ফেনীর মাটিতে নজরুল: একশ বছরের আলোকশিখা
কাজী নজরুল ইসলামের ফেনী আগমনের শতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তব্য
— ড. অখিল পোদ্দার
রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনের শেষে নেমে এসেছে বিপ্লবী সন্ধ্যা। সামনে বসে আছেন ঈশ্বরতূল্য বর্ণিল শিশু-কিশোর আর তাদের আলোকিত অভিভাবকগণ। প্রিয়জন ভেবে আপনারা আমার কূর্ণিশ গ্রহণ করুন। অনুষ্ঠানের নেপথ্যে যাঁরা কুশীলবের চরিত্রে আছেন-তাঁদের জানাই লাল সেলাম। এমন এক অন্ধকার সময়ে কাজী নজরুল ইসলামের জীবনবন্দনা ও কবির অসাম্প্রদায়িকতাকে মঞ্চে তুলে ধরার যে দুঃসাহসিক অভিযানে তাঁরা নেমেছেন, তা সত্যিই আশাজাগানিয়া। নজরুলঅনুরাগীদের তরফ হতে আয়োজকদের জানাই ভক্তি ও ভালোবাসা। মহতী এ অনুষ্ঠানের মূখ্য অতিথি কমরেড খালেকুজ্জামান—যাঁর নাম আপনারা ইতোপূর্বে শুনেছেন অনেকবার। রাজনৈতিক ডিগনিটি, স্থিতধি ও প্রজ্ঞাবান মানুষটি বাগ্মিতার জন্য আজও বিখ্যাত। তাঁকে জানাই সশ্রদ্ধ সালাম। চিন্তারেখার চরম দুর্ভিক্ষের বহমান বিতর্কিত সময়ে তাঁর বক্তব্য তরুণ-তরুণীদের হৃদয়ে অনুরণন তুলবে বলে বিশ্বাস করি। সঙ্গে আছেন উচ্চমার্গীয় চিন্তক ও প্রাবন্ধিক কবি সৈকত হাবিব-যিনি বাংলার মিশেল ফুকো অভিধায় অভিহিত। অপরাপর সাহিত্যিক, কবি, সমালোচক, সাংবাদিক ও গল্পকারবৃন্দ—তাঁদের অনেকের বক্তব্য আমরা শুনেছি। ফোসকা গরমে পরবর্তী বক্তাগণ নজরুলনামে বৃষ্টি নামাবেন। আমরা সিক্ত হতে চাই সুমিষ্ট ভাষার জাদুতে। মোবাইল আসক্তির নামে মানসিকভাবে কালা জাদুতে আক্রান্ত আমাদের সমাজ-জঠর। এমন বেলাশেষে আমাদের আরাধ্য কবি নজরুলকে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে ফেনীবাসী যে প্রগাঢ়তা দেখালেন তা ইতিহাসের খেরোখাতায় বন্দিত হবে। সুতরাং মান্যবর ফেনীবাসী, আপনারা আমারা ভক্তিপূর্ণ সালাম এবং অভিনন্দন গ্রহন করুন।
ফেনীর যে মানুষটি কবি নজরুলকে প্রথম তুলে ধরেছিলেন, তিনি ওবায়েদ উল হক হক। এত যত্নে নজরুলকে মর্যাদা দেওয়ার মানুষটি লেখালেখির বদৌলতে দৈনিক জনকণ্ঠের সঙ্গে বিযুক্ত ছিলেন। পত্রিকাটির বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা ও পরবর্তীকালে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে তাঁর উদারতাকে আমি চিনি এবং মান্য করি। আবর্তিত সময় আমাকে জনকণ্ঠ ছেড়ে একুশে টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার, স্পেশাল করেসপনডেন্ট, চিফ রিপোর্টার, হেড অফ ইনপুট ও চিফ নিউজ এডিটর বানালেও মুক্তিকামী ও প্রাণবন্ত ওবায়েদ উল হক হকের লেখার সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটেনি। এই মঞ্চে তাঁর পরিবারের উপস্থিতি কবি নজরুলসত্ত্বারই অভিগমন বলে মনে করি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যালগরিদম আর সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল আস্ফালন সব বয়সী মানুষকে চরম আত্মকেন্দ্রিক এক বিন্দুতে পৌঁছে দিয়েছে। মননশীলতার চর্চা, সৃজনের বিকাশ, শিল্পকলার ব্যবহার একেবারে নেই বলার সময় চলে এসেছে। ফলতঃ নজরুলপ্রেমীরা এখন কোণঠাসা ও মবের ভয়ে আক্রান্ত। অল্প সংখ্যক নজরুলকে সরল কাঠামোয় দাঁড় করিয়ে তাঁকে নির্দিষ্ট ধর্মের কবি হিসেবে জাহির করতে ব্যস্ত। তাদের বৃহত্তম অংশ এসব সার্কুলারে সারাক্ষণ ডিভাইস খুললেই দেখা যায়, নজরুলকে নিয়ে আজগুবি সব সার্কুলারে ব্যস্ত তারা। সেখানে মিথ্যা-সত্যের মিশ্রনে গোয়েবলসিয় তথ্য আছে কিন্তু নজরুলের হৃদয়সংযোগ অনুপস্থিত। এমন এক প্রতিকূল সময়ে দাঁড়িয়ে চারণ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী কোনো করপোরেট অনুদান ছাড়া- নিজেদের অর্থ আর শ্রম দিয়ে মহান কবির ফেনী আগমনের শতবর্ষ উদযাপন করছে। এ ঘটনা সময়ের প্রেক্ষাপটে অনন্য অনবদ্য দলিল হয়ে রইবে পরবর্তী একশ বছর।
১৯২৫ সালে কাজী নজরুল ইসলাম ফেনী সফর করেন। একজন কবির জন্য এটি নিছক ভ্রমণ ছিল না; এ ঘটনা অবিভক্ত বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে নজরুল ফেনীর মাটি স্পর্শ করেন। তখন তিনি শুধু ‘বিদ্রোহী’ কবিতার স্রষ্টা নন—বরং ‘ধূমকেতু’ ও ‘লাঙল’ পত্রিকার মাধ্যমে তরুণ সমাজকে স্বাধীনতার বীজমন্ত্রে দীক্ষিতও করছেন। ফেনীর প্রগতিশীল সমাজ ও মুক্তিকামী মানুষ সেদিন যেভাবে কবিকে বরণ করে নিয়েছিলেন তা নজরুলের বৈপ্লবিক চেতনাকে তৃণমূলের কৃষক ও শোষিত মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দিতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল। একশ বছর পর সেই একই মাটিতে নজরুলকে নতুন করে পুনরাবিষ্কারের এই প্রয়াস প্রমাণ করে যে—নজরুল অনন্তকালের যাত্রায় অবিনশ্বর।
ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে ঐতিহাসিক চেতনার একটি শাশ্বত উত্তরাধিকার থেকেই যায়, এখানে যেমন চারণ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী জিন পরম্পরায় সে দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে। শতাব্দী পেরোলেও এ কখনও মুছে যাবে না। নজরুলের ফেনী আগমনের শতবর্ষের স্মৃতি আগলে জাতিকে ঐক্য আর প্রগতির মশাল উপহার দেয়ার সেই পরম কাজটির উদ্গাতা চারণ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর চরণে চুমু।

নজরুলকে নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে গেলে তাঁর জীবনের এক নির্মম, বেদনাদায়ক সত্য বারবার মনের কোণে ভেসে ওঠে। সারাজীবন যিনি অসাম্প্রদায়িকতার গান গেয়ে গেছেন, বাস্তবে তিনিই বারবার সংকীর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় অন্ধত্বের শিকার হয়েছেন। কুমিল্লায় প্রমীলা দেবীকে বিয়ে করার পর কলকাতায় ফিরে তিনি শহরের মূল এলাকায় কোন বাসা ভাড়া পাননি। সাম্প্রদায়িক হিন্দুরা কবিকে বাসা ভাড়া দিতে চায়নি। বাধ্য হয়ে কলকাতা ছেড়ে কবি যান হুগলিতে। আন্তঃধর্মীয় বিয়ের কারণে হুগলিতেও নজরুলকে প্রথমে কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে চান নাই। স্বদেশী আন্দোলনের কর্মী ও মোক্তার হামিদুন্নবী (কারও মতে খান বাহাদুর মাজহারুল আনোয়ার চৌধুরী) তাঁর হুগলির চকবাজার বা চাঁদ সড়ক এলাকার বাড়িটি নজরুল পরিবারকে ভাড়া দেন। আতঙ্কের মধ্যে এ বাড়িতে থাকা অবস্থায় প্রমীলা দেবী 'শঙ্কিতা' নামের একটি কবিতাও লেখেন। পরে এটি 'সাম্যবাদী' পত্রিকায় প্রকাশও হয়। হুগলিতে বসবাস করার সময় কবিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা, সাহিত্যিক আড্ডা ও পত্রিকার কাজের জন্য নিয়মিত কলকাতায় আসতে হতো। সেই সময়ে হুগলি থেকে কলকাতা যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল রেলপথ। কবির কষ্টটা একবার চিন্তা করুন। তবু তিনি দমে যান নি কূটিল সাম্প্রদায়িক আগুনের কাছে। অন্তরের আগুন দিয়ে হিংসার আগুন নেভাতে চেয়েছেন।

কবি গান শেখাতেন। প্রাইভেট পড়াতেন রাণু সোমকে। এই রাণু সোম পরবর্তীকালের প্রখ্যাত লেখিকা ও বুদ্ধদেব বসুর স্ত্রী প্রতিভা বসু। আমার যেহেতু বুদ্ধদেব বসুর ওপর ডক্টরেট করা। তাই ঘটনাটি অল্পস্বল্প জানা। তাঁকে গান শেখাতে গিয়েও বিপাকে পড়েছেন ক্ষ্যাপাটে নজরুল। এখানেও সাম্প্রদায়িকতা। পাড়ার মাস্তানদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। একদিন একদল যুবক তাঁকে আক্রমণ করলো। বেশ ক’দিন ধরেই থ্রেট দিয়েছিল কবিকে। এ পাড়ার মেয়েকে প্রাইভেট না পড়াতে। নজরুল তো নাছোরবান্দা। পরদিন যখন এসেছেন তখন হামলা করলে কবি নজরুল মাস্তানের লাঠি কেড়ে নেন। অমনি শপাং শপাং মরাৎ করে তা মাস্তানদের পিঠের ওপর। অতপর ভোঁ দৌড়। দৌড়াতে দৌড়াতে তিনি পৌঁছান প্রিয় বন্ধু, প্রখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ কাজী মোতাহার হোসেনের দফতরে। হাঁপাতে হাঁপাতে বন্ধুর হাতে ভাঙা লাঠির টুকরোটি বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন—‘এই ধরো কাজী, কাজী মারা লাঠি’। অর্থাৎ লাঠিখানা কাজী মোতাহারকে ধরতে বলেছেন। কেনো না সেটা কাজী নজরুল ইসলামের মারা লাঠি। ঐতিহসিক লাঠির টুকরো অনেকদিন কাজী মোতাহার হোসেনের বাড়িতে সংরক্ষিত ছিল বলে জানি।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে শতবর্ষ পেরিয়েও সেই সংকীর্ণ মানসিকতার খুব একটা ইতিবাচক বদল ঘটেছে বলে মনে হয় না। আজও নজরুলকে নিয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের বিপজ্জনক টানাটানি চোখে পড়ে। একশ্রেণির মানুষ তাঁকে কেবল ‘ইসলামি মহাজাগরণের কবি’ বা ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে বেঁধে রাখার চেষ্টা করেন। অপর একটি মৌলবাদী গ্রুপ কবির উদার, অসাম্প্রদায়িক ও বিপ্লবী পরিচয়কে এড়িয়ে নিজেদের মতো করে একটি ফর্ম দাঁড় করিয়েছেন। যেখানে কবির ব্রহ্মাণ্ডব্যাপী সত্ত্বা আড়ষ্ট, সংকুচিত। অথচ নজরুল স্পষ্ট ঘোষণা করে গেছেন—তিনি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা ধর্মের নন। সবকিছুর আগে তিনি একজন ‘মানুষ’ পরিচয় দিয়ে গেছেন। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার যেভাবে ধর্মীয় অন্ধত্ব ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে যুক্তি আর মানবতাবোধের জয়গান গেয়েছিলেন, চিন্তক মিশেল ফুকো যেভাবে প্রতিষ্ঠানের ভেতরকার শোষণের রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন—কবি নজরুলও ঠিক তেমনিভাবে তাঁর কাব্যে ধর্মের নামে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক শোষণ আর ভণ্ডামির মূল উপড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন।

২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কিছুদিন অবস্থান করেছিলাম। রিপোর্টিং শেষে এক সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে আছি (এমআইটি) ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির স্কুল অফ সাইন্সের সামনে। বিশ্বসেরা মেধাবীরা নৃত্যকলা করছিলেন। শারীরিক মুদ্রা আর নৃত্যের মাধ্যমে শিল্পকলার পাঠ দেওয়া হচ্ছিল। ওটা শেষ হলে মেন্টরকে শ্রদ্ধা জানিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, বিজ্ঞান শিক্ষার মধ্যে এটা আবার কেন? উনি চিরন্তন এক সত্য উচ্চারণ করলেন- ‘যে মানুষ শিল্পকলা জানে না, তিনি কোন ভালো বৈজ্ঞানিক নন।’ এই একটি বাক্যের দার্শনিক অর্থ অত্যন্ত বিস্তৃত। শিল্পকলা ও সাহিত্য মানুষের ভেতরে সহমর্মিতা আর সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে। একজন প্রযুক্তিবিদ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা শিক্ষক যদি শিল্পকলার সুকুমার পাঠ গ্রহণ না করেন, তবে তিনি যান্ত্রিক মানবে পরিণত হন। মানবিক শিক্ষার নিগুঢ়তা কবি নজরুল তার বক্তৃতা ও লেখার মাধ্যমে দিয়ে গেছেন। সুষম মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা, শিল্পিত মনের কথা তুলে ধরেছেন। উনুন-গরম দুপুর উপেক্ষা করে ফেনী শিল্পকলা অডিটরিয়ামে যেসকল শিশু কিশোরেরা উপস্থিত হয়েছেন, মনে হচ্ছে তারাই একেকজন কবি নজরুল। তারাই ক্ষ্যাপা বাউল, বাংলার বিপ্লবী কাজী।

জার্মান চিন্তাবিদ থিওডোর অ্যাডোর্নো তাঁর ‘কালচার ইন্ডাস্ট্রি’ তত্ত্বে বহু আগেই আমাদের সতর্ক করেছিলেন। বলেছিলেন, পুঁজিবাদী-যান্ত্রিক সমাজ মানুষকে কেবল উৎপাদন ও ভোগের উপযোগী একমুখী ‘ক্যারিয়ারিস্ট’ হিসেবে গড়ে তোলে। ফলে মানুষের ভেতরের নৈতিকতা আর নান্দনিক সংবেদনশীলতা একসময় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। আমাদের বাংলাদেশেও আজ মেধার নামে হাজার হাজার ডিগ্রিধারী তৈরির পাল্লা চলছে কিন্তু সুকুমার শিল্পিত মানুষ পাচ্ছি না। অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিকতার চর্চাকে দিনদিন বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিচ্ছি। উচ্চপ্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি আর শিল্পকলার স্পর্শহীন শিক্ষার এই বন্ধ্যত্ব আমি প্রত্যক্ষ করেছি মিডিয়ার মতো স্পর্শকাতর করপোরেটে। দুবাইয়ের বিখ্যাত আল হারামাইন গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ মাহাতাবুর রহমান নাসিরের সাক্ষাতকার নিতে গেলে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য তরুণের আগমন ঘটে মধ্যপ্রাচ্যে। এদের বড় অংশই আবার উপজেলা লেভেলের বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করা। দুর্ভাগ্য হলো এরা সবাই অনার্স মাস্টার্স পাস কিন্তু টেকনিক্যাল জ্ঞান নেই। আবার কাজ যতোটুকু জানে তার মধ্যে কোন সৌন্দরযবোধ নেই। তারা বিদ্যুতের সুইস লাগাতে পারেন না, মিটার চেক বোঝেন না। এমনকি টিউবয়েল বসাতে পারে না, তার জোড়া দিতে পারেন না, গ্রাফিক্স ডিজাইন পারেন না, রাজমিস্ত্রির কাজ সম্পর্কে ধারণা রাখেন না। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি পেলেও তাদের মননে শিল্পকলা বা নান্দনিকতার কোনো অনুশীলন নেই। সেজন্য আমার প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশীদের চাকরি দিতে পারি না। আতর ওপারফিউম কম্পানিতে যা তারা সবাই কামলা এবং ননস্কিল।
শিল্পকলা না জানলে যে একজন ভালো কারিগর বা প্রকৌশলীও হওয়া যায় না—এই মৌলিক সত্যটি আমরা ভুলেই থাকি। বাড়িঘর নির্মাণের সময়ও দেখি, ডিগ্রিধারী প্রকৌশলীর নকশা যে মারাত্মক ভুল তা ধরিয়ে দেন ক্লাস ফোর পাস ফোরম্যান বা হেডমিস্ত্রি। কাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আর বস্তুর নান্দনিক বোধ মিলে মানুষের মাঝে গড়ে ওঠে নিজস্ব ‘শিল্পকলা’। যার নাম কাজী নজরুল। সার্টিফিকেট এখানে ম্লান। এই যে সুন্দরতম কলাসুষমার অভাব তার একমাত্র কারণ সাহিত্যচর্চার শূণ্যতা। এই শূণ্যস্থান বা খানাখন্দ ভরে দিতে হবে নজরুলের মহিমায়।
কাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিত্বের আরেকটি অসামান্য দিক ছিল তাঁর অকৃত্রিম বহুত্ববাদ আর লোকজীবনের মাটির সঙ্গে গভীর আত্মিক যোগ। তিনি ছিলেন বাংলার মেঠোপথ আর সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের পরম অনুভূতির শালিক পাখি। এই বহুত্ববাদী ও পরম মানবিক মানসিকতার এক স্পর্শকাতর উদাহরণ ফুটে ওঠে তাঁর পারিবারিক জীবনে। সহধর্মিণী প্রমীলা দেবী পক্ষাঘাতে আক্রান্ত। আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের সব চেষ্টা একের পর এক ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছিল। স্ত্রীর যন্ত্রণা সইতে না পেরে নজরুল ইসলাম লোকজ বিশ্বাস আর ওঝা-বৈদ্যের শরণাপন্ন হন। স্ত্রীর সুস্থতার আকুলতায় ওঝার নির্দেশে তিনি দুর্গন্ধযুক্ত ডোবায় ডুব দেন। বস্তুবাদী দৃষ্টিতে কেউ একে ‘অন্ধবিশ্বাস’ বলে উড়িয়ে দিতে পারেন কিন্তু গভীর মনস্তাত্ত্বিক আলোয় দেখলে এ ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করার এক পরাবাস্তব মানবিক আকুতি। বস্তুবাদী ও বৈজ্ঞানিক মনের মানুষ কাজী নজরুল স্ত্রীর প্রতি পুরুষের ঐকান্তিক ভালোবাসার পরম বহিঃপ্রকাশ দেখিয়েছিলেন।
পল্লিকবি জসীম উদ্দীনের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্কের স্মৃতিগুলোও বাংলাসাহিত্যের সোনালি যুগের কথা মনে করিয়ে দেয়। জসীম উদ্দীন তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন ফরিদপুরের অম্বিকাপুরে গানের অনুষ্ঠান করতে। তাম্বুলখানা চরের উন্মুক্ত হাওয়ায় বসে একের পর এক পান মুখে তুলে সুরের নদী বইয়ে দিয়েছিলেন নজরুল। একটানা বিয়াল্লিশটি গান শুনিয়েছিলেন। একটি শেষ হলে একটি করে পান মুখে দেন। বলেন, জসীম তুমি খাওয়াবে পান, আর আমি গাইব গান। সেই আসরেও কিছু গোঁড়া মানুষের আক্রোশের শিকার হয়েছিলেন কবি নজরুল। ‘প্রেম-বিরহের গান শোনা পাপ’ তাই না শুনে চলে যাচ্ছিলেন লোকজন। নজরুল বললেন, বাবাজিরা চলে যাচ্ছেন কেন? মুরুব্বিদের কেউ একজন বললেন, এসব গান শোনা হারাম। নজরুল হাত জোড় করে বললেন, আর কিছু সময় বসুন। এরপর কবি শুরু করলেন তাঁর ইসলামি সঙ্গীত। সে এক অভূতপূর্ব পরিবেশ। কারও চোখ ছলো ছলো, কেউবা চাদরের খুটে নাকের জল মুছলেন নবীবন্দনার সুরে।
নজরুল তাঁর শিল্পবোধ আর সত্যের আদর্শ থেকে একচুলও পিছপা হননি। তাঁর সৃষ্টির মহত্ত্ব এখানেই। তাঁর রচনায় একদিকে যেমন স্পন্দিত হয়েছে গভীর সুফি গজলের খোদা-প্রেম, অন্যদিকে তেমনি ফুটে উঠেছে শ্যামাসংগীত, কীর্তন আর ভাটিয়ালির অমৃত সুর। পারস্যের কালজয়ী সুফি কবি জালাল উদ্দীন রুমি কিংবা খাজা হাফিজ শিরাজী যেভাবে ঐশ্বরিক প্রেম আর পার্থিব মানবপ্রেমকে এক সুতোয় গেঁথেছিলেন, নজরুলও ঠিক তেমনি বাংলাসাহিত্যে ধর্ম, সাম্য আর মানুষকে এক অবিচ্ছেদ্য প্রেমে রূপান্তরিত করেছিলেন।
আজকের বাংলাদেশে আমরা করুণ, অসামঞ্জস্যপূর্ণ সামাজিক বৈপরীত্য দেখতে পাই। ধর্মীয় উপাসনালয় বা বাহ্যিক ধর্মাচারের পেছনে মানুষ অকাতরে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। কিন্তু ‘চারণ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’র মতো কোনো প্রতিষ্ঠান যখন অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিকবোধ আর সুকুমার শিল্পকলার চর্চার উদ্যোগ নেয় তখন টাকার অভাবে তা ভেস্তে যায়। সুস্থ সাংস্কৃতিক আয়োজন করতে চাইলেই অর্থায়নের তীব্র খরা এসে হানা দেয়। করপোরেট সমাজ বা ধনাঢ্য শ্রেণির একটি বড় অংশ প্রশ্ন তোলে—“একশ বছর আগের নজরুলকে নিয়ে আবার কিসের এত মাতামাতি? এতে আমাদের কী লাভ?” অথচ যেকোন ধর্মীয় পার্বণে কোটি কোটি টাকা খরচা করতে কুণ্ঠিত নন তারা। এই প্রশ্ন নিছক একমুখী কৌতূহল নয়; এ আমাদের গোটা সমাজের ভেতরে জমে থাকা গভীর কূপমণ্ডূকতার নগ্ন প্রকাশ। আমার নিজের জেলা কুষ্টিয়া—যাকে আপনারা সাংস্কৃতিক রাজধানী বলেও ডাকেন। সেখানকার একজন বিশিষ্ট শিল্পপতির কাছে নজরুল মৃত্যুবার্ষিকীর চাঁদা আনতে গেলে ভদ্রলোক বলেছিলেন—“এই নজরুল ছাওয়ালডা কিডা? তার বাড়ি কোন পাড়ায়? সে মলো কবে যে, তার জন্য ট্যাকা তোলা লাগবি?”
দুঃখের বিষয় শিল্পপতি জানেন না কবি নজরুল ইসলাম আসলে কে!! এমন কতো শত লোক আছেন যারা কবি নজরুল ইসলামের খোঁজ রাখেন না।
আমাদের দেশের উচ্চবিত্ত শ্রেণির একাংশের এই সীমাহীন দেউলিয়াত্ব সমাজকে বারংবার মর্মাহত আর বাকরুদ্ধ করছে। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে। শহরজুড়ে উঠছে উঁচু উঁচু দালান কিন্তু মানুষের অভ্যন্তরে মননশীলতার অবকাঠামো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। ঠিক এই চরম দেউলিয়াত্ব আর অন্ধকারের প্রেক্ষাপটেই ফেনীতে আয়োজিত নজরুলের শতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানের মহত্ত্ব ফুটে ওঠে। কোনো বড় করপোরেট সাহায্য ছাড়া, নিজেদের বেতন থেকে টাকা খরচ করে ফেনীর শামীম পাটোয়ারী, সাবী ভাই, অর্জুন দাসসহ প্রবুদ্ধ মানুষেরা কবি নজরুলকে স্মরণের এমন এক প্রদীপ প্রোজ্জ্বলন করলেন যা সত্যিই প্রশংসনীয়। ফেনীর মাটিতে বসে আমি জাগ্রত নজরুলের আলোকশিখা প্রত্যক্ষ করছি। এটি আমাদের স্তব্ধ হয়ে যাওয়া হৃদয়গুলোকে নতুন করে সঞ্চারণ ঘটাবে।

নজরুলকে চিনতে হলে কেবল গুগল, ফেসবুক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যান্ত্রিক তথ্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রযুক্তি আমাদের তথ্য এনে দিতে পারে, কিন্তু কারও বুকে সহমর্মিতা বা নান্দনিক অনুভূতির জন্ম দিতে পারে না। নজরুলকে চিনতে হলে ফিরে যেতে হবে তাঁর সর্বজনীন মানবিক দর্শনপাঠে। তাঁর শৌর্য আর সমাজের নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের জন্য কবির অশ্রুসিক্ত দরদ জমাটবদ্ধ হয়ে জানান দেবে। ফেনীর মুক্ত আকাশে জ্বলে ওঠা এই সাংস্কৃতিক আলোকশিখা কেবল ভৌগোলিক ফেনীর সীমানায় আটকে থাকবে না। এই অসাম্প্রদায়িকতা, সুসংহত মানবতাবাদ ছড়িয়ে পড়বে প্রত্যেক বাঙালির চেতনার বাষ্পলোকে। একশ বছর আগে নজরুল ইসলাম ফেনীর মাটিতে যে বৈপ্লবিক পদধ্বনি রেখে গিয়েছিলেন, সেই শব্দপুঞ্জ আজও হালফিল অন্ধকারে ডুবে থাকা মেঠোপথ আলোকিত করে দিচ্ছে। নজরুলের চেতনা আমাদের আলোকশিখা। কবির বিপ্লবী বাসনা আমাদের হৃদয়ের সংসপ্তক। কাজী নজরুলের আদর্শ আমাদের প্রাণ-পরিশুদ্ধের গভীরতর স্যালাইন। আসুন, আমরা নজরুল এভিনিউ ধরে হাঁটি। দুর্বার গতিতে উড়ে চলি নজরুল নামের আলপথ ধরে। এ রাস্তা জীবনের জন্য অত্যাবশ্যক। এ পথ অসাম্প্রদায়িকতার মতো মহান ও বৃহৎ। জয়তু চারণ সাংস্কৃতি গোষ্ঠী। জয় হোক ফেনীর মানুষের। জয় কবি নজরুল।
[বিশিষ্ট সাংবাদিক ও বক্তা ড. অখিল পোদ্দার, বাংলাদেশের বিখ্যাত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। সর্বশেষ তিনি একুশে টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক ছিলেন। এর আগে একুশে টিভির চিফ রিপোর্টার, হেড অফ ইনপুট ও অনুসন্ধানী সেলের প্রধান ছিলেন। কাজ করেছেন দৈনিক ভোরের কাগজ ও জনকণ্ঠ পত্রিকায়। বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের নিপীড়ন ও দাবি নিয়ে কাজ করা মিডিয়ানেটওয়ার্কের চিফ এডিটর তিনি। এছাড়া অনুসন্ধানী পত্রিকা এক্সফাইলস বিডির প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন]
