রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেওয়ার জন্য ৭৬ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা ও তাঁর পরিবারকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, মারধর এবং প্রাণনাশের হুমকির মতো এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। সম্পত্তি জবরদখলের এই পুরো ঘটনার নেপথ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বাড্ডা থানার বিতর্কিত উপ-পরিদর্শক (এসআই) হানিফের প্রত্যক্ষ মদদ ও তাঁর বিশেষ ‘সোর্স’ চক্রের ইন্ধন রয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার। এ ঘটনায় গত ১৫ অক্টোবর ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী মোছা. মাজেদা খাতুন (৭৬)।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উত্তর বাড্ডার তেঁতুলতলা রোডের স্থায়ী বাসিন্দা মাজেদা খাতুন ও তাঁর স্বামী মো. শফিকুর ইসলামের মালিকানাধীন সম্পত্তি জবরদখল করে নিজেদের নামে লিখে নেওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে আসছিল একটি চক্র। এই চক্রের মূল অভিযুক্তরা হলেন— হুমায়রা ইসলাম মাইশা (২০), মজিরুন ইসলাম (৪২) এবং মো. আরিফুল ইসলাম (৪৮)। ভুক্তভোগীদের দাবি, বেআইনি এই দাবির প্রতিবাদ করায় তাঁদের ছেলেকে প্রথমে মারধর করা হয় এবং পরবর্তীতে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। চরম নির্যাতন এখানেই থেমে থাকেনি; গত ৯ অক্টোবর কাশিমপুর কারাগারে বন্দি ছেলেকে দেখতে গেলে সেখানেও ওঁত পেতে থাকা অভিযুক্তরা ওই বৃদ্ধাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন।
পরবর্তীতে গত ১০ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১১টা ১৫ মিনিটে মাজেদা খাতুন নিজ বাসায় অবস্থানকালে বিবাদীরা সম্পত্তি লিখে দেওয়ার দাবিতে আবারো জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা চালান। এতে বাধা দিলে ৭৬ বছর বয়সী এই বৃদ্ধা ও তাঁর বোনকে চুলের মুঠি ধরে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মেরে গুরুতর আহত করা হয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, ভুক্তভোগী পরিবার তাঁদের নিজস্ব জমিতে একটি ডেভেলপার কোম্পানির মাধ্যমে ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিলে সেখানেও অভিযুক্তরা বেআইনিভাবে বাধা সৃষ্টি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধান ও অভিযোগপত্রে প্রকাশ পায়, ২ নম্বর বিবাদী মজিরুন ইসলাম মূলত বাড্ডা থানার এসআই হানিফের বিশেষ ‘সোর্স’ হিসেবে কাজ করেন। পুলিশ কর্মকর্তা হানিফের উসকানি, আশ্রয়-প্রশ্রয় ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ নিয়েই বিবাদীরা একের পর এক এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন। চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা পরিবারটি ইতোমধ্যেই বাড্ডা থানা ও গাজীপুরের কোনাবাড়ী থানায় দুটি পৃথক লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পাশাপাশি এসআই হানিফের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে বয়োবৃদ্ধ মাজেদা খাতুন জানমালের নিরাপত্তা ও পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষায় পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি), ডিএমপি কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি)-এর দপ্তরে আবেদনপত্রের অনুলিপি পাঠিয়ে জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সার্বিক বিষয়ে অভিযুক্ত মজিরুনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো পরিষ্কার জবাব না দিয়ে উল্টো প্রতিবেদককে বলেন, "এটাতো ডিসি আমাকে ফোন দিবে, আপনি কেন ফোন দিয়েছেন? আমি এখন ডিসি অফিসে যাচ্ছি, আপনি ফোন রাখুন।" অন্যদিকে, প্রধান অভিযুক্ত বাড্ডা থানার এসআই হানিফকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রুহুল কবীর খান এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের স্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, বিতর্কিত এই এসআই হানিফের বিরুদ্ধে সিভিল পোশাকে গভীর রাতে অন্য এক নারীর বাসায় অনধিকার প্রবেশ, আসবাবপত্র তছনছ, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুটপাটসহ প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার আরও একটি গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগী নারী ডিএমপি কমিশনার বরাবর পৃথক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন, যার বিস্তারিত তথ্য উঠে আসবে আমাদের আগামী অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
