বৃহস্পতিবার,

১৫ অক্টোবর ২০২৬

|

আশ্বিন ২৯ ১৪৩৩

XFilesBd

কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ দাবি

হুতি হামলায় সৌদি আকাশপথে চরম বিশৃঙ্খলা: ফ্লাইট বাতিলের ধাক্কায় চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে হাজারো প্রবাসী

আবু সাহিদ

প্রকাশিত: ১১:০৯, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১৪:৩০, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

হুতি হামলায় সৌদি আকাশপথে চরম বিশৃঙ্খলা: ফ্লাইট বাতিলের ধাক্কায় চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে হাজারো প্রবাসী

সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক-বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে তীব্র অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটায় সৌদি কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে একাধিক বিমানবন্দর সাময়িক বন্ধ ও ফ্লাইটের সময়সূচি বাতিল ঘোষণা করেছে। আকস্মিক এই সিদ্ধান্তের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশি যাত্রীরা। মধ্যপ্রাচ্যগামী ও ফিরতি ফ্লাইটগুলোর অস্বাভাবিক শিডিউল বিপর্যয়ে হাজার হাজার প্রবাসী এখন ঢাকাসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে চরম দুর্ভোগ, অনিশ্চয়তা ও মানবেতর পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন।

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ, বাণিজ্যিক কেন্দ্র জেদ্দা এবং দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের একাধিক বিমানবন্দরে হুতিদের ক্রমবর্ধমান হামলার জবাবে বিমান নিরাপত্তা জোরদার করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনা করে রিয়াদ ও জেদ্দামুখী বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট হয় গতিপথ পরিবর্তন করেছে, না হয় মাঝপথ থেকে ফিরে গেছে অথবা চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়েছে। এ ধরনের আকস্মিক সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। যাত্রীদের বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছানোর পরও শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট বাতিলের বার্তা জানিয়ে দেয়া হচ্ছে, যার কোনো বিকল্প ব্যবস্থা বা স্পষ্ট নির্দেশনা এয়ারলাইনসগুলোর পক্ষ থেকে তৎক্ষণাৎ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না।

এই চরম অব্যবস্থা ও ফ্লাইট বাতিলের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছেন রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মামগামী হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী। হজ ও ওমরাহ যাত্রী ছাড়াও বহু সাধারণ শ্রমিক, যাদের ছুটির মেয়াদ বা ভিসার মেয়াদ একদম শেষ পর্যায়ে, তারা এখন চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী অপেক্ষা করছেন ফ্লাইটের কোনো ইতিবাচক সংবাদের আশায়। দূর-দূরান্ত থেকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলা অর্জিত জমানো টাকায় কেনা টিকিট হাতে প্রবাসীরা দিনের পর দিন টার্মিনালে বা তার আশপাশের এলাকায় বসে প্রহর গুনছেন। অনেক যাত্রীর ভিসার মেয়াদের শেষ দিন ঘনায়মান; নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারলে চাকরি হারানোর সরাসরি ঝুঁকিতে পড়বেন তারা। অন্যদিকে, ছুটি কাটাতে দেশে আসার অপেক্ষায় থাকা প্রবাসীরাও সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকা পড়ে আছেন, যেখানে আবাসন ও খাবারের সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে।

 

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, হুতি হামলার কারণে নিরাপত্তার অজুহাতে নিয়মিত ফ্লাইটের পাশাপাশি অনেক চার্টার্ড ও বিশেষ ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে। ফ্লাইট পুনর্নির্ধারণ বা রি-শিডিউলিং সংক্রান্ত তথ্যের জন্য বিমান সংস্থাগুলোর কাউন্টারে প্রবাসীদের দীর্ঘ দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। তবে এয়ারলাইনসগুলোর চরম সমন্বয়হীনতা ও সঠিক তথ্যের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যাত্রীরা অভিযোগ করছেন, কোনো ধরনের আগাম বার্তা ছাড়াই বিমানবন্দরে আসার পর তাদের জানানো হচ্ছে ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত। ফলে থাকার জায়গা না পেয়ে এবং অতিরিক্ত খরচের ভার বহন করতে না পেরে অনেক প্রবাসী খোলা আকাশের নিচে টার্মিনালে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।

প্রবাসীদের এই মানবিক সংকটে সরকারি সহায়তা ও কূটনৈতিক তৎপরতার ঘাটতিও দৃশ্যমান হচ্ছে। বিমানবন্দরগুলোতে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের কার্যক্রম পর্যাপ্ত না হওয়ায় সঠিক দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন না বিড়ম্বনায় পড়া মানুষগুলো। সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ বা আটকে পড়া প্রবাসীদের ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয়ের কোনো স্পষ্ট সুসংবাদ দেয়া সম্ভব হয়নি। সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেও, এই ধরনের আকস্মিক বিশ্বসংকটে তাদের সুরক্ষা ও সহায়তায় দ্রুত পদক্ষেপের অভাব চরম হতাশার সৃষ্টি করেছে।

সীমান্ত পারের এই নিরাপত্তা সংকট কতদিন স্থায়ী হবে বা হুতিদের হামলা থামবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা অব্যাহত। তবে নিরাপত্তার অজুহাতে কেবল ফ্লাইট বাতিল করে দায়িত্ব শেষ করার যে প্রবণতা এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অমানবিক। ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি যাত্রীদের জরুরি টিকিটিং সহায়তা, বিনামূল্যে রি-বুকিং, সাময়িক থাকার সুব্যবস্থা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য অবিলম্বে কূটনৈতিক আলোচনার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে প্রবাসীদের জীবন-জীবিকা যেমন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে, তেমনি দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহেও এর নেতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে।