বৃহস্পতিবার,

০৮ অক্টোবর ২০২৬

|

আশ্বিন ২২ ১৪৩৩

XFilesBd

দিনটি মনে নেই কিন্তু সালটা মনে আছে ২০০৭: প্রসঙ্গ স্বাস্থ্যখাতে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ

ডাঃ আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী

প্রকাশিত: ০৪:০৩, ৮ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ০৪:০৭, ৮ অক্টোবর ২০২৬

দিনটি মনে নেই কিন্তু সালটা মনে আছে ২০০৭: প্রসঙ্গ স্বাস্থ্যখাতে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ

দিনটি মনে নেই কিন্তু সালটা মনে আছে ২০০৭: প্রসঙ্গ স্বাস্থ্যখাতে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ

- ডাঃ আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী

আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া মিশন হাসপাতালের পাঠ চুকিয়ে ২০০৪-এর শেষ দিকে তৎকালীন আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালের দায়িত্ব নিলাম। একজন মেজর জেনারেলের মায়ের নামে করা এই হাসপাতালটি তারা ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারেনি বলেই আমাদের কাছে বিক্রি করেছিলেন! ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে এখনকার মতো খুব আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা না থাকলেও চমৎকার লোকেশন, সেনাবাহিনী ও সিভিলের প্রথিতযশা চিকিৎসকদের কারণে এখানে ঢাকার আপার ক্লাস মানুষজন আস্থার সঙ্গে চিকিৎসা নিতে আসতেন!

আমার বড় বোনের আগ্রহের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খুব ভালো একটা জায়গা ছেড়ে নতুন হাসপাতালের চ্যালেঞ্জটা নিলাম! প্রথম দিকে মন খারাপ থাকলেও আস্তে আস্তে শ্রম, মেধা, ক্লিনিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স এবং একটা স্বপ্নে বিভোর হয়ে হাসপাতালটাকে বড় করতে শুরু করলাম!

২০০৫ সালে মাত্র ৪ বেডের অ্যাডাল্ট আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) স্থাপন করলাম। সে সময় হেলথ কেয়ার সেক্টরে সহজে কেউ বিনিয়োগ করতে চাইত না!! বাংলাদেশের স্বনামধন্য আমেরিকা-ফেরত ইন্টেনসিভিস্ট (আইসিইউ বিশেষজ্ঞ) প্রফেসর ডা. ওমর ফারুক ও ডা. আব্দুল ওয়াদুদ বেগকে সঙ্গে নিয়ে আইসিইউ-এর যাত্রা শুরু করলাম। দারুণ সুনামের সঙ্গে এই ইউনিটের যাত্রা শুরু হয় এবং জটিল ও মুমূর্ষু রোগীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে!

সেই সময় আইসিইউ ছিল হাতে গোনা কয়েকটি, রীতিমতো সোনার হরিণ!

কিছুদিন পর ডেলিভারি কিংবা সিজারিয়ান অপারেশনের পর নবজাতক শিশুদের জন্য এনআইসিইউ (NICU)-এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে মাত্র ৬ বেডের একটি NICU শুরু করলাম। বাংলাদেশের স্বনামধন্য শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. মো. মনির হোসেনের তত্ত্বাবধানে ডা. মামুন, ডা. বিপুল, ডা. মানিফা এবং দক্ষ কিছু নার্সকে সঙ্গে নিয়ে অল্প দিনের মধ্যেই আমাদের এই ছোট ইউনিটটি ঢাকাসহ সারা দেশে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে!

বর্তমানে এই NICU ৩০ বেডের, অ্যাডাল্ট আইসিইউ ২৫ বেডের, স্টেপ-ডাউনসহ এই হাসপাতালে জিরো-টু-অ্যাডাল্ট আইসিইউ-এর সংখ্যা প্রায় ১০০ শয্যা!! সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল নতুন ১৫ শয্যার ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট উদ্বোধন করেছেন এবং এর গুণগত মান নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন! স্বনামধন্য আইসিইউ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. মাকসুদুল আলম বাসু, ডা. মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান এবং ডা. ফারহা আন্দালিব ও তার এক্সপার্ট ডাক্তার-নার্সের সমন্বয়ে মানুষের কল্যাণে দিবারাত্রি চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন সারা দেশ থেকে আসা অসংখ্য জটিল ও মুমূর্ষু রোগীদের!!

বলছিলাম ২০০৭ সালের কথা। একটি অশ্রুসিক্ত ঘটনার কারণে আরেক গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট পেডিয়াট্রিক আইসিইউ (PICU) স্থাপনের উদ্যোগ নিলাম!!

ঘটনাটি শেয়ার করতে চাই—রাত তখন ৯টা বাজে... একটা অ্যাম্বুলেন্স নরসিংদী থেকে এলো! স্বজনদের উৎকণ্ঠা আর উন্নত চিকিৎসার আকুতি চোখে ভেসে উঠল।

পেশেন্ট কেয়ারের লোকজন অ্যাম্বুলেন্স থেকে দ্রুত রোগীটিকে নিয়ে জরুরি বিভাগে গেল—বয়স ৫/৬ হবে, একটা কন্যাশিশু—দেখেই মনে হচ্ছিল নিষ্প্রাণ! গায়ে হাত দিয়ে শীতল পরশে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল! ইমার্জেন্সি ডাক্তার সব পরীক্ষা করে বলল—শিশুটি পথের মাঝে অনেক আগেই মারা গিয়েছে!

মা-বাবার গগনবিদারী চিৎকার এখনও আমার কানে বাজে! চিকিৎসক হয়েও ভাবলাম—এই শোক কী করে সইবে তারা! এক ফাঁকে রোগীর অন্য স্বজনদের কাছে জানতে চাইলাম—এত দেরি করে আসলেন কেন!?

বলল—নরসিংদীর হাসপাতাল থেকে ঢাকা রেফার করছে.... পথিমধ্যে মাতুয়াইল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল, শিশু হাসপাতাল ও আরেকটি বেসরকারি হাসপাতাল ঘুরে ৬ নম্বর হাসপাতাল হিসেবে তৎকালীন আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে আসে ওই হতভাগা শিশুটি! আমি সারা রাত ঘুমাতে পারিনি সেদিন!

রাত জেগে সেই রাতেই সিদ্ধান্ত নিলাম—পেডিয়াট্রিক আইসিইউ (PICU) করব, শিশুদের বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়া রোধ করব! অল্প দিনের মধ্যেই ৫ বেডের PICU এবং ৪ বেডের ডায়ালিসিস ইউনিট চালু করলাম! তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান এবং প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম আর খান স্যারসহ বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট চিকিৎসক এই ইউনিট দুটো উদ্বোধন করেছিলেন! তাদের সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। নিজের ভেতরে একটা প্রশান্তি কাজ করছিল, গর্ববোধ হচ্ছিল যে—শিশুদের কল্যাণে একটা বড় উদ্যোগ নিয়েছি!

ওহ, বলা হয়নি—আমাদের ছোট ৫০ বেডের হাসপাতাল এখন ৩৫০ শয্যাবিশিষ্ট ইউনিভার্সাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল! ইতোমধ্যে এই চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি ১ যুগে পদার্পণ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন পেশাগত পরীক্ষায় ঈর্ষণীয় ফলাফলের পাশাপাশি এখান থেকে উত্তীর্ণ হয়ে ডাক্তাররা দেশে-বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রিসহ সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে!

কিন্তু এটা বুঝতে পারিনি যে—এই PICU-এর স্বজনরাই মিথ্যা অপবাদ দিয়ে, ভুল চিকিৎসার অপব্যাখ্যা দিয়ে ভিউ ব্যবসা করে আমার স্বপ্নের PICU-কে কলঙ্কিত করবে.... আমার এবং আমার প্রতিষ্ঠানের যে দীর্ঘদিনের সুনাম, তা ক্ষুণ্ণ করবে পরিকল্পিতভাবে!!

আমি এত বোকা—এই স্বার্থান্বেষী, বেইমান, নিষ্ঠুর মানুষদের সন্তানের জন্য কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে গেলাম!!!!??

সম্প্রতি ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের একজন ক্রিটিক্যাল শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তাল সো-কল্ড সোশ্যাল মিডিয়া এবং কোনো কোনো গণমাধ্যম! সবার একটাই নিউজ ক্যাপশন—ভুল চিকিৎসায় শিশু আভানের মৃত্যু হয়েছে!! অথচ একই দিনে এবং তার আগে-পরে প্রতিদিন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ৮/১০ জন রোগীর মৃত্যু হচ্ছে!! সেগুলো নিয়ে হইচই হয়নি কেন!!??

কারণ আভানের বাবা এখন সাংবাদিক। তার হাতেই তো সকল ক্ষমতার উৎস!! তিনি বলামাত্রই ১০/১৫টা চ্যানেল চলে আসছে... তার কথামতো—ভুল চিকিৎসায় আভানের মৃত্যু হয়েছে.... মোবাইল সাংবাদিকদের যা খুশি তা বলে লাইভ সম্প্রচার!! সো-কল্ড কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ভিউ ব্যবসার জন্য একটু পরপর ছদ্মবেশে একেকবার একেক রকম মুখরোচক, চটকদার, মিথ্যা, বানোয়াট, অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক বক্তব্যে সয়লাব দেশ!!

আচ্ছা, আমার দুটো প্রশ্ন—বাচ্চার বাবার অভিযোগ হচ্ছে, তার বাচ্চাকে ডাক্তার ভুল চিকিৎসা করে মেরে ফেলেছে!!! এটা কি সম্ভব!!? মারার জন্য তো এফসিপিএস, এমডি, পিএইচডি কিংবা এফআরসিপিসিএইচ (ইউকে) লাগে না!! একটা ২ টাকা দামের বলাকা ব্লেডই যথেষ্ট!! কী দরকার ছিল আমার কোটি কোটি টাকা খরচ করে—ভেন্টিলেটর, ওয়ার্মার, ডিফিব্রিলেটর, ফুল-টাইম স্পেশালিস্ট রেখে PICU করে নিজের মান-সম্মান ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার!!??

তার মানে আমরা শিশুটিকে ভুল চিকিৎসা করে মেরে ফেলিনি! ইতোমধ্যে আমাদের নিজেদের তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কমিটি এসে পাই-পাই করে সব তদন্ত করেছে এবং অভিযোগের সত্যতা পায়নি!!

তবুও ভিউ ব্যবসায়ীরা ক্ষান্ত হয়নি—এবার ভুল চিকিৎসার গল্প বাদ দিয়ে শুরু হলো রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা!! যত অশ্লীল ও নোংরাভাবে হেয় করা যায়—সেই প্রচেষ্টা চলছে দিনরাত!!

প্রশ্ন হচ্ছে, এই অপপ্রচার... অপব্যাখ্যা, ভুল তথ্য দিয়ে ভিউ ব্যবসা করে কার লাভ, কার ক্ষতি হলো!!?

ভিউ ব্যবসায়ী হয়তো ২/৩ শ ডলার কামিয়েছে!! সাথে কিছু বিপথগামী ডাক্তারও এই অপপ্রচারে যুক্ত হয়েছে!! আমরা ধিক্কার জানাই তাদের!

কিন্তু ক্ষতি হলো পুরো জাতির। সাধারণ মানুষের!! কারণ চিকিৎসকদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ, নার্সদের আর্তনাদ—সর্বোপরি হেলথকেয়ার ইন্ডাস্ট্রিতে আমার মতো বিনিয়োগকারীরা উৎসাহ হারাচ্ছে!! ভাবছিলাম খুব শীঘ্রই—কিডনি প্রতিস্থাপন, বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন শুরু করব এ দেশের মানুষের জন্য, যারা বিদেশ গিয়ে উচ্চ মূল্যে এসব চিকিৎসা গ্রহণ করে!!! কিন্তু আমার উপলব্ধি হচ্ছে—বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ!!

পরিশেষে একটা উদাহরণ দিয়ে শেষ করতে চাই—পাশের দেশ ভারতে ডাক্তার দেবী শেঠীকে ভগবান শেঠী বানিয়েছে তাদের দেশের মানুষের ভালোবাসা আর সম্মান!! আর আমার দেশের আধুনিক হৃদরোগ চিকিৎসার পথিকৃৎ ডাক্তার মোমেনুজ্জামান স্যারকে কোর্টে তুলে উল্লাস করে আমার দেশের মানুষ!! পার্থক্য এটাই!!

ও আরেকটা কথা—আমি কয়েকদিনের জন্য আমেরিকা গিয়েছিলাম। আজ যখন ফিরছি—প্লেনে বসে লেখাটা লিখলাম! সেখানকার হসপিটালে কর্মরত ডাক্তার বন্ধুদের জিজ্ঞেস করলাম—তোদের হাসপাতালে গণমাধ্যমের লোকজন প্রবেশ করতে পারে কি না!!!? উত্তর—প্রবেশ নিষেধ!! কারণ রোগীর ডায়াগনসিস কিংবা গোপনীয়তা সংশ্লিষ্ট ডাক্তার, রোগীর প্রকৃত স্বজন (legal guardian) ছাড়া কারও জানার অধিকার নেই!!

এই হলো সভ্য দেশের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য! শ্রদ্ধেয় খান আতার কথা মনে পড়ছে! তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি—“আবার তোরা মানুষ হ”—নতুনভাবে নির্মাণ করা হোক!! এখনকার অমানুষগুলোকে মানুষ বানানোর প্রত্যয়ে।

এবার কিছুটা বুঝতে পারছি—মানুষ কেন নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যায়!! কিন্তু বিশ্বাস করুন—আমি এ দেশ ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না, কারণ—আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি!

প্রধানমন্ত্রী সমীপেষু—“সবার আগে বাংলাদেশ”—কি আপনি মন থেকেই বিশ্বাস করেন!! যদি আপনার এই স্বপ্ন পূরণে একজন মানুষকে আপনি খোঁজেন—আমি সবার আগে হাত তুলব!

সবশেষে—শিশু আভানের জন্য শোকগাথা! বাবা-মায়ের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা। কারণ ডাক্তার হলেও, আমিও একজন বাবা!!