খাজা ওসমান ফারুকীঃ শুদ্ধ পথের মুক্ত পথিক
- শাকির দেওয়ান
জীবনের মাহাত্ম্য আত্ম-অন্বেষণে, নিজেকে জানার মধ্যদিয়ে। সক্রেটিসের আপ্তবাক্য " Know Thiself" সংস্কৃতে বলে, 'আত্মানাম বিদ্ধি।' একই চেতনার শব্দবন্ধ, একই বিশ্বাসের অনুরণন। প্রভুর সেই বাৎলে দেওয়া পথেই হেঁটে চলেছেন খাজা ওসমান ফারুকীর মতো সাধকেরা। পদাঙ্ক অনুসরণ করছেন সমার্থক মত-পথের অযুত অনুগামী। জীবাত্মার চিরন্তন বাসনা পরমাত্মার সাথে মিলিত হওয়া। কিন্তু বস্তুবাদের নেশায় মত্ত আত্মা সাত্ত্বিক দিশা হারায়, ভ্রষ্ট পথে পা বাড়ায়। বিস্মরণের পথে স্রষ্টাকে দূরে ঠেলতে ঠেলতে ক্রমশ নিঃসঙ্গ হতে থাকে। তাইতো সহস্র লোকের ভিড়েও নিজেকে একা মনে হয়, সবকিছু রেখেও নিঃস্ব হতে হয়। কে যেন নেই, কি যেন নেই- এই উপলব্ধি হাহাকার হয়ে আমার আমিকে প্রকম্পিত করে। এই নিঃসঙ্গতা, এহেন শূন্যতা কার্যত পরমসত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার শূন্যতা। এর নাম ইমোশনাল ভয়েড। এই ভয়েড বা শূন্যতা কমিয়ে আনার উপায় হচ্ছে তাকে আপন করে নেওয়া, তাকে কায়মনে ডাকা, নিজেকে আকাঙ্ক্ষা শূন্য করে তারই কাছে আত্মসমর্পণ করা। এই মত, পথ খুঁজে পাওয়ার জন্য একজন দিশারী থাকা অপরিহার্য। গুরুই হবেন সেই অভীষ্ট পথের দিশারী, পথ দেখানো শেরপা।
ওসমান ফারুকী রচিত গ্রন্থ আমাদের মানসিক সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে নিয়ামক উৎস হতে পারে। তাঁর লেখা- সুফি মেডিটেশন, আত্মার বিজ্ঞান, আত্মার নকশা, কূন-ফায়াকূন, সুফি নামা, সুফি সাইকোলজি ইত্যাদি বইসমূহ পড়ে দেখতে পারেন।
লেখক ও গবেষক: শাকির দেওয়ান
দুনিয়াটা একটা হারমোনিয়াম। খোদার দেওয়া হারমোনিয়াম। আমরা সেই হারমোনিয়ামের এক একটি রীড। রীডের ধর্ম টিউনে থাকা, সুরে বাজা। কিন্তু চারদিকের এতোসব বেসুরো আওয়াজে কান পাতা দায়। মিছিল-মিটিং-শ্লোগান-বিরামহীন মিথ্যাচার-টক্সিক মানুষদের বিষাক্ত বয়ান অনবরত কানে ঢুকছে। কাজেই আমরা টিউনে থাকতে পারছিনা। সারাক্ষণ সুরচ্যূতি ঘটছে, ভয়ংকর সুরচ্যূতি। খাবার মুখে তোলার আগে বাছবিচার করি, যাচ্ছেতাই মুখে পুরিনা। কিন্তু সবকথা, সব শব্দ আমরা কানে ঢুকাই। প্রকৃতিবিরুদ্ধ আওয়াজ, শব্দের বিভৎস অত্যাচারে আমাদের শিরা-উপশিরা কেঁপে ওঠে। চরমভাবে অস্থির হয়ে আমরা মেজাজ হারাই। দুনিয়াজুড়ে আজ অশান্তি, ভয়াবহ অস্থিরতা। গান শুনেও আজকাল অস্থির লাগে। অশান্ত মন নিয়ে তৈরি ও গাওয়া সুরও তাই অস্থিরতা ছড়ায়।
লেখক ও গবেষক: শাকির দেওয়ান
আমাদের মস্তিষ্কে একধরনের রস আছে। এর নাম ডোপামিন। একে ভালো লাগার কেমিকেল বলে। পছন্দের গান কিংবা কথা শুনলে মস্তিষ্ক ঠিক ততোটা ডোপামিন ছাড়ে যতোটা ছাড়ে প্রেমে পড়লে। আবার এর উল্টোটাও ঘটে। দুঃখের গান, ব্যথার ঘটনা শুনলে মন ভারি হয়ে ওঠে। চোখ আর্দ্র্য হয়। এমন অবস্থায় তবে কি কেউ আমাকে দিব্যি দিলো, কানে কানে বলে দিলো, তুমি দুঃখ পাও? মোটেও তা নয়। একেই বলে হুকুম মানা। এ এক অদৃশ্য হুকুম।
পাখি ডাকে নিরাপদ ভোরে। বৃষ্টির দিনে বাঘও নাকি শিকারে বের হয়না। এমনি বর্ষণমুখর দিনে কে যেন কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলে যায়, তুমি ঘুমাও। তোমার পৃথিবী আজ নিরাপদ।
আসমান আর জমিনের মধ্যিখানে সারাক্ষণ এক কম্পনের খেলা চলে। একে শুম্যান্স রেজোনেন্স বলে। জার্মানির শুম্যান্স সাহেব ১৯৫২ সালে এই খবর দুনিয়াকে জানিয়ে গেছেন। এই কম্পনই দুনিয়ার জিকির। বৃক্ষ- পাখি-তরুলতা-পাহাড়-নদী সবাই এই জিকির করছে। এই জিকির কেবল মানুষ শুনতে পায়না।
পরিবারের সঙ্গে লেখক ও গবেষক: শাকির দেওয়ান
দুনিয়া সফল মানুষকে মাথায় তুলে নাচে, কিন্তু কেউ বলেনা তুমি সার্থক মানুষ হও। আজব দুনিয়া সফলতা আর সার্থকতার সুক্ষ্ম প্রভেদের হিসাব বুঝায়না। এই প্রভেদ, এই নিগূঢ় রহস্য বোঝানোর জন্যই ওসমান ফারুকীরা কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতিদিন কতোকিছু জানার, বোঝার, শোনার সুযোগ ঘটছে। প্রকৃতি চোখে আঙুল দিয়ে কতোকিছুই না দেখাচ্ছে কিন্তু আমি যে বেখবর।
'সাপ্তাহিক পরিচয়' বিশিষ্ট সুফি সাধক, কবি ও লেখক খাজা ওসমান ফারুকীর জন্মতিথি উপলক্ষে তাঁর জীবনদর্শন, কর্ম, চিন্তা ও সমাজে এর প্রভাব শীর্ষক "খাজা ওসমান ফারুকী সংখ্যা" প্রকাশ করতে যাচ্ছে জেনে যারপরনাই আমি আপ্লুত, আনন্দিত। এ প্রয়াসকে উদ্বাহু অভিবাদন জানাই। শুভ জন্মদিন খাজা ওসমান ফারুকী। জয়তু সুফিবাদ। জয়তু সুফি সেন্টার।
[লেখক শাকির দেওয়ান বিশিষ্ট গীতিকার, সাংবাদিক, শিল্পী ও লোকগবেষক]
