একজন প্রবাসী সন্তানের আর্তনাদ: “আমি সম্পত্তি চাই না, চাই আমার বাবার রেখে যাওয়া ন্যায্য অধিকার”
পারভেজ মাসুম
১৯ বছরের প্রবাসজীবন, তিনবার দেশে ফেরা, শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ, মামলা ও গ্রেপ্তারের অভিজ্ঞতা—তবুও কেন একজন বৈধ উত্তরাধিকারী তাঁর বাবার সম্পত্তির হিসাব জানতে পারবেন না আমি পারভেজ মাসুম, একজন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি। আজ অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এই কথাগুলো লিখছি। কারণ আমার এই লড়াই কোনো জমি, অর্থ বা সম্পত্তির লোভের জন্য নয়। আমার লড়াই একজন সন্তানের অধিকার, সত্যের স্বীকৃতি এবং ন্যায়বিচারের জন্য। আমার বাবা মৃত্যুবরণ করার পর বহু বছর ধরে আমি তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তির দলিলপত্র, হিসাব-নিকাশ এবং আমার প্রাপ্য অংশ সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করে আসছি। একজন বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে এটি আমার আইনগত ও নৈতিক অধিকার বলে আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সেই অধিকারটুকু আদায় করতে গিয়েই আমাকে বছরের পর বছর অপমান, হয়রানি এবং মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
আমি আমার মা, আমার দুই ভাই—পারভেজ আনোয়ার ও পারভেজ শফিকুল আজম—এবং আমার মেঝ চাচা জনাব নুরুল হক আলমের সঙ্গে বহুবার যোগাযোগ করেছি। হোয়াটসঅ্যাপে লিখেছি, ফোন করেছি, ইমেইল পাঠিয়েছি, এমনকি আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশও পাঠিয়েছি। কিন্তু আমার অভিযোগ, এসব প্রচেষ্টার কোনো ইতিবাচক সাড়া পাইনি। বরং আমাকে আমার পৈতৃক সম্পত্তির ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে আমার ধারণা।
২০১৯ সালে আমি অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে যাই বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশায়। আমার একমাত্র জীবিত ফুপা, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন, তিনিও উদ্যোগ নিয়ে আমার মা, দুই ভাই এবং এলাকার একজন সম্মানিত ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু সমাধানের কোনো পথ খুঁজে পাওয়ার আগেই আমার অভিযোগ, আমার বড় ভাই পারভেজ আনোয়ার, তাঁর শ্যালক চন্দন আশরাফ এবং ছোট ভাই পারভেজ শফিকুল আজম আমাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও নির্যাতন করেন।
এ ঘটনায় মিরপুর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। তবে প্রবাসে ফিরে যাওয়ার কারণে সেই অভিযোগের কোনো কার্যকর তদন্ত হয়েছে কি না, তা আজও আমার জানা নেই। পরবর্তীতে ২০২০ সালে আবার বাংলাদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে আমার ছোট ভাই পারভেজ শফিকুল আজম আমাকে একটি হুমকিসূচক ইমেইল পাঠান বলে আমি অভিযোগ করি। সেখানে উল্লেখ ছিল যে, “এবার বাংলাদেশে এলে আমাকে আর অস্ট্রেলিয়া ফিরে যেতে দেওয়া হবে না।”
নিজের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আমি আবারও থানায় একটি জিডি করি। একই সময়ে আমার বড় ভাই আমাকে পুলিশি হয়রানির ভয় দেখান বলেও আমি অভিযোগ করছি। এছাড়া তাঁর শ্যালক চন্দন আশরাফের মাধ্যমে মিরপুরের পাইকপাড়ায় হাজী সালেমুদ্দিন মার্কেটের সামনে আমার ওপর হামলা চালানো হয় বলেও আমার দাবি। আমি তাৎক্ষণিকভাবে তৎকালীন সিএমএম কোর্টের মাননীয় ম্যাজিস্ট্রেট জনাব আতিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাঁর হস্তক্ষেপে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আমাকে সম্ভাব্য বড় বিপদ থেকে রক্ষা করে। এ ঘটনাতেও মিরপুর মডেল থানায় একটি জিডি করা হয়েছিল।
তবুও আমি হাল ছাড়িনি। আমি বিশ্বাস করেছিলাম, সত্য ও ন্যায় একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেই।
কিন্তু ২০২৩ সালে দীর্ঘ নয় মাস বাংলাদেশে অবস্থান করার পরও আমি আমার পৈতৃক সম্পত্তি সম্পর্কে কোনো স্বচ্ছতা পাইনি। বরং আমার অভিযোগ, আমার বিরুদ্ধে দুটি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে আমার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে গভীর রাতে মিরপুরের বাসা থেকে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাত কাটাতে হয় থানার হাজতে। পরদিন আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেলেও সেই রাতের অপমান, অসহায়ত্ব ও মানসিক যন্ত্রণা আজও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। একজন সন্তানের জন্য এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে—যখন সে নিজের বাবার সম্পত্তির হিসাব চাইতে গিয়ে অপরাধীর মতো আচরণের শিকার হয়? সম্প্রতি আমি জানতে পেরেছি যে, আমার বাবার গোপগ্রামের ভিটাবাড়ি এবং অন্যান্য জমিজমা আমাকে না জানিয়ে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই বিক্রির অর্থ কীভাবে বণ্টন করা হয়েছে, সে সম্পর্কেও আমাকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
আমার আরও অভিযোগ, কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার বরইচারা এলাকায় অবস্থিত আমার বাবার একটি জমির দলিলের কপি আমি বহুবার চাইলেও আজ পর্যন্ত আমাকে দেওয়া হয়নি। বরং বারবার ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। এমনকি দেশে ফিরলে আমাকে জোরপূর্বক পুনর্বাসন কেন্দ্রে (রিহ্যাব) পাঠানো হবে এবং আমার বিরুদ্ধে আরও মামলা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে আমি অভিযোগ করছি।
আমার বাবার চাচাতো ভাই এবং তাঁদের সন্তানরাও বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বিশেষ করে রাজবাড়ী সদর এলাকায় অবস্থিত আমাদের পৈতৃক বাড়ির বিষয়ে আলোচনা করে একটি সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, সেখান থেকেও কোনো কার্যকর সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।
এর চেয়েও বেদনাদায়ক হলো, আমার সম্পর্কে বিভিন্ন জায়গায় ভিত্তিহীন ও মানহানিকর বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে বলে আমি মনে করি। এসব বক্তব্য শুধু আমাকে সামাজিকভাবে বিব্রত করেনি, বরং আমার ন্যায্য অধিকার আদায়ের পথকেও কঠিন করে তুলেছে।
অথচ আমার জীবন সংগ্রামের গল্প ভিন্ন।
আমি বাংলাদেশের নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়াশোনা শুরু করি। পরে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করি এবং কম্পিউটার ইনফরমেশন সিস্টেমসে ডিগ্রি অর্জন করি। পরবর্তীতে ২০২১ সালে ফ্রেন্ডস ইউনিভার্সিটি থেকে ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমসে মাস্টার্স সম্পন্ন করি।
জীবনের দীর্ঘ সময়ে আমি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, সিস্টেমস অ্যানালিস্ট এবং প্রভাষক হিসেবে বিভিন্ন দেশে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছি। ???
আজ সেই আমাকেই নিজের বাবার সম্পত্তির হিসাব চাইতে গিয়ে অপমান, মামলা এবং হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
আমাকে বলা হয়েছে, এই সম্পত্তির প্রতি নাকি কারও কোনো আগ্রহ নেই। এমনকি কেউ কেউ বলেছেন, “এই জমি বিনা পয়সায় দিলেও আমি নেব না।”
যদি সত্যিই তা-ই হয়, তাহলে আমার প্রশ্ন—
২০১৯ সাল থেকে কেন একজন বৈধ শরিক হিসেবে আমাকে আমার বাবার সম্পত্তিতে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না?
কেন আমি আমার অংশ বুঝে নেওয়ার জন্য জমি মাপতে চাইলে বাধার সম্মুখীন হচ্ছি?
কেন দলিলপত্রের স্বচ্ছতা এবং হিসাব চাওয়াটা এত কঠিন হয়ে উঠেছে?
আমি একজন প্রবাসী। দেশের বাইরে থেকেও আমি আমার পরিবার, সমাজ এবং দেশের জন্য দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। আজ আমি শুধু চাই—আমার বাবার সম্পত্তি সম্পর্কে সঠিক তথ্য, স্বচ্ছতা এবং আইন অনুযায়ী আমার ন্যায্য অধিকার।
আমি কারও ক্ষতি চাই না। আমি প্রতিশোধ চাই না। আমি শুধু চাই, একজন নাগরিক হিসেবে আমার কথা শোনা হোক এবং নিরপেক্ষভাবে সত্য উদঘাটন করা হোক।
আমি বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম এবং সমাজের বিবেকবান মানুষের কাছে বিনীত আবেদন জানাই—
একজন প্রবাসী সন্তান যেন শুধু দূরে থাকার কারণে তার পৈতৃক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।
কারণ আমি সম্পত্তির জন্য নয়, ন্যায়ের জন্য দাঁড়িয়েছি।
“বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি শুধু একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি—একজন সন্তানের কি তার বাবার রেখে যাওয়া অধিকার চাইবারও অধিকার নেই?”
পারভেজ মাসুম
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি
Email: [email protected]
