কুষ্টিয়ার খোকসায় একতারপুর শতবর্ষী বটগাছের নিচে এক মনোরম ও ছায়ানিবিড় পরিবেশে বর্ণাঢ্য আয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাউল ও লোকশিল্পীদের নিয়ে এক জমজমাট লোকগানের আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে এর আবহ ছড়িয়ে দিতে এই ব্যতিক্রমী আয়োজন করে খোকসা কমিউনিটি লাইব্রেরি। শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল থেকে দিনব্যাপী চলা এই লোকগানের আসরটি এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

শনিবার সকালের মিষ্টি রোদ আর শতবর্ষী বটগাছের সুশীতল ছায়ায় শুরু হওয়া এই লোকগানের অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা গুণী শিল্পীরা অংশ নেন। দিনভর চলা এই আয়োজনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছুটে আসা শত শত ভক্ত ও শ্রোতার সরব উপস্থিতিতে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে।

গ্রামীণ ঐতিহ্যের টানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব বয়সের মানুষ গাছের নিচের এই প্রাকৃতিক মঞ্চের চারপাশ ঘিরে বসেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে গভীর মনোযোগ সহকারে গ্রামবাংলার শেকড়সন্ধানী লোকগান উপভোগ করেন।

লোকগানের এই বর্ণাঢ্য আসরে প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করেন খোকসা উপজেলার নির্বাহী অফিসার খালিদ বিন মনসুর, কুষ্টিয়া জজ কোর্টের পিপি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জয়দেব বিশ্বাস, অধ্যক্ষ এস এম আলিম রেজা, বাংলাদেশ ভারত মৈত্রী পরিষদের নেতা নিতাই কুন্ড এবং খোকসা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যাপক মদন মোহন বিশ্বাসসহ স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও সংস্কৃতিানুরাগীগণ। অতিথিদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে আরও বেশি মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটানা চলা এই লোকগানের অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন দেশের খ্যাতনামা ও প্রতিভাবান শিল্পীরা। যাদের কণ্ঠে মরমী ও বাউল গান শ্রোতাদের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটে, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— রেজওয়ান খান, স্বপন আলী মৃধা, খোকসা কমিউনিটি লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা জসীম উদ্দীন, জীবন কুমার বিশ্বাস, মানসী গোলজার, দুলাল সরকার, রওশন আলী, রফিকুল ইসলাম, সঞ্জয় মিত্র এবং ফকির সরোয়ার উদ্দিন শাহ। তাঁদের পরিবেশিত একতারা, দোতারা ও ঢোলের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। বাউল সুরের মূর্ছনায় শ্রোতারা হারিয়ে যান অন্য এক আবেগঘন জগতে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি খোকসা উপজেলার নির্বাহী অফিসার খালিদ বিন মনসুর তাঁর বক্তৃতায় এই আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, আধুনিকতার ছোঁয়ায় আজ আমাদের গ্রামীণ পরিবেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন ঐতিহ্য ও লোকগানের এই নান্দনিক অনুষ্ঠান সত্যিই আমাদের গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে। এত প্রাণবন্ত সংগীত পরিবেশনা এবং বিপুল সংখ্যক শ্রোতার এমন স্বতঃস্ফূর্ত সমাগম আয়োজনটিকে সার্থক করে তুলেছে। এ ধরনের উদ্যোগ আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করে।

খোকসা কমিউনিটি লাইব্রেরির এমন সুন্দর ও ব্যতিক্রমী আয়োজন স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমী ও সাধারণ মানুষের মাঝে দারুণ সাড়া ফেলেছে। শতবর্ষী বটগাছের নিচে এমন মিলনমেলা এবং লোকগানের চর্চা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

দিনব্যাপী এই লোকগানের আসর কেবল বিনোদনের খোরাকই জোগায়নি, বরং আবহমান বাংলার লোকসংস্কৃতির শিকড়কে আরও শক্তভাবে ধারণ করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।


