বৃহস্পতিবার,

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

|

আশ্বিন ৮ ১৪৩৩

XFilesBd

নিয়োগপ্রক্রিয়া, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ: নির্বাচন স্থগিত-প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৩:০২, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিয়োগপ্রক্রিয়া, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ: নির্বাচন স্থগিত-প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন

মানবিক বিপর্যয়, দুর্যোগ ও সংকটের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। অথচ সেই মানবিক প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ প্রশাসন, নিয়োগপ্রক্রিয়া, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ব্যবস্থাপনা পর্ষদ নির্বাচনকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক অভিযোগ ও প্রশ্ন সামনে এসেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের মধ্যে এ নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ, অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে কথিত নিয়মবহির্ভূত নিয়োগ, বিপুল অর্থের আর্থিক অনিয়ম, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় প্রতিনিধিত্ব ও স্বচ্ছতা নিয়ে আপত্তি এবং সংগঠনের অভ্যন্তরে বিভাজন সৃষ্টির অভিযোগ।  তবে অভিযোগগুলোর ধরন ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোর প্রেক্ষাপট এমন কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে, যার উত্তর নথি, বিধিমালা ও নিরপেক্ষ  তদন্তের  মাধ্যমেই স্পষ্ট হতে পারে।

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রশ্নের সূত্রপাত:

সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে সেক্রেটারি জেনারেল ও ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল নিয়োগকে ঘিরে।
সাম্প্রতিক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল পদে নিয়োগের জন্য গত ৮ জুলাই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং ১৫ জুলাই আটজন প্রার্থীর পরীক্ষা নেওয়া হয়। কিন্তু পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া মো. এহসান-ই-এলাহিকে ১২ আগস্ট ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরদিন মো. হাবিবুর রহমান খানকে সেক্রেটারি জেনারেল পদে নিয়োগ দেওয়া হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, সেক্রেটারি জেনারেল পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি বা পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি।
এখানেই উঠছে মৌলিক প্রশ্ন—নিয়োগ যদি প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়ার কথা থাকে, তাহলে পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া একজন প্রার্থী কীভাবে নিয়োগ পেলেন? আর সেক্রেটারি জেনারেল পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বাছাইপ্রক্রিয়া কী ছিল?
প্রশ্নগুলো কেবল ব্যক্তি নিয়োগের নয়; প্রশ্নটি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগনীতির প্রয়োগ ও প্রশাসনিক জবাবদিহির।

নিয়োগের পর বোর্ড অনুমোদন—প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন প্রশ্ন:

প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৩ আগস্ট নিয়োগের পর একইদিন নতুন সেক্রেটারি জেনারেল বোর্ড সভা আহ্বান করেন এবং ১৬ আগস্ট অনুষ্ঠিত সভায় দুই নিয়োগ অনুমোদন করা হয়। একই সভায় বোর্ড সদস্য অ্যাডভোকেট এস এম মাহিদুল ইসলাম সজীব নোট অব ডিসেন্ট দেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
যদি এই তথ্য সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—নিয়োগের পূর্বে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন সম্পন্ন হয়েছিল, নাকি নিয়োগের পর বোর্ডের অনুমোদনের মাধ্যমে সিদ্ধান্তটি অনুমোদিত করা হয়েছে?
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, সেক্রেটারি জেনারেল ও ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল নিয়োগের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত সরাসরি সংশ্লিষ্ট। ফলে নিয়োগের সিদ্ধান্ত, অনুমোদনের সময়কাল এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৩৫ কোটি টাকার অভিযোগ—প্রশ্নের উত্তর কোথায়:

এর সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় এসেছে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের দাবি, এনামুল হককে ঘিরে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
একই সঙ্গে প্রটোকল কর্মকর্তা কামালের বিরুদ্ধে সংগঠনের অভ্যন্তরে বিভাজন সৃষ্টি, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতার অভিযোগও করেছেন তারা।
তবে এত বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের ক্ষেত্রে বক্তব্য বা অভিযোগই শেষ কথা হতে পারে না। প্রয়োজন হিসাবের নথি, অনুমোদনপত্র, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা যাচাই। অভিযোগ সত্য হলে কারা সুবিধাভোগী, কোন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানের অর্থ কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তরও সেখানেই নিহিত।

১৪ নিয়োগের অভিযোগও কি নিছক অভিযোগ:

রেড ক্রিসেন্টের অভ্যন্তরে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ ঘুরছে—চেয়ারম্যানের পিএস আসিফ আলমাসের বিরুদ্ধে ১৪ জনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব নিয়োগের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনও জড়িত ছিল। 
তারপরও বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ নিয়োগপ্রক্রিয়া যাচাইয়ের পথটি খুব স্পষ্ট—বিজ্ঞপ্তি, আবেদনকারীর তালিকা, বাছাই কমিটি, পরীক্ষার ফল, অনুমোদন এবং নিয়োগপত্র; প্রতিটি ধাপের নথি পর্যালোচনা করলেই বোঝা সম্ভব, কোথাও বিধিবহির্ভূত হস্তক্ষেপ হয়েছিল এবং তা চিন্হিত করে এর সাথে কারা জরিত তাদের সকলকেই আইনের আওতায় আনা জরুলী। অভিযোগের সবচেয়ে শক্তিশালী জবাব বক্তব্যে নয়, নথিতে।

নির্বাচন স্থগিত—অস্বস্তির আরেক অধ্যায়:

নিয়োগের পাশাপাশি রেড ক্রিসেন্টের ব্যবস্থাপনা পর্ষদ নির্বাচন নিয়েও তৈরি হয়েছে জটিলতা।
সোসাইটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে ২০২৬–২০২৮ মেয়াদের ব্যবস্থাপনা পর্ষদ নির্বাচনসংক্রান্ত ভোটার তালিকা, আচরণবিধি, মনোনয়নসহ বিভিন্ন নোটিশ প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু ১৭ সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত নির্বাচন ও বিশেষ সাধারণ সভা স্থগিত করা হয় এবং নির্বাচন কমিশনও বিলুপ্ত করা হয়।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এখানে প্রশ্ন আরও গভীর—যে নির্বাচনপ্রক্রিয়া এতদূর এগিয়েছিল, সেখানে স্বচ্ছতা ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্নগুলো আগে কেন নিষ্পত্তি হলো না? নির্বাচন স্থগিতের প্রয়োজনীয়তা কেন তৈরি হলো? আর নতুন প্রক্রিয়ায় কীভাবে আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের জন্য নয়; রেড ক্রিসেন্টের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী, সদস্য এবং বৃহত্তর জনস্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

নির্বাচন ঘিরে কথিত বৈঠক:

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের অভিযোগ, চেয়ারম্যানের বিরোধী হিসেবে পরিচিত মোফাক্কের রানার বাসায় নির্বাচনসংক্রান্ত একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবিষয় মোফাক্কের কাছে জানতে চাইলে তিনি ফোন রিসিভ করেননী।

প্রশ্নের কেন্দ্রে এখন জবাবদিহি:

রেড ক্রিসেন্টের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়; বরং কোন সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে, কোন বিধির ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে এবং সেই সিদ্ধান্তের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কে বা কারা জবাবদিহির আওতায় থাকবেন—তা স্পষ্ট করা।
বিশেষ করে সেক্রেটারি জেনারেল ও ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল নিয়োগের প্রক্রিয়া, বোর্ডের অনুমোদনের সময়কাল, কথিত ১৪টি নিয়োগ, প্রায় ৩৫ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এবং নির্বাচন স্থগিতের কারণ—প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে নথিপত্রের আলোকে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
কারণ কোনো অভিযোগ সত্য হলে তার প্রতিকার প্রয়োজন; আর অভিযোগ অসত্য হলে সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। উভয় ক্ষেত্রেই প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি।

চেয়ারম্যানের দায়িত্বের প্রশ্নও এড়ানো যায় না:

প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন সামনে আসে—প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে গৃহীত হয়েছে এবং ব্যবস্থাপনা পর্ষদের নেতৃত্ব হিসেবে চেয়ারম্যানের ভূমিকা ও দায়িত্বের সীমা কোথায়?


বক্তব্যের অপেক্ষায় রেড ক্রিসেন্ট:

এসব অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও এ প্রতিবেদন প্রস্তুত পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযুক্ত বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
রেড ক্রিসেন্ট কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়; দুর্যোগ ও মানবিক সংকটে মানুষের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা। সেই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নিয়োগ ও নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়ে যখন ধারাবাহিক প্রশ্ন ওঠে, তখন সবচেয়ে প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে স্বচ্ছতা, নথির উন্মুক্ততা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত।
কারণ প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে ব্যক্তির প্রভাব নয়—বিধির শাসন, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত এবং জবাবদিহির সংস্কৃতি।
রেড ক্রিসেন্টকে ঘিরে এখন যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর উত্তরও তাই বক্তব্যে নয়—নথিতে, প্রক্রিয়ায় এবং নিরপেক্ষ অনুসন্ধানেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব।