বৃহস্পতিবার,

০৮ অক্টোবর ২০২৬

|

আশ্বিন ২২ ১৪৩৩

XFilesBd

নোবেল পাওয়ার খবর শুনে মেয়েদের জড়িয়ে ধরলেন কার্ল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৪:৪৩, ৮ অক্টোবর ২০২৬

নোবেল পাওয়ার খবর শুনে মেয়েদের জড়িয়ে ধরলেন কার্ল

এক ঘরেই যখন দুই অবিশ্বাস্য প্রতিভা। নোবেল পাওয়ার খবর শুনে মেয়েদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন সদ্য নোবেলজয়ী কার্ল, পাশেই স্ত্রী অধ্যাপক ডাঃ মিশেল। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ল ডাইসারোথ গতকাল মেডিসিনে নোবেল পেলেন।  তিনি এমন একটা বিষয়ের জন্য নোবেল পেলেন যে তা ভবিষ্যতে মানব মস্তিস্কের চিকিৎসারই গতিপথ পাল্টে দিবে। আগে এই ছবির দুই অবিশ্বাস্য প্রতিভা কেন বলেছি তাই বলি।  কার্ল ডাইসারোথের পাশেই যে ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে আছেন তিনি তাঁর স্ত্রী মিশেল মনজে। মিশেল মনজে নিজেও একজন বিশ্বখ্যাত নিউরো সাইন্টিস্ট। ক্যান্সার চিকিৎসায়  এক মহাবিপ্লব ঘটিয়েছেন মিশেল। কার্ল বলেছিলেন মিশেল মনজের সাহায্য ছাড়া তার পক্ষে এই সফলতা সম্ভব ছিলোনা। আবার মিশেল ও কার্লের  আবিষ্কৃত অপটোজেনেটিক্স নিজের নিউরো ক্যানসার গবেষণায় ব্যবহার করেছেন। তাঁরা দুজনেই স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। কার্ল যেমন  স্ট্যানফোর্ডের  বায়োইঞ্জিনিয়ারিং ও সাইকিয়াট্রি বিভাগের অধ্যাপক। মিশেল তেমনি নিউরোলজি বিভাগের  অধ্যাপক। বর্তমান বিশ্বে এই দম্পত্তিকে সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিজ্ঞানী দম্পত্তিদের মধ্যে একজন ধরা হয়।  যেমন ছিলেন মে-ব্রিট মোজার ও  এডভার্ড মোসার দম্পত্তি। যদিও যৌথভাবে নোবেল পাওয়ার দুই বছরের মাথায় তাঁদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। 


.কার্ল এবং মিশেল নিজেদের গবেষণার পাশাপাশি অনেক জটিল স্নায়ুবিক রোগ ও ক্যান্সার গবেষণায় যৌথভাবে কাজ করেছিলেন।  কার্ল ডাইসারোথের নোবেল জয়ের কারণ, তিনি এমন এক উদ্ভাবন করেছেন, যা ইঁদুরের মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ভবিষ্যতে তা মানুষের ক্ষেত্রেও সফল হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কার্ল নোবেল পেয়েছেন  অপটোজেনেটিক্স এর জন্য।  মূলত অপটোজেনেটিক্স হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে আলোর সাহায্যে জীবন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষ বা নিউরনের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই প্রযুক্তির উদ্ভাবন মানব মস্তিষ্কের জটিল রহস্য উন্মোচনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করলো। কারণ এখন পর্যন্ত গবেষকরা জানতে পেরেছেন কীভাবে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট সার্কিট মানুষের স্মৃতি, অনুভূতি এবং আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। 
.যা বিষণ্নতা, অটিজম, সিজোফ্রেনিয়ার মতো জটিল মানসিক রোগের উৎস বুঝতে সাহায্য করছে। অন্ধত্ব দূর করতে এবং মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার গবেষণাতেও অপটোজেনেটিক্স পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও নিখুঁতভাবে হবে। 
.
আগে যেখানে মস্তিষ্কের কোনো অংশকে উদ্দীপিত করতে ইলেকট্রোড ব্যবহার করা হতো ( এখন অপটোজেনেটিক্সের মাধ্যমে কোনো ক্ষতি ছাড়াই নির্দিষ্ট একটি নিউরনকে আলোর সাহায্যে সুইচের মতো 'অন' বা 'অফ' করা যায়।
.
আগে ইলেকট্রোড ব্যবহার করলে এটি নির্দিষ্ট অংশ ছাড়াও আশেপাশের সব কোষকে একসাথে প্রভাবিত করতো। ফলে এটা বোঝা যেতোনা। 
 এখন যখনই ফাইবার অপটিকের মাধ্যমে নীল আলো ফেলা হয়, তখন নিউরনটি সক্রিয় হয়ে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। আবার কোনো কোনো বিশেষ প্রোটিনের ওপর হলুদ আলো ফেললে নিউরনটি নিষ্ক্রিয় অর্থাৎ অফ হয়ে যায়। 
.
এটা কি যে ফলপ্রসূ তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। কারণ মানব মস্তিষ্কে প্রায় ১০০ বিলিয়ন নিউরন রয়েছে। এই জটিল নেটওয়ার্কের ঠিক কোন অংশটি আমাদের কোন আচরণ বা আবেগের জন্য দায়ী, তা আগে সুনির্দিষ্টভাবে জানা অসম্ভব ছিল। অপটোজেনেটিক্স এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। 
কার্ল ডাইসারোথরা এই পরীক্ষাটি চালিয়েছেন ইঁদুরের উপর। সেখানে দেখা গেছে   বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষে আলো ফেলে তার ভয়, ক্ষুধা, রাগ বা স্মৃতির মতো বিষয়গুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে চালনা বা পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন।
.
কার্লের আগে দুই জার্মান বিজ্ঞানী পিটার হেগেমান ও জর্জ নাগেল একটি এককোষী শৈবালের মধ্যে ‘চ্যানেলরোডোপসিন’ নামের এক প্রোটিন আবিষ্কার করেছিলেন। পরে কার্ল ডাইসেরথ ওই প্রোটিনকে স্নায়ুকোষের জন্য একটি আলোক-নিয়ন্ত্রিত সুইচে রূপান্তর করেন। 
.
পিটার হেগেমান ও জর্জ নাগেলও কার্লের সঙ্গে এ বছর নোবেল পেয়েছেন। 
.
অন্যদিকে মিশেল মনজে  আবিষ্কার করেছেন ব্রেন ক্যান্সার কীভাবে মস্তিষ্কের সিগন্যাল হাইজ্যাক করে বৃদ্ধি পায়, যা ক্যান্সার চিকিৎসায় এক বিশাল মাইলফলক ধরা হয়। মনজে কে বলা হয় ক্যানসার নিউরোসায়েন্সের বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে শীর্ষ বিজ্ঞানী। 
.
শিশুদের একটি অত্যন্ত মারাত্মক ও নিরাময়-অযোগ্য ব্রেন টিউমার হলো ডিআইপিজি (Diffuse Intrinsic Pontine Glioma)। মনজে হলেন প্রথম বিজ্ঞানী যিনি ল্যাবরেটরিতে এই ক্যানসারের কোষ সফলভাবে কালচার করতে পেরেছিলেন। 
.
ক্যানসার রোগীদের কিমোথেরাপির পর যে মানসিক যে বিভ্রান্তি  হয়, তার পেছনের স্নায়ভিত্তিক যে কারণ ও মাইক্রোগ্লিয়া কোষের ভূমিকা তিনিই প্রথম উন্মোচন করেছিলেন। 
.
কার্ল সরাসরি চিকিৎসা না করলেও মিশেল কিন্তু নিজে প্র্যাকটিসিং ডাক্তারও। 
.
মিশেল তাঁর ল্যাবের আবিষ্কারকে সরাসরি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে ব্রেন ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদের জীবন বাঁচাতে ব্যবহার ব্যবহার করেন। এই দুই অবিশ্বাস্য প্রতিভা যখন এক ঘরে, তখন কয়েক বছরের মধ্যে আরও একটি নোবেল এই ঘরেই আসতে যাচ্ছে। মিশেলের গবেষণাও তাই প্রমাণ করে। 
.
আর সেটা যদি হয়ে যায় গার্টি কোরি-কার্ল কোরি ও মেব্রিট মোসার ও এডভার্ড মোসার দম্পত্তির পর তারা হবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেলজয়ী তৃতীয় কোন দম্পত্তি। 
.
বাঙালী দম্পত্তিরা যখন ফেইসবুক আর ইন্সটাগ্রামে  রিলস দেখে কথিত সেলিব্রেটি নামক অমুক গায়িকা আর তমুক নায়িকার বিয়ে আর ডিভোর্স হয়েছে বলে ফুটো তালাশে ব্যস্ত, আর  যত্রতত্র বয়ান দেয়ায় ত্রস্ত তখন এসব প্রতিভারা মানব জগতের চিকিৎসা ইতিহাসই পাল্টে দিচ্ছেন!