ্টি করছে।

রাজধানীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবসায়িক সংগঠন এফবিসিসিআই নেতা প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, সরকারের তরফ থেকে যাবতীয় সুবিধা পাওয়া সত্বেও রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পায় না সরকারি মেডিকেলে। অথচ বেসরকারি মেডিকেলগুলোতে জায়গা দেয়া সম্ভব হয় না। আবার সরকারি মেডিকেলে রোগীর মৃত্যু হলেও তা নিয়ে কারও মাথা ব্যথা নেই। অথচ প্রাইভেটে এসে কেউ যদি স্বজনহারা হন তাহলে ভাঙচুর গোলযোগ হয়। আমরা আসলে উল্টো পথে হাঁটছি কি না তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। কারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কোন ধরণের বৈপরীত্য চলতে পারে না।

মেডিকেল কলেজ মানেই কেবল কিছু ইট-পাথরের দেয়াল কিংবা একটি সাইনবোর্ড নয়; এটি মানবজীবন রক্ষার সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণকেন্দ্র। বিদ্যমান কলেজগুলোতে শিক্ষকের পদ পূরণ, আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন ও হাসপাতালের শয্যা বাড়াতে জরুরি বাজেট বরাদ্দের পরিবর্তে রাজনীতির ময়দানে হাততালি কুড়ানোর জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান চালুর এই মানসিকতা দ্রুত বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের পথ ছেড়ে যদি অবিলম্বে চিকিৎসা শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং পুরোনো অবকাঠামো পুনর্গঠনে জোর না দেওয়া হয়, তবে দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা যে আরও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
