রোববার,

১৮ অক্টোবর ২০২৬

|

কার্তিক ২ ১৪৩৩

XFilesBd

রামসুন্দর জমিদার বাড়ি: ভাঙা দেয়াল আজও কথা বলে

তানভীর সুমন

প্রকাশিত: ১১:৪৫, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

রামসুন্দর জমিদার বাড়ি: ভাঙা দেয়াল আজও কথা বলে

ঢাকা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে ঝিনাইদহের শৈলকুপা। কুমার নদের তীরে গড়ে ওঠা আবাইপুর গ্রামের রামসুন্দর জমিদার বাড়ি। অনেক দিন ধরেই জায়গাটিতে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। ইচ্ছেটা মনের মধ্যে এমনভাবে জমে ছিল যে, একদিন হঠাৎ করেই ঠিক করলাম, আর দেরি নয় চলে যাই। সকালেই ঘুম থেকে উঠে বাসে শৈলকুপার উদ্দেশে রওনা দিলাম। শৈলকুপা পৌঁছে অটো রিকশা নিয়ে চলতে শুরু করলাম, আপাতত গন্তব্য হাট ফাজিলপুর। চাকরির সুবাদে আমার ভাই বেশ কিছুদিন ধরে সেখানে থাকে। দুপুরে তার বাসায় খাওয়া-দাওয়া করে একটু বিশ্রাম নিয়ে তারপর আবাইপুরের দিকে রওনা দেওয়ার পরিকল্পনা।

অল্প সময়ের মধ্যেই হাট ফাজিলপুর পৌঁছে গেলাম। ভাই, ভাবি আর ভাতিজির সঙ্গে দেখা হলো। আপনজনদের সঙ্গে দেখা হলে পথের ক্লান্তিটাও যেন একটু কমে যায়। দুপুরের খাবার খেলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকেলের দিকে আবার বেরিয়ে পড়লাম আবাইপুরের পথে। আমার সঙ্গে ফারুক ভাই আর তার সহকর্মী জাবের ভাই। কুমার নদের পাশ দিয়ে পিচঢালা সরু রাস্তা। রাস্তার দুপাশে সবুজ গাছপালা। কোথাও অনেকটা ফাঁকা, কোথাও গ্রামের ঘরবাড়ি, আবার কোথাও পুরোনো কোনো মন্দির, সব মিলিয়ে পুরো পথটাই যেন আলাদা একটা গল্প হয়ে উঠল।

নদীর পাশ দিয়ে চলতে চলতে মনে হলো, চোখের ক্লান্তি কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। মনের ভেতর অদ্ভুত এক আনন্দ উঁকি দিতে শুরু করল। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে এসে প্রকৃতির এত কাছে দাঁড়ালে মানুষ বোধহয় নিজের ভেতরের মানুষটাকেও একটু খুঁজে পায়। চলার পথে চোখে পড়ল অনেক পুরোনো বাড়িঘর, স্কুল আর গ্রাম্য অবহেলায় গড়ে ওঠা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু পাড়া-মহল্লা।

 ধীরে ধীরে আমরা পৌঁছে গেলাম আবাইপুর বাজারে। সেখানে চায়ের দোকানে বসে জমিদার বাড়ির ইতিহাস জানতে শুরু করলাম। একজন একরকম বলছেন, আরেকজন আরেক রকম। গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ইতিহাসের কত গল্প যে বেঁচে থাকে...! জানলাম, জমিদার বাড়ির পাশেই একটি স্কুল রয়েছে, সেটিও জমিদার পরিবারের নামেই প্রতিষ্ঠিত।

চা শেষ করে আর বেশি দেরি করলাম না। এবার আমাদের গন্তব্য সেই বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত রামসুন্দর জমিদার বাড়ি। বাড়িটির সামনে দাঁড়াতেই প্রথম যে অনুভূতিটা হলো, সেটা আনন্দের চেয়ে বেশি ছিল বিষণ্ণতার।একসময় যে বাড়িতে রাজকীয় জৌলুস ছিল, আজ তার অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। দেয়ালের গায়ে লতাগুল্ম, কোথাও ভাঙা ইট, কোথাও পুরোনো দালানের ক্ষতচিহ্ন। তবুও মনে হচ্ছিল, এই ভাঙা দেয়ালগুলো এখনো অনেক কথা বলতে চায়।

জমিদার বাড়িটির এক অংশে বর্তমানে স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিস রয়েছে। আরেক অংশে এখনো জমিদার পরিবারের উত্তরসূরিরা বসবাস করেন। তাদের কাছে যত্ন করে রাখা আছে সেই সময়ের কিছু স্মৃতি ও পুরোনো নিদর্শন। একটি বড় ও সচল গ্রামোফোন, পাথরের তৈরি হুক্কা, একটি পুরোনো তরবারি, প্রাচীন শ্রীমদ্ভাগবত, এসরাজসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র, শাল কাঠের তৈরি পুরোনো দুটি মন্দির, রূপার জরির নকশা করা বেনারসি শাড়ির অংশবিশেষ আরও কত কী! এসব নিদর্শন এখন মূলত রামসুন্দরের উত্তরসূরি রাজকুমার শিকদারের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

 বাংলা ১২শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অবিভক্ত ভারতবর্ষের যশোর জেলার জমিদার রামসুন্দর শিকদার প্রায় ৪০০ বিঘা জায়গার উপর শৈলকুপা জমিদার বাড়ী স্থাপন করেন। দ্বিতল জমিদার বাড়ির চারদিকে ঘুরানো দালানসহ প্রায় ৩৫০টি কক্ষ ছিল। রামসুন্দর জমিদারি প্রতিষ্ঠার পর এখানে সাব-রেজিস্ট্রার অফিস, থিয়েটার হল এবং একটি বড় বাজারও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ফলে আবাইপুর ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদে পরিণত হয়।

যতটুকু জানতে পেরেছি তাদের বংশের আগের উপাধি ছিল ‘তিলিকুণ্ড’। পরে রামসুন্দরের ঠাকুরদাদা কার্তিক শিকদার মুর্শিদাবাদের নবাবের কাছ থেকে ‘শিকদার’ উপাধি লাভ করেন। এরপর থেকেই তারা শিকদার নামে পরিচিত হতে থাকেন।

জানা যায়, তার ছিল সাতজন পুত্র। রামসুন্দর ২৫শে বৈশাখ ১২৭০ বঙ্গাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তার সন্তানেরা একসঙ্গে জমিদারি ও ব্যবসার দেখাশোনা করেন। পরবর্তীতে তারা ‘শিকদার অ্যান্ড কোম্পানি’ নামে পাটের ব্যবসা শুরু করেন এবং ব্যবসায় বড় সাফল্য অর্জন করেন। বাংলা ১৩১৯ সালে তাদের কোম্পানির পাট বিশ্ববাজারে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা লাভ করে। সে সময় ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন তাদের কোম্পানিকে ‘প্রিন্স অব জুট বেলার্স’ উপাধি প্রদান করেন বলে জানা যায়।

কিন্তু সময় তো কখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না।

একসময় পরিবারের সম্পত্তি ভাগ হয়ে গেল। কেউ বিদেশে চলে গেলেন, কেউ সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেন। ধীরে ধীরে কমতে লাগল জমিদার পরিবারের প্রভাব। একসময়ের সেই বিশাল জমিদারি একদিন ইতিহাসের পাতায় পরিণত হলো। তবে রামসুন্দরের স্মৃতি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তার মৃত্যুর প্রায় ২৫ বছর পর তার পুত্ররা আবাইপুর গ্রামে তার নামে ‘রামসুন্দর ইনস্টিটিউট’ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

এসব কথা শুনতে শুনতে আমার মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু একটি পুরোনো বাড়ি দেখছি না, আমরা আসলে একটি সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। লতায় ঢাকা দেয়ালের প্রতিটি পুরোনো ইট যেন আমাকে কিছু বলতে চাইছিল। মনে হচ্ছিল, ইটগুলো এখনো সেই দিনগুলোর সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ বন্ধ করলেই যেন কল্পনায় দেখতে পাচ্ছিলাম সেই রাজকীয় সময়। হাতি-ঘোড়া আসছে, মানুষের আনাগোনা, জমিদারবাড়ির ব্যস্ততা, থিয়েটার হলের আলো, কোথাও হয়তো গানের আসর, কোথাও অতিথিদের সমাগম, কী ছিল না সেই সময়ে!

কিছুক্ষণ একেবারেই চুপ হয়ে গেলাম। আমার পাশে ফারুক ভাই আর জাবের ভাই দাঁড়িয়ে ছিলো। তারা নিজেদের জানা ইতিহাস আর শোনা কথাগুলো দিয়ে আমাকে আরও বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। আমি শুধু শুনছিলাম। মাঝে মাঝে এমন দু-একটি প্রশ্ন করছিলাম, যেগুলো আমার বুঝতে একটু অসুবিধা হচ্ছিল। পুরোনো দেয়ালগুলো যেন তার হারিয়ে যাওয়া যৌবনের গল্প বলছিল। আর আমি মুগ্ধ হয়ে সেই গল্প শুনছিলাম। কিন্তু গল্পেরও তো একসময় শেষ হয়।

এরই মধ্যে সন্ধ্যা নেমে এলো। আমাদেরও ফেরার তাড়া।

ভাবছিলাম, একসময় হয়তো এই বাড়ির সন্ধ্যাগুলো কত আলোকিত ছিল! মানুষের কোলাহলে, অতিথিদের আনাগোনায়, নানা আয়োজন আর উৎসবে হয়তো জমে উঠত পুরো বাড়ি। আজ সেখানে নীরবতা। সময় তার নিজের নিয়মে সবকিছু বদলে দিয়েছে। হয়তো এটাই প্রকৃতির নিয়ম, চিরদিন কারও সমান নাহি যায়।

