যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রস্থল নিউ ইয়র্কের ঐতিহ্যবাহী বরো অব ম্যানহাটন কমিউনিটি কলেজ (বিএমসিসি) মিলনায়তনে এক উৎসবমুখর ও প্রাণবন্ত পরিবেশে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত ‘৫ম নিউ ইয়র্ক ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ফেয়ার অ্যান্ড চেম্বার অ্যানুয়াল বিজনেস এক্সপো ২০২৬’। বাংলাদেশ-ইউএস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (BUCCI) এবং গ্রেটার নিউ ইয়র্ক চেম্বার অব কমার্সের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই মেলাটি মূলত উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তঃদেশীয় দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে এক বিশাল বৈশ্বিক সেতু হিসেবে কাজ করছে। উদ্বোধনী দিনেই যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ এবং পার্শ্ববর্তী বহু দেশের দূরদর্শী ব্যবসায়ী, উদ্ভাবক, শিল্পপতি, উদীয়মান উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, আন্তর্জাতিক প্রদর্শক এবং চেম্বার প্রতিনিধিরা এতে বিপুল উৎসাহে অংশগ্রহণ করেন।

বাণিজ্য মেলার জাঁকজমকপূর্ণ এই উদ্বোধনী মঞ্চে বিশ্ব অর্থনীতির নতুন গতিপথ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসার এবং বহুজাতিক বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বাণিজ্য খাতের শীর্ষ প্রতিনিধিগণ। বাংলাদেশ-ইউএস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের দূরদর্শী প্রেসিডেন্ট ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ (MD, FASN), গ্রেটার নিউ ইয়র্ক চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট ও সিইও মার্ক জ্যাফে এবং ইউএস স্মল বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রশাসক কেলি লফলারের উপস্থিতি পুরো আয়োজনে একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক মাত্রা যোগ করে।
অনুষ্ঠানে বিশদ বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইউএস স্মল বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রশাসক কেলি লফলার একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, স্থানীয় ও বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার অপরিহার্য ভূমিকার কথা গভীর গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিশ্ব অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিনিয়ত নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা, সীমান্ত পেরিয়ে ব্যবসার পরিধি সম্প্রসারণ করা এবং বহুজাতিক ব্যবসায়িক যোগাযোগ জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি।
সমাবেশে আবেগঘন অথচ বৈজ্ঞানিক ও বস্তুনিষ্ঠ উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বিশ্বমঞ্চে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী-আমেরিকানদের অবদানকে অত্যন্ত গর্বের সাথে স্মরণ করেন। তিনি তুলে ধরেন কীভাবে সংখ্যায় তুলনামূলক ছোট হওয়া সত্ত্বেও এই প্রবাসী সমাজ নিজেদের মেধা, কঠোর পরিশ্রম ও পেশাদারিত্ব দিয়ে আমেরিকার বিজ্ঞান, মহাকাশ প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা, উদ্ভাবন ও ব্যবসায়িক খাতে স্থায়ী ছাপ রেখে চলেছেন। তিনি উদাহরণ হিসেবে আধুনিক বিশ্ব স্থাপত্যের অন্যতম পথিকৃৎ ড. ফজলুর রহমান খান, শিক্ষায় বৈপ্লবিক রূপান্তর আনা খান একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সালমান খান, তথ্যপ্রযুক্তির নতুন অধ্যায় ইউটিউবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জাওয়েদ করিম, আর্সেনিক নিরসন প্রযুক্তির আবিষ্কারক ড. আবুল হুসাম, পরিবেশবান্ধব ও মহাকাশ গবেষণার ধাতব প্রকৌশলী আবদুস সাত্তার খান, বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ড. এম. জাহিদ হাসান এবং সফল শিল্পোদ্যোক্তা সৈয়দ জাকি হোসাইনের মতো আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বদের সাফল্যগাথা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে পুনরুল্লেখ করেন। একই সাথে তিনি দীর্ঘদিনের সুদৃঢ় ও বিশ্বস্ত অংশীদারিত্বের জন্য মার্ক জ্যাফে এবং অ্যামিট শাহকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বন্ধনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ আরও তুলে ধরেন যে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুই দেশই পারস্পরিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক একটি বাণিজ্যিক সম্পর্ক উপভোগ করছে। বর্তমান বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ কেবল আমেরিকার তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্যের অন্যতম প্রধান যোগানদারই নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চমানের বিভিন্ন শিল্পপণ্য, কাঁচামাল ও সেবা আমদানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এক সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই এক্সপো উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তির আদান-প্রদান, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদী টেকসই অবকাঠামোগত মেলবন্ধন তৈরির এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম।

এবারের আন্তর্জাতিক এক্সপোর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও আকর্ষণীয় অধ্যায়টি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাণিজ্য, অর্থনীতি ও সমাজসেবায় অনন্য অবদানের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ‘ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬’ প্রদান। আয়োজক কমিটি গভীর অনুসন্ধান ও মেধা মূল্যায়নের ভিত্তিতে বাণিজ্যিক সাফল্যের শীর্ষে অবস্থান করা ৬ জন অনন্য ব্যক্তিত্বকে এই বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করেন। অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত এই বিশিষ্ট গুণীজনরা হলেন—
নিউ ইয়র্কের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মডার্ন প্যাকেজিং ইনকর্পোরেটেডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও প্রখ্যাত সমাজসেবক সৈয়দ জাকি হোসাইন; যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাডভান্স ফার্মাসিউটিক্যাল ইনকর্পোরেটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও ওষুধ শিল্পের সফল উদ্যোক্তা লিয়াকত হোসাইন; ওয়াশিংটন ডিসি ভিত্তিক শীর্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (WUST) চেয়ারম্যান ও চ্যান্সেলর এবং পিপলএনটেকের সফল প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও প্রকৌশলী আবুবকর হানিফ; আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও কর্পোরেট বিনিয়োগ সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন’ (IFDC)-এর প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও সিইও কাজী হেলাল আহমেদ; যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত জিএফবি (GFB) গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক ভূঁইয়া; এবং বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের অন্যতম ধারক, দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান ড. আরিফুর রহমান।
সম্মাননা প্রাপ্তির পর ভূষিত এই আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বরা এক্সপোর আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করেন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও প্রযুক্তিগত উত্তরণ নিয়ে মূল্যবান দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। তারা উল্লেখ করেন যে, এই ধরণের প্ল্যাটফর্ম নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের গ্লোবাল নেটওয়ার্কিং তৈরি করতে সাহসী ভূমিকা রাখবে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের উদীয়মান পণ্য, প্রস্তুতকৃত পাটজাত সামগ্রী, ফার্মাসিউটিক্যালস, চামড়াজাত পণ্য এবং আইটি ও সফটওয়্যার খাতের বিশাল সম্ভাবনাকে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের সামনে উপস্থাপন করার ওপর তাঁরা জোর তাগিদ দেন।

প্রথম দিন থেকেই বিএমসিসি মিলনায়তনে মেলা প্রাঙ্গণে ছিল উপচে পড়া ভিড়। স্টলগুলোতে প্রদর্শিত হয়েছে দুই দেশের অত্যাধুনিক সেবা ও পণ্যসামগ্রী। শুধু প্রদর্শনীতেই এটি সীমাবদ্ধ ছিল না; মেলার সমান্তরালে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিভিন্ন থিমেটিক টেকনিক্যাল সেমিনার, যেখানে বিশ্ব বাণিজ্য কৌশল, ক্রস-বর্ডার ফাইন্যান্সিং, ডিজিটাল ট্রেড ফ্রেমওয়ার্ক এবং স্মল বিজনেস স্কেলিং নিয়ে আলোচনা করেন বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞরা। মেলার অন্যতম সফল অংশ ছিল সরাসরি বিটুবি (B2B) ম্যাচমেকিং সেশন, যেখানে বিভিন্ন দেশের আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টরা মুখোমুখি বসে দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যের যৌথ চুক্তি ও নতুন নতুন ব্যবসায়িক পথ উন্মোচন করেন। এই আন্তর্জাতিক ট্রেড ফেয়ার ও এক্সপো কেবল ব্যবসায়ের প্রসার নয়, বরং গ্লোবাল ইকোনমিতে বাংলাদেশকে এক নতুন উচ্চতায় স্থায়িত্ব দেওয়ার লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে।
