মঙ্গলবার,

০৯ জুন ২০২৬

|

জ্যৈষ্ঠ ২৫ ১৪৩৩

XFilesBd

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এগিয়ে আসার আহ্বান

গুডউইল বনাম প্রশাসনিক খড়্গ: আদ্-দ্বীন হাসপাতালের সংকট ও সরকারের করণীয়

প্রফেসর ডা. নাহিদ ইয়াসমিন

প্রকাশিত: ০৪:৪২, ৯ জুন ২০২৬

আপডেট: ০৪:৪৩, ৯ জুন ২০২৬

গুডউইল বনাম প্রশাসনিক খড়্গ: আদ্-দ্বীন হাসপাতালের সংকট ও সরকারের করণীয়

গুডউইল বনাম প্রশাসনিক খড়্গ: আদ্-দ্বীন হাসপাতালের সংকট ও সরকারের করণীয়

- প্রফেসর ডা. নাহিদ ইয়াসমিন

একটি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা কতখানি পরিপক্ক এবং জনবান্ধব, তা কেবল হাসপাতালের আধুনিক যন্ত্রপাতি বা বড় বড় ভবন দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং তা বোঝা যায় সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দূরদর্শিতা এবং বিচারবুদ্ধির গভীরতা দেখে। সম্প্রতি রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের অনাকাঙ্ক্ষিত অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর ঘটনাটি পুরো জাতিকে স্তব্ধ করেছে। যেকোনো শিশুর অকাল প্রয়াণ অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং অভিভাবক হিসেবে তাদের ক্ষোভ সুবিচার পাওয়ার দাবি শতভাগ যৌক্তিক। কিন্তু এই বেদনাদায়ক ট্র্যাজেডিকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেভাবে প্রায় তিন দশকের ঐতিহ্যবাহী, ৭০০ বেডের একটি পূর্ণাঙ্গ সেবামূলক হাসপাতালকে সরাসরি 'শাটডাউন' বা বন্ধ করে দেওয়ার এক নজিরবিহীন তৎপরতা শুরু করেছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। এই একরোখা সিদ্ধান্ত দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা সংকটকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে। প্রশ্ন জাগে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত 'মেডিকেল ট্র্যাজেডি' বা দুর্ঘটনা হতে পারে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেন সেটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করতে নারাজ? এর পেছনে কি শুধুই আইনের প্রয়োগ, নাকি কোনো গভীর প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্বেষ বা অদৃশ্য মহলের কলকাঠি কাজ করছেতা আজ বিশ্ব বাংলাদেশের চিকিৎসায়তিহাসের পাতা উল্টে খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।

ইতিহাস আন্তর্জাতিক চিকিৎসা খাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত বিশ্বস্ত হাসপাতালগুলোতেও বিভিন্ন সময়ে বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে, ইনফেকশন বা চিকিৎসার জটিলতায় রোগী কিংবা শিশু মারা গেছে। কিন্তু সেসব দেশের সরকার বা রেগুলেটরি বডি কখনোই হাসপাতাল বন্ধ করে দেয়নি। কারণ, সেইসব প্রতিষ্ঠানের একটি দীর্ঘদিনের 'গুডউইল' বা সুনাম থাকে, যা একদিনে তৈরি হয় না। উদাহরণস্বরূপ-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণজনস হপকিন্স হসপিটালবামেয়ো ক্লিনিক’-এর মতো বিশ্বসেরা চিকিৎসাকেন্দ্রেও বিভিন্ন সময়ে ভুল চিকিৎসায় বা আকস্মিক সংক্রমণে রোগীর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল (BMJ)-এর একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, খোদ যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও প্রতি বছর 'হসপিটাল-অ্যাকোয়ার্ড ইনফেকশন' (HAI) বা হাসপাতাল-অর্জিত সংক্রমণের কারণে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অফ মেডিসিন (IOM) তাদের বিখ্যাত "To Err is Human" রিপোর্টে উল্লেখ করে যে, দেশটিতে প্রতি বছর প্রায় ৪৪,০০০ থেকে ৯৮,০০০ মানুষ কেবল হাসপাতালের চিকিৎসাগত ভুলের কারণে মারা যান। কিন্তু এই বিপুল প্রাণহানির পরও সেসব দেশের সরকার কোনোদিন জনস হপকিন্স বা মেয়ো ক্লিনিকের লাইসেন্স বাতিল করেনি কিংবা পুরো প্রতিষ্ঠান তালাবদ্ধ করে দেয়নি। তারা যেটা করেছে তা হলোসুনির্দিষ্ট ত্রুটি চিহ্নিত করা, নির্দিষ্ট ওয়ার্ডকে জীবাণুমুক্ত বা আইসোলেট করা এবং প্রোটোকল সংস্কার করা। কারণ, একটি দীর্ঘদিনের সুনামের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিলে চিকিৎসা ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়বে।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের চেন্নাই বা কলকাতার অ্যাপোলো এবং ফোর্টিস হাসপাতালের মতো বড় কর্পোরেট হাসপাতালেও চিকিৎসায় গাফিলতি কিংবা অঙ্গ প্রতিস্থাপন কেলেঙ্কারির মতো বড় বড় অপরাধ দুর্ঘটনার রেকর্ড রয়েছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন সময়ে এসব হাসপাতালকে বিশাল অঙ্কের জরিমানা করেছে, চিকিৎসকদের লাইসেন্স সাময়িক বাতিল করেছে; কিন্তু কোনো আদালত বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কখনোই ৭০০ বা ১০০০ বেডের একটি আস্ত হাসপাতাল শাটডাউন করার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়নি। কারণ, প্রাতিষ্ঠানিক গুডউইল এবং লাখ লাখ সাধারণ রোগীর চিকিৎসার অধিকারকে সেখানে ব্যক্তিবিশেষের ভুলের চেয়ে বড় করে দেখা হয়েছে।

