রোববার,

১৮ অক্টোবর ২০২৬

|

কার্তিক ২ ১৪৩৩

XFilesBd

বন্দর ছাড় নয়, বাণিজ্যের গতি বাড়ানোর বাজি – বাংলাদেশের লাভের অঙ্ক, জবাবদিহিতার শর্ত কোথায় ?

আনিছ রহমান

প্রকাশিত: ১১:১৪, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

বন্দর ছাড় নয়, বাণিজ্যের গতি বাড়ানোর বাজি – বাংলাদেশের লাভের অঙ্ক, জবাবদিহিতার শর্ত কোথায় ?

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ঢাকার আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের মিলনায়তনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠানটির মধ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সরকারের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক পরিচালন-দক্ষতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো। তবে সম্ভাব্য আর্থিক লাভের পাশাপাশি চুক্তির স্বচ্ছতা, শ্রমিকদের অধিকার ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষর করেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান এসা কাজিম। অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, ডিপি ওয়ার্ল্ডের গ্রুপ প্রধান নির্বাহী যুবরাজ নারায়ণসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। চুক্তিটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় সম্পাদিত হয়েছে।

প্রকাশিত চুক্তিসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড শুরুতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা দেবে এবং প্রথম ১০ বছরে টার্মিনাল আধুনিকায়নে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য কনটেইনারপ্রতি রাজস্বের অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা টার্মিনালের গড় রাজস্বের ভিত্তিতে প্রায় ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ হতে পারে। এর বাইরে বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা নির্দিষ্ট ফি পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে এসব অঙ্কের প্রকৃত আর্থিক তাৎপর্য নির্ভর করবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত, হিসাবের পদ্ধতি, পরিচালন ব্যয়, বিনিয়োগের সময়সীমা এবং রাজস্ব নির্ধারণের ভিত্তির ওপর। তাই শুধু ঘোষিত অর্থের পরিমাণ নয়, রাষ্ট্রের নিট আয় কত হবে এবং বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নিউমুরিং টার্মিনাল দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। আধুনিক যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও উন্নত পরিচালনপদ্ধতি চালু হলে কনটেইনার ওঠানো-নামানো, পণ্য খালাস এবং জাহাজের অপেক্ষার সময় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে আমদানি-রপ্তানিকারকদের সময় ও ব্যয় সাশ্রয় এবং সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে এসব সুফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত হবে না। বন্দরের কর্মদক্ষতা বাড়াতে চুক্তিতে নির্ধারিত লক্ষ্য, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে প্রযোজ্য আর্থিক জরিমানা বা অন্যান্য প্রতিকারের বিধান কার্যকর হতে হবে। নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন ও স্বাধীন নিরীক্ষা ছাড়া ঘোষিত লক্ষ্যের সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের তুলনা করাও কঠিন। চুক্তি স্বাক্ষরের দিনই এর বিরোধিতা করে আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের মিলনায়তনের সামনে অবস্থান নেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের একাংশও সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন। গত কয়েক মাস ধরে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রতিবাদে তাঁরা অনশন, বিক্ষোভ ও মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন।আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, দেশের আমদানি-রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই টার্মিনাল দেশীয় ব্যবস্থাপনাতেই পরিচালিত হওয়া উচিত। তাঁদের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা, চাকরির শর্ত এবং শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ। ফলে চুক্তির অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি শ্রমিক-কর্মচারীদের অধিকার ও কর্মপরিবেশের বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান এবং কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন।ইনভেস্ট বাংলাদেশের প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় টার্মিনাল পরিচালনা ও আধুনিকায়নের দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ড পালন করবে; কিন্তু জমি, মূল অবকাঠামো ও মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে। অর্থাৎ, পুরো চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে—এমন বর্ণনা চুক্তির প্রকৃত কাঠামোর সঙ্গে মেলে না। তবে ১৫ বছরের পরিচালন চুক্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আর্থিক হিসাব ও কর্মদক্ষতা তদারকির ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, সেটিই বড় বিবেচ্য।

চুক্তির শর্ত প্রকাশ, রাষ্ট্রের রাজস্ব হিসাব নিরীক্ষা, বিনিয়োগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, কর্মদক্ষতার লক্ষ্যমাত্রা যাচাই এবং শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে নিয়মিত তথ্য জনসমক্ষে আনা জরুরি। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা, শুল্ক প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের আওতাধীন কার্যক্রমে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে বজায় থাকতে হবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড চুক্তির সাফল্য শেষ পর্যন্ত ঘোষিত বিনিয়োগের অঙ্ক দিয়ে নয়, বরং বাস্তবে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কতটা কমল, রাষ্ট্রের আয় কতটা বাড়ল, শ্রমিকদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকল এবং চুক্তির শর্ত ভঙ্গের ক্ষেত্রে জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত হলো—তার ভিত্তিতেই পরিমাপ করা উচিত। বাংলাদেশের জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, শ্রমিকের অধিকার ও জনস্বচ্ছতার মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা।