দাদা ঠাকুর আর কত বড় হবো
- ডি. এন. চ্যাটার্জী
দাদা ঠাকুর,
আমার বয়স আজ ৭১! তুমি জানো, মুক্তিযুদ্ধে বয়স ছিল ১৬।
দাদা ঠাকুর তখন রাজনীতি করতেন, আমাকে বলতেন, দেখিস!
বাঙালি একদিন স্বাধীন হবে,
বাংলা ভাষায় কথা বলবে,
বাংলায় স্বপ্ন দেখবে,
বাংলা ভাষা হাজার বছরের অবহেলা থেকে মুক্ত হবে,
বিশ্ব দরবারে বাংলা মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে!!
অবোধের মতো দাদুকে বললাম,
দাদু!
বাংলায় তো রবীন্দ্রনাথ আছেন, আছেন নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ, মাইকেল আরো কত বড়ো বড়ো মানুষ,
তবে কেন আমরা পরাধীন?
দাদু গম্ভীর হয়ে বলতেন,
'স্বাধীন ভুখন্ড ছাড়া
কোনো জাতি হয়নারে স্বাধীন।
আপন মাঝে আপনারে
রাখে চির পরাধীন'।।
মুক্তিযুদ্ধ হলো, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হলো, স্বাধীন ভুখন্ড পেলাম - স্বপ্নের বাংলাদেশ।
দেশের নাকি পতাকা থাকতে হয়, থাকতে হয় জাতীয় সংগীত!
তাও হলো - 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি' !
মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধা সমার্থক হলো।
সব হারিয়ে শরণার্থী জীবন কাটিয়ে
দাদুকে নিয়ে বিজয় দিবসের পরদিন মাতৃভূমির বিরান ভিটেই ফিরে এলাম। কান্না করে দাদুকে বললাম,
দাদু আমাদের বাড়ি ধুলিসাৎ কেন?
দাদু সাহস দিয়ে বললেন,
বাংলাদেশ আজ স্বাধীন, আজ আমরা মুক্ত ব্রিটিশ থেকে, পাকিস্তান থেকে।
দেখিস, আমাদের সব হবে, আমরাও সম-অধিকার পাবো, বড় হবো! বলতেন, নিশিদিন ভরসা রাখিস হবেই হবে!!
দাদুর কথায় বুক বেঁধে আবার হাঁটলাম। স্বপ্ন দেখলাম দাদুর কথায়,
"দেখিস আমরাও সম -অধিকার পাবো, বড়ো হবো"।
পরিপূর্ণ যৌবন এলো, মনে দোলা দিলো!
হটাৎ একদিন শুনলাম আমরা বাঙালি নই, বাংলাদেশী!
দাদু তখন পৌঢ়, সজ্যাশায়ী।
তবুও বিনয়ে শুধালাম,
দাদু, এর অর্থ কি?
দাদু বললেন, এটি স্বতন্ত্র সত্তা!
এ ভুখন্ডের আমরা সবাই জাত- পাত ভুলে, সবাই এক ও অভিন্ন -
আমরা বাংলাদেশি।
স্বপ্ন আরো জোরালো হলো,
জীবনের গতি দিলাম আরও বাড়িয়ে,
অধিকার বোধে বাংলার এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ঘুরে ফিরলাম-
দাদুর কথায় ভর করলাম,
'আমরা এক ও অভিন্ন' !
পথ হাঁটতে হাঁটতে আজ ক্লান্ত, শ্রান্ত, হাঁটার শক্তি আজ ক্ষীণ!
জীবনের শেষ প্রান্তে কেন যেন মনে হয়,
"আপন আপন করিস যারে
সে তোর আপন নয়।
বন্ধু ভেবে যখন যাবি
বুকের মাঝে কেবল পাবি,
বন্ধু ভাবের সেজন যেন
কেমন দূরে রয়"।।
দাদু আজ বিগত, আমিও আজ পৌঢ়'র দলে!
শুধু দাদুকে অভিমান করে বলতে ইচ্ছে করে -
" আমি আর কত বড়ো হবো দাদু!
মোহ ছাড়েনা মোরে,
হৃদয় কাঁদিয়া ফেরে, শুধু স্বপ্নের বাংলায়!
একবার ফিরে আসিতে যদি
এই বাংলায়।
দেখিতে তোমার স্বপ্নের বাংলা স্বরহারা, নীড়হারা ব্যাধের তিরের থাবায়।।
ভ্রান্তি ভরে চেয়ে থাকি, ধূসর স্বপ্ন দেখি
এ ঘর সাজিবে একদিন।
বাঙাল মানুষ হবে, কেহ নাহি বাঙাল রবে,
মানুষের কাতারে তারা রবে
চির অমলিন ।।
