শনিবার,

৩১ অক্টোবর ২০২৬

|

কার্তিক ১৬ ১৪৩৩

XFilesBd

৬টি সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষর। ৪৬৫৬ কোটি ইয়েন ঋণের প্রতিশ্রুতি: পাঁচ বছরে এক লাখ কোটি ইয়েন বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা-

আনিছ রহমান

প্রকাশিত: ১৬:০৯, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

৬টি সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষর। ৪৬৫৬ কোটি ইয়েন ঋণের প্রতিশ্রুতি: পাঁচ বছরে এক লাখ কোটি ইয়েন বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা-

টোকিওর কূটনৈতিক টেবিল থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চার দিনের সরকারি সফর শেষে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ভোর ২টা ৪৮ মিনিটে তাঁর এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে জাপানের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন সমীকরণ তৈরির এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অধ্যায়। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জ্বালানি ও অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তির কর্মসংস্থান এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষ গুরুত্ব পায়। সফরে ছয়টি সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরের পাশাপাশি দুটি উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ইয়েন ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি এসেছে। সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক লাখ কোটি ইয়েন পর্যন্ত জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের প্রত্যাশা সামনে এসেছে।

২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমান ও সানে তাকাইচির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা, রেল যোগাযোগ ও বড় অবকাঠামো প্রকল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের বিষয় গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে টহল জাহাজ সরবরাহ এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়। দুই প্রধানমন্ত্রী বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন কাঠামো এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হন।

সফরে ছয়টি সরকারি সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তায় টহল জাহাজ সরবরাহে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ইয়েন অনুদান চুক্তি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ উন্নয়ন, কৃষি খাতে সহযোগিতা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতার দলিল উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া দুটি উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন প্রকল্পে ১৫ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ইয়েন এবং উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩০ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ইয়েন ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এসেছে। সব মিলিয়ে ঋণের পরিমাণ ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ইয়েন। অন্যদিকে, জাপানের বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থার উদ্যোগে দুই দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরও ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

সফরের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক লাখ কোটি ইয়েন পর্যন্ত জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। এর মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশাও করা হচ্ছে। তবে এই অর্থ তাৎক্ষণিক বিনিয়োগ নয়; এটি আগামী পাঁচ বছরের সম্ভাব্য বিনিয়োগের পূর্বাভাস। একইভাবে ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ইয়েন অনুদান নয়, ঋণ। ফলে এর অর্থ পরিশোধের দায় বাংলাদেশের ওপর থাকবে। বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিও সফরকালে চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়নি। দুই দেশ দ্রুত চুক্তিটি কার্যকর করার বিষয়ে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। জাপানি ঋণের সুদহার কমানো এবং মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয়সংক্রান্ত আলোচনাও প্রত্যাশিত থাকলেও এসব বিষয়ে সুদহার বা প্রকল্প ব্যয় কমানোর কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে নতুন করে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ঐতিহাসিক এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে। বাংলাদেশের তৎকালীন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন ও জাপানের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও নিজ নিজ দেশের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রায় ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শতভাগ শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুবিধা পাওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশেষ সুবিধা, ১৬টি শ্রেণির প্রায় ১২০টি সেবা খাতে বাংলাদেশি দক্ষ পেশাজীবীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তবে স্বাক্ষরের পরও চুক্তিটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়নি। চুক্তির ২২.৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দুই দেশের নিজস্ব আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কূটনৈতিক নোট বিনিময়ের পরবর্তী দ্বিতীয় মাসের প্রথম দিন থেকে এটি কার্যকর হওয়ার কথা। ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া বক্তব্যে জাপান দূতাবাসও চুক্তিটির দ্রুত কার্যকারিতা ও বাস্তবায়নকে দুই দেশের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছে। ফলে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফরে মূল গুরুত্ব পেয়েছে আগে স্বাক্ষরিত চুক্তির বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।

জাপানে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী টোকিও, চিবা ও নাগোয়া অঞ্চলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা পরিদর্শন করেন। ২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ও মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। ২৮ অক্টোবর জাপানের বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থার সদর দপ্তরে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামের সংলাপে বক্তব্য দেন এবং জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। একই সফরে চিবা অঞ্চলের ইচিকাওয়া শহরে নিপ্পন এক্সপ্রেসের আধুনিক পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। ২৯ অক্টোবর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে নাগোয়ার টয়োটা মোটোমাচি গাড়ি উৎপাদন কারখানা ঘুরে দেখেন এবং আধুনিক গাড়ি উৎপাদন ও সংযোজন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। এ ছাড়া জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসো, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার সভাপতি, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের গভর্নর, জাপানের বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থার প্রধানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, উন্নয়ন সহযোগী ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। জাপানপ্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন তিনি।

সামগ্রিকভাবে তারেক রহমানের জাপান সফর বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তবে সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, ঋণের কার্যকর ব্যবহার, প্রযুক্তি স্থানান্তর, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর। এখন এই কূটনৈতিক সমঝোতাগুলোকে বাস্তব বিনিয়োগ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়াই বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।