হাওরের বাতাসে এখনো কাটেনি ফনি ভূষণ সরকারের লাশের গন্ধ। ঘরে ঘরে চলছে স্বজন হারানোর বুকফাটা আহাজারি। অথচ নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মূল কারিগর ও মামলার ৪ নম্বর আসামি সুপ্রভাত দাস (৪৮) রয়ে গেছেন সম্পূর্ণ ধরাছোঁয়ার বাইরে। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় চরম হতাশা, ক্ষোভ আর নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন নিহতের পরিবার ও বাদী পক্ষ। অভিযুক্ত সুপ্রভাত দাস উপজেলার কামালপুর এলাকার হরিপদ দাসের ছেলে। পেশায় তিনি ধনপুরের সহিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। অভিযোগ উঠেছে, হত্যা মামলার আসামি হয়ে ফেরারি জীবন কাটালেও এক অদৃশ্য শক্তিতে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছেন প্রতিনিয়ত। শুধু তাই নয়, আত্মগোপনে থেকেই মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নিহতের পরিবারকে প্রতিনিয়ত নানাভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করে আসছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

জমির বিরোধে টেঁটাবিদ্ধ ফনি ভূষণ:
মামলা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি দুপুরে ইটনা উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের কামালপুর এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে দেশীয় ধারালো অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে একদল সন্ত্রাসী ফণি ভূষণের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা প্রথমে ফণি ভূষণের বড় ভাই লালবাসী সরকারকে লোহার রড ও রামদা দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করে। ভাইকে বাঁচাতে ছোট ভাই ফণি ভূষণ সরকার (৩২) এগিয়ে এলে তাঁকে লক্ষ্য করে নৃশংসভাবে টেঁটা নিক্ষেপ করা হয়।

টেঁটাবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে প্রথমে ইটনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৪ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ফণি ভূষণ। এই ঘটনায় নিহতের বড় ভাই লালবাসী সরকার বাদী হয়ে ২৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনকে আসামি করে ইটনা থানায় মামলা দায়ের করেন। ফণি ভূষণের মৃত্যুর পর সেটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

অদৃশ্য কারণে থমকে আছে গ্রেপ্তার:
নিহত ফণি ভূষণের ভাই লালবাসী সরকারের অভিযোগ, আসামি সুপ্রভাত দাসকে গ্রেপ্তারের জন্য আমরা বারবার পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে পুলিশ তাঁকে স্পর্শ করছে না। আমরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। এদিকে আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে এলাকায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

ব্যাহত শিক্ষা কার্যক্রম, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী:
এলাকাবাসীর অভিযোগ একজন হত্যা মামলার ফেরারি আসামির (সুপ্রভাত দাস) অনুপস্থিতির কারণে সহিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। তাই এই বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের জোরালো ভূমিকা এবং অবিলম্বে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

শোকাতুর হাওরের বুকে আজ ফনি ভূষণের পরিবারের একটাই প্রশ্ন..?আইন যদি সবার জন্য সমানই হয়, তবে একজন হত্যাকাণ্ডের আসামি আইনের ঊর্ধ্বে থেকে কীভাবে প্রকাশ্যে এমন দাপট দেখায়? তবে কি এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই হাওরপাড়ের মানুষের ভাগ্যলিপি? অসহায় পরিবারটির এই বুকফাটা আত্মচিৎকার প্রশাসনের কানে পৌঁছাবে এবং দ্রুতই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে, এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় এলাকাবাসীর।