জীবন আর প্রকৃতি তাদের নিজস্ব স্রোতে সবকিছুকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কিছু রেখে যায় স্মৃতি হিসেবে, আর কিছু হারিয়ে যায় সময়ের গভীরে। আমরাও বাসার উদ্দেশে রওনা দিলাম। আবার সেই কুমার নদের পাশের পিচঢালা রাস্তা। দুপাশে সবুজ গাছপালা। তবে এবার দৃশ্যটা যেন অন্যরকম। আকাশে সন্ধ্যার চাঁদ উঠেছে। তার পাশে কয়েকটি তারা। নদীর পানিতে চাঁদ আর তারার প্রতিচ্ছবি। মনে হচ্ছিল, তারা দুজনেই আমাদের সঙ্গে খেলছে। আমাদের পথচলার সাথে সাথে পানির ভেতরের চাঁদ তারাও যেন পরম মায়ায় আমাদের সঙ্গী হয়ে এগিয়ে চলেছে। হঠাৎ মনে হলো, জীবন আর আমাদের সম্পর্কটাও কি এমন? আমরা কি জীবনকে তাড়া করি, নাকি জীবন আমাদের তাড়া করে? হয়তো আমরা দুজনেই দুজনকে জড়িয়ে ধরে চলি, আবার হয়তো তাও না। আসলে এর সঠিক উত্তর আমার জানা নেই। এই না  জানা নিয়েই হয়তো কেটে যায় পুরো জীবন।

কিছুক্ষণ আমরা জমিদার বাড়ির গল্প ভুলে কুমার নদ, চাঁদ আর তারাদের গল্পে মেতে রইলাম। কিন্তু কিছুদূর যেতেই নদীর পাশের রাস্তা শেষ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে কুমার নদ আমাদের চোখের আড়ালে চলে গেল। আমরা আবার ঢুকে পড়লাম গ্রামের সবুজ প্রকৃতির ভেতর। চাঁদের মায়াবী আলো তখন সবুজ গাছের পাতার ওপর খেলা করছে। যদিও দিনের আলোর মতো সবকিছু একদম পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না, তবুও চারপাশের পরিবেশটা দেখতে অন্যরকম সুন্দর লাগছিল। তখন মনে হলো, জীবনও বুঝি এমনই।

কখনো আমরা কোনো একটি মানুষ, কোনো একটি জায়গা কিংবা কোনো একটি স্মৃতিকে খুব গভীরভাবে আঁকড়ে থাকি। মনে হয় এটাই বুঝি আমাদের পৃথিবী।তারপর সময় একটু একটু করে আমাদের সামনে নতুন কোনো পথ খুলে দেয়। আমরা সামনে এগিয়ে যাই।

আর পেছনের মানুষ, পেছনের জায়গা, পেছনের গল্পগুলো ধীরে ধীরে চোখের আড়ালে চলে যায়। তবুও তারা পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। কোথাও না কোথাও তারা থেকে যায়,  স্মৃতি বা গল্প হয়ে, কিংবা সন্ধ্যার আকাশে জ্বলে থাকা কোনো এক সন্ধ্যা তারা হয়ে।

হয়তো এটাই জীবনের সৌন্দর্য। হয়তো প্রকৃতি চায়, আমরা থেমে না থেকে সামনে এগিয়ে যাই। একটি দৃশ্য শেষ হলে আরেকটি দৃশ্য শুরু হয়, একটি গল্প শেষ হলে নতুন কোনো গল্প আমাদের অপেক্ষায় থাকে। আর আমরা পথ চলতে চলতে কখনো কুমার নদের তীরে, কখনো কোনো পুরোনো জমিদার বাড়ির ভাঙা দেয়ালে, আবার কখনো সন্ধ্যার আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে নিজের জীবনটাকেই নতুন করে চিনে নিই। সেদিন আবাইপুর থেকে ফেরার পথে আমার মনে হচ্ছিল, আমি শুধু একটি জমিদার বাড়ি দেখে ফিরছি না। ফিরছি একটি সময়কে ছুঁয়ে। একটি ইতিহাসকে শুনে। আর প্রকৃতির মাঝে নিজের জীবনের গল্পটাকে একটু  নতুন করে খুঁজে।

 আমরা পথ চলছি। দিনের আলো বেশ আগেই ফুরিয়েছে। ক্লান্ত শরীরটা এখন একটু বিশ্রাম চায় কিন্তু  এই শান্ত রাত আর জমিদার বাড়ির স্যাঁতসেঁতে ভাঙা দেয়ালগুলো আমার ভেতরে চিরকাল বেঁচে থাকবে, প্রবাহমান এক নদীর মতো।