নিজেদের দেশের ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সরকারি হাসপাতালযেমন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতাল কিংবা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে প্রায়শই ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যু, অক্সিজেনের অভাবে নবজাতকের প্রাণহানি কিংবা ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দ্বারা রোগীর স্বজন বা সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। মিটফোর্ড হাসপাতালে অতীতে ভেজাল ওষুধ এবং ইনফেকশনে রোগী মৃত্যুর মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও আইসিইউ-তে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মৃত্যুর ঘটনা আমরা দেখেছি। কিন্তু সরকার কি কখনো ঢাকা মেডিকেল বা মিটফোর্ড হাসপাতাল বন্ধ করে দিয়েছে? দেয়নি। কারণ সরকারি হাসপাতাল বন্ধ করলে লাখো গরিব মানুষ রাস্তায় মারা যাবে। তাহলে বেসরকারি খাতের আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বেলায় কেন এই চরমপন্থী দ্বিমুখী নীতি? আদ্-দ্বীন কি ঢাকার বুকে আরেকটি ঢাকা মেডিকেল নয়, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার গরিব মধ্যবিত্ত মানুষ নামমাত্র খরচে জীবন রক্ষাকারী সেবা পান?

১৯৯৭ সাল থেকে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত চিকিৎসা দিয়ে দেশের মানুষের মনে এক অবিচল সুখ্যাতি স্থান করে নিয়েছে। এটি মূলতগরিবের সেবাসদননামে পরিচিত। বর্তমানে এই ৭০০ বেডের হাসপাতালের ৩০০টি বেডই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অসহায় রোগীদের জন্য বরাদ্দ থাকে, যেখানে থাকা-খাওয়ার জন্য কোনো টাকা গুনতে হয় না। রাজধানীর মোট শিশু প্রসবের প্রায় শতাংশ এককভাবে এই হাসপাতালে সম্পন্ন হয়। এই যে দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের পরীক্ষিত গুডউইল, দেশের স্বাস্থ্য খাতে এর চেয়ে বড় অবদান আর কার আছে? আদ্-দ্বীন হাসপাতালের আইসিইউ, এনআইসিইউ এবং ডায়ালাইসিস ইউনিটে ইনফেকশন প্রতিরোধে সবসময়ই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। তারপরও গত ২৭ মে যে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে, তা অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত। কিন্তু এই সংকটের পর হাসপাতালটির কর্ণধার ডা. শেখ মহিউদ্দিনের ভূমিকাটি লক্ষ্য করুন। তিনি একজন নিপাট, সজ্জন, সমাজসেবক রাজনীতিবিমুখ মানুষ। তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনের সস্তা অজুহাত না খুঁজে, নিজের ভুলত্রুটি স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে বড় ধরনের আর্থিক সাহায্য দিয়েছেন এবং হাসপাতালের অভ্যন্তরে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন। এমনকি সাংবাদিকদের ওপর উগ্র আচরণের দায়ে তাৎক্ষণিকভাবে দোষী ক্লিনারদের চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। সরকারের সব ধরনের রেগুলেটরি নীতিমালা মেনে চলা এই প্রতিষ্ঠানটি যখন নিজেদের সর্বোচ্চ সংশোধনের মানসিকতা দেখাচ্ছে, তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেন এর পেছনেদুর্ঘটনা চেয়ে বড় কোনো অপরাধ খোঁজার চেষ্টা করছেন, তা সাধারণ মানুষের মনে তীব্র সন্দেহের উদ্রেক ঘটায়।

যখন কোনো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সরকারি ব্যবস্থার