মঙ্গলবার,

২৪ মার্চ ২০২৬

|

চৈত্র ৯ ১৪৩২

XFilesBd

বন্ধ হয়ে গেছে অনেক পাম্প

আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাত: সংকট মোকাবেলায় কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

শিউলী সিকদার

প্রকাশিত: ০১:৫১, ২৪ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ০১:৫১, ২৪ মার্চ ২০২৬

আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাত: সংকট মোকাবেলায় কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতি, ডলার সংকট, এবং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার কারণে এই উদ্বেগ এখন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। সরকার বারবার আশ্বস্ত করছে—দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই, মজুদ পরিস্থিতিও সন্তোষজনক। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, আমদানি কাঠামো, অর্থনৈতিক চাপ এবং নীতিনির্ধারণী সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জ্বালানি তেল সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি এখনও নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকে। এই আমদানির জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা, যা বর্তমানে দেশের জন্য একটি বড় চাপের জায়গা। ডলার সংকটের কারণে এলসি (Letter of Credit) খোলা জটিল হয়ে উঠছে, ফলে সময়মতো তেল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। যদিও সরকার বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা করছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদি কোনো স্থিতিশীল কৌশল এখনো সুস্পষ্ট নয়।

সরকারি হিসাবে বলা হয়, দেশে গড়ে ৩০ থেকে ৪৫ দিনের জ্বালানি তেলের মজুদ রাখা হয়। এই মজুদ স্বাভাবিক সময়ের জন্য যথেষ্ট হলেও, বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা বা সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটলে তা দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য বা অন্যান্য সরবরাহকারী দেশে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর। এই প্রেক্ষাপটে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, কৌশলগত মজুদ (strategic reserve) বাড়ানো জরুরি, যা বাংলাদেশে এখনো পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি।

অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। তেল পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের দুর্বলতা রয়েছে। পাইপলাইন নেটওয়ার্ক এখনও পুরোপুরি সম্প্রসারিত হয়নি, ফলে অনেক ক্ষেত্রে নদীপথ বা সড়কপথে তেল পরিবহন করতে হয়, যা ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। এতে একদিকে যেমন অপচয় ও চুরি বাড়ে, অন্যদিকে সরবরাহে অনিয়ম দেখা দেয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝেমধ্যে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার পেছনে এই দুর্বল অবকাঠামো একটি বড় কারণ হিসেবে উঠে আসে।

এছাড়া জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়াও একটি সংবেদনশীল বিষয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা করলেও দেশের বাজারে তা সমন্বয় করতে সরকার প্রায়ই বিলম্ব করে বা রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে কখনো ভর্তুকির বোঝা বাড়ে, আবার কখনো হঠাৎ দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়, যা বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে। এই অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।

সরকার অবশ্য কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। মহেশখালীতে গভীর সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন, পাইপলাইন স্থাপন, এবং এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের মতো প্রকল্পগুলো ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভারত ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন ধীরগতির এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করছে বৈদেশিক ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ওপর।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু আমদানিনির্ভরতা কমানোই নয়, বরং বিকল্প জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়াও জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরশক্তির সম্ভাবনা বাংলাদেশে যথেষ্ট থাকলেও তা এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কাজে লাগানো হয়নি। একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো এবং অপচয় কমানোর ক্ষেত্রেও কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে।

সবকিছু বিবেচনায় বলা যায়, বাংলাদেশ জ্বালানি তেল সংকট মোকাবেলায় কিছু প্রস্তুতি রাখলেও তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। স্বল্পমেয়াদে সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও, দীর্ঘমেয়াদে একটি সুসংগঠিত, বহুমুখী এবং টেকসই জ্বালানি নীতির অভাব স্পষ্ট। বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা নয়, বরং অবকাঠামো উন্নয়ন, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং বিকল্প জ্বালানির প্রসার—সবকিছুকে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগোতে হবে। না হলে ভবিষ্যতে যেকোনো বড় ধাক্কা দেশের জ্বালানি খাতকে গভীর সংকটে ফেলে দিতে পারে।