আজকের যান্ত্রিক ও প্রযুক্তিনির্ভর যুগে যখন গ্রামীণ সমাজের অবয়ব দ্রুত বদলাচ্ছে, ফেসবুক-স্মার্টফোনের কৃত্রিম নীল আলোয় বুঁদ হয়ে থাকাই যখন তরুণ প্রজন্মের একমাত্র বিনোদন, ঠিক তখন বিপরীত স্রোতে হেঁটে এক অন্যরকম বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন কুষ্টিয়ার খোকসার এক স্বপ্নবাজ মানুষ—জসীম উদ্দীন। কুষ্টিয়ার খোকসায় শতবর্ষী বটগাছের সুশীতল ছায়ায় সম্প্রতি যে বর্ণাঢ্য লোকগানের আসর বসেছিল, তার মূল উদ্যোক্তা ও রূপকার ছিলেন এই জসীম উদ্দীনই। শুধু লোকগানের আসর আয়োজন করেই তিনি থেমে থাকেননি; দিনের পর দিন গ্রামীণ সাধারণ মানুষকে বিনা পয়সায় বই পড়ানো এবং মোবাইল ও প্রযুক্তির আসক্তি থেকে দূরে রেখে সমাজকে ফিরিয়ে আনার এক অদম্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

জসীম উদ্দীনের এই লড়াইয়ের মূল হাতিয়ার হলো ‘খোকসা কমিউনিটি লাইব্রেরি’। একদিকে এই লাইব্রেরির মাধ্যমে এলাকার শিশু, কিশোর ও সর্বস্তরের মানুষের হাতে তিনি তুলে দিচ্ছেন জ্ঞানের আলো, বিনা মূল্যে পড়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন বইয়ের বিশাল ভাণ্ডার। অন্যদিকে মাটির সুবাস, শেকড়ের টান আর আবহমান বাংলার হারিয়ে যাওয়া লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে আয়োজন করছেন একের পর এক মনোজ্ঞ লোকগানের আসর। তাঁর এই দ্বিমুখী প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য একটাই—ডিজিটাল আসক্তির বিষবাষ্প থেকে সমাজকে মুক্ত করে আবার আগের মতো পারস্পরিক আড্ডা, মেলবন্ধন এবং প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনা।

গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) খোকসার একতারপুর এলাকায় সেই শতবর্ষী বটগাছের নিচে আয়োজিত লোকগানের আসরটি যেন সেই স্বপ্নেরই বাস্তব রূপ। খোকসা কমিউনিটি লাইব্রেরির আয়োজনে সেদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন বরেণ্য বাউল ও লোকশিল্পীরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা সেই মিলনমেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও শত শত গ্রামবাসী উপস্থিত ছিলেন। বটতলার সেই মনোরম ছায়াঘেরা পরিবেশে যখন একতারা, দোতারা আর ঢোলের টুংটাং শব্দে বাউল গান বেজে উঠল, তখন তা কেবল নিছক কোনো বিনোদন ছিল না; বরং তা ছিল যান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে মানুষের মনের খোরাক মেটানোর এক নিভৃত আকুতি। আর এই পুরো আয়োজনের পেছনে নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন খোকসা কমিউনিটি লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা জসীম উদ্দীন।

কাছের মানুষ ও শুভানুধ্যায়ীরা জানান, জসীম উদ্দীন পেশায় বা অন্য পরিচয়ে যা-ই হোন না কেন, মন থেকে তিনি একজন খাঁটি সংস্কৃতিকর্মী ও সমাজসংস্কারক। তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন যে, স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে আজ গ্রামের পাড়া-মহল্লার সেই ঐতিহ্যবাহী আড্ডাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়ছে, কমছে মানসিক সংযোগ। এই সামাজিক অবক্ষয় ও যান্ত্রিকতা রোধ করার একমাত্র ওষুধ হলো বই পড়া এবং নিজস্ব লোকসংস্কৃতির চর্চা বাড়ানো। এই ভাবনা থেকেই তিনি খোকসা কমিউনিটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। লাইব্রেরিতে বই পড়ার সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি যখনই সুযোগ পান, তখনই লোকগানের আসর বসিয়ে মাটির মানুষের মনকে চাঙ্গা করে তোলেন।

শনিবারের ওই লোকগানের আসরে শুধু শ্রোতা হিসেবেই জসীম উদ্দীন উপস্থিত ছিলেন না, বরং একজন শিল্পী ও আয়োজক হিসেবে তিনি নিজেই সংগীত পরিবেশন করেন। তাঁর কণ্ঠে মরমী ও লোকগানের সুর যখন বটতলার বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, তখন উপস্থিত দর্শকরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তা উপভোগ করেন। আধুনিকতার মোড়কে যখন আমাদের নিজস্ব শেকড়গুলো একে একে হারিয়ে যেতে বসেছে, ঠিক তখন জসীম উদ্দীনের মতো ব্যক্তিরা নিজ উদ্যোগে সমাজকে সঠিক পথে রাখার পাহারাদারের ভূমিকা পালন করছেন।

খোকসার মাটিতে জসীম উদ্দীনের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, সদিচ্ছা থাকলে একক প্রচেষ্টাতেও সমাজ পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখা সম্ভব। একটি কমিউনিটি লাইব্রেরি আর কিছু লোকগানের সুর দিয়ে তিনি যেভাবে তরুণ প্রজন্মকে মোবাইল আসক্তি থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। জসীম উদ্দীনের এই স্বপ্নবাজ অভিযাত্রা কেবল কুষ্টিয়া বা খোকসা নয়, বরং পুরো দেশের জন্যই এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। মাটির মায়া ও বইয়ের আলো বুকে ধারণ করে জসীম উদ্দীনের এই পথচলা সমাজকে এক আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

