সমকালীন বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে প্রকাশ পেল সাংবাদিক, গবেষক ও লেখক অখিল পোদ্দারের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হাড়ের ভেতর হেমন্ত’। দেহতত্ত্ব, লোকজ ভাষা, আধ্যাত্মিক সংকেত ও জাদুবাস্তবতার সম্মিলনে নির্মিত এই কাব্যগ্রন্থ ইতোমধ্যেই সাহিত্যবোদ্ধাদের আগ্রহের কেন্দ্রে এসেছে। কাব্যগ্রন্থের প্রকাশক কবি ও প্রাবন্ধিক সৈকত ইতোমধ্যে এ বই নিয়ে তাঁর আকাশচুম্বি আশার কথা প্রকাশ করেছেন সাহিত্যিকমহলে। তাঁর অভিমত, অখিল পোদ্দারের কাব্যগ্রন্থ সমকালীন নগরজীবনের আয়নাবাড়ি। এর প্রতিটি কক্ষের সামনে দাঁড়ালে মানুষ নিজেকে তাঁর মতো অনবদ্যভাবে আবিষ্কার করে। আশা করছি বৈশাখের খড়তাপের মতোই এ কাব্যগ্রন্থ উড়িয়ে দেবে যতোসব অশান্ত ধুলিঝড়। মানবমনের গহীনে যে অবদমন ক্রীড়ামোদীরা বসবাস করে তারও প্রসঙ্গ এ গ্রন্থের অক্ষরে অক্ষরে।

গ্রন্থটিতে কবি মানুষের শরীর, স্মৃতি, মৃত্যু, প্রেম, গ্রামীণ মিথ, অন্তর্জাগতিক বোধ এবং সময়ের সংকটকে এক অনন্য কাব্যভাষায় তুলে ধরেছেন। প্রচলিত আধুনিক কবিতার সরল রৈখিকতা থেকে বেরিয়ে এসে এখানে নির্মিত হয়েছে এক রহস্যময় ও বহুস্তরবিশিষ্ট কাব্যজগৎ। কবিতাগুলোর ভাষা কখনও লোকজ, কখনও দার্শনিক, আবার কখনও স্বপ্ন ও বাস্তবতার মধ্যবর্তী এক জাদুবাস্তব পরিসরে বিচরণ করেছে।
ইতোমধ্যে কবি অখিল পোদ্দারের বন্ধুজন আরেক কবি ও লেখক প্রফেসর ড. চন্দন আনোয়ার তাঁর মত জানিয়েছেন। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও ডীন অধ্যপক চন্দন আনোয়ার বলেন, এ বইয়ের কবিতাগুলি অপ্রকাশিত অন্তরাত্মার বিকশিত রূপ। যাতে অন্তর্গূঢ় অনুধ্যান যেমন বর্তমান তেমনি গোপন কুঠুরিতে প্রতিনিয়ত যে প্রক্ষেলন তাও উদ্ভাসিত। সবমিলে কাব্যভাষায় মানুষের অন্তর্জাগতিক নিরীক্ষা প্রতিভাত। সুতরাং কবিতার কল্পজগত থেকে এ বই সহসা হারাবে না।
সাহিত্য সমালোচকদের কেউ কেউ বলেছেন, ‘হাড়ের ভেতর হেমন্ত’ কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়; এটি দেহ, মাটি ও মানুষের গভীর অন্তঃস্মৃতির এক নন্দনভাষ্য। বইটির কবিতায় বাউল-সুফি দেহতত্ত্বের প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনি আছে সমকালীন মানুষের নিঃসঙ্গতা, অস্তিত্ব সংকট ও ভাঙা সভ্যতার প্রতিধ্বনি। কবি সৌম্য সালেক মনে করেন, এর ভাষায় অন্য এক আকর্ষণ আছে যা সচরাচর থেকে অনতিদূরে কিন্তু ঝাঁঝালো।
গ্রন্থটির নাম নিয়েও সাহিত্য মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ‘হাড়ের ভেতর হেমন্ত’ নামটি একদিকে যেমন ক্ষয়, শূন্যতা ও বিষাদের ইঙ্গিত বহন করে, অন্যদিকে তেমনি অন্তর্গত ঋতু, পুনর্জন্ম ও আত্মসন্ধানের প্রতীক হিসেবেও ধরা দিচ্ছে। কবি এখানে শরীরকে কেবল জৈব অস্তিত্ব হিসেবে দেখেননি; বরং তা হয়ে উঠেছে স্মৃতি, ইতিহাস ও মহাজাগতিক অনুভবের আধার।
ড. অখিল পোদ্দার দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা ও সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। সমাজ, সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক ভাবধারাকে কেন্দ্র করে তাঁর গবেষণামূলক লেখালেখি পাঠকমহলে সমাদৃত। এর আগে প্রবন্ধ, গবেষণা ও অনুসন্ধানধর্মী লেখার মাধ্যমে পরিচিত হলেও এই প্রথম তিনি পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে পাঠকের সামনে এলেন। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রকৃতির কর্ণধার কবি সৈকত হাবিব জানিয়েছেন, বইটি ইতোমধ্যে তরুণ কবি-পাঠকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে। বিশেষ করে যারা লোকজ চেতনা, মরমিয়া ভাবধারা ও আধুনিক কাব্যভাষার ভিন্নতর নির্মাণ খোঁজেন, তাদের জন্য ‘হাড়ের ভেতর হেমন্ত’ হতে পারে নতুন অভিজ্ঞতা। বাংলা কবিতার প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে দেহতত্ত্ব, লোকঐতিহ্য ও জাদুবাস্তবতার সংমিশ্রণে নির্মিত এই কাব্যগ্রন্থ সমকালীন কবিতায় নতুন আলোচনার জন্ম দেবে বলেও মনে করছেন সাহিত্যবোদ্ধারা।
মলাটবৃত্তে অখিল পোদ্দার ও তাঁর কাব্যগ্রন্থ:
অখিল পোদ্দারের জীবন যেন একসঙ্গে বহু নদীর স্রোত; সাংবাদিকতা, সাহিত্য, ভ্রমণ, অনুসন্ধান ও অন্তর্গত নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ অনুশীলন। পেশায় তিনি সাংবাদিক কিন্তু শব্দের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল সংবাদে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের জীবন, সময়ের গোপন অন্ধকার, ভাঙন ও বিস্ময় তাঁকে বারবার টেনে এনেছে কবিতার কাছে।
লেখালেখির শুরু কলেজজীবনে। হাতে লেখা দেয়ালপত্রিকার কালি মেখেই তাঁর শব্দযাত্রা। সাহিত্য অধ্যয়ন তাঁর ঔচিত্যে গভীরতা আনে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম হন মাস্টার্সে। যুক্ত হয়েছিলেন সাংবাদিকতায়। ভোরের কাগজ ও জনকণ্ঠ-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে করতেই গড়ে ওঠে তাঁর পর্যবেক্ষণের স্বতন্ত্র দৃষ্টি। পরে এই দুই পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার। একুশে টেলিভিশনের পর্দায় টানা সতেরো বছর তাঁর উচ্চারণ ছিল সময়ের আরেক পাঠ। সংবাদপত্রের ব্যস্ত করিডর পেরিয়ে তিনি পৌঁছেছেন টেলিভিশন সাংবাদিকতার প্রথম সারিতে। অনুসন্ধানী সেলের প্রধান, বিশেষ প্রতিনিধি, চিফ রিপোর্টার, হেড অব ইনপুট থেকে প্রধান বার্তা সম্পাদক।
সংবাদজগতের নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠা ও সুনামের সঙ্গে। তাঁর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পেয়েছে দেশ-বিদেশের নানা স্বীকৃতি। ইউনেস্কো পুরস্কার, পিআইবি পুরস্কার, ডিআরইউ শ্রেষ্ঠ পুরস্কার, মোনাজাত উদ্দিন স্মৃতি পুরস্কারসহনানা স্বীকৃতি, সম্মাননা ও ফেলোশিপ।
গবেষক হিসেবেও তিনি সমান মনোযোগী। বুদ্ধদেব বসুর কাব্যনাটক নিয়ে সম্পন্ন করেছেন পিএইচডি। পেশাগত সূত্রে ঘুরে দেখেছেন পৃথিবীর নানা ভূগোল।যুক্তরাষ্ট্র থেকে কঙ্গো, তুরস্ক থেকে চীন, জর্ডান থেকে ইন্দোনেশিয়া, ভারত থেকে জার্মান, থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, নেপাল, শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুর,সংযুক্ত আরব আমিরাত, উগান্ডা। এত যাত্রার পরও তাঁর ভেতরে রয়ে গেছে মাটির মায়া, লোকজ স্মৃতি আর অন্তঃসলিলা বিষাদ।
ড. অখিল পোদ্দারের কবিতায় তাই সংবাদপত্রের শিরোনাম যেমন আছে তেমনি রয়েছে লোকজ মায়া, দেহতত্ত্ব, জাদুবাস্তবতা ও সময়ের অদৃশ্য ক্ষত। বাস্তব ও পরাবাস্তবের মধ্যবর্তী যে ধূসর ভুবন-তাঁর কবিতা বারবার সেইখানেই আলো ফেলে। নিঃসীম দরিয়াপাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি শুনতে চান মানুষের অনুচ্চারিত ভাষা। তাঁর কবিতায় শহর আছে, শ্মশান আছে, টেলিভিশনের নীল আলো আছে, আবার আছে গ্রামীণ রাতের দূর বাঁশির মায়া। দিনের আলোয় তিনি সংবাদকর্মী-ঘটনাপুঞ্জের নির্ভুল ভাষ্যকার; রাত গভীর হলে শব্দের ভেতর খুঁজে ফেরেন মানুষের গোপন একাকিত্ব। শরীরের অন্তর্লিখন, সময়ের অদৃশ্য ক্ষতচিহ্ন তাঁর কবিতায় বারংবার উচ্চারিত। প্রথম কাব্যগ্রন্থ তাঁর দীর্ঘ নৈঃশব্দ্যের অন্তর্লিখিত উচ্চারণ।

অখিল পোদ্দারের জন্ম ১৯৭৫ সালে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার বরইচারা গ্রামে। যোগাযোগ: [email protected]
Top of Form
Bottom of Form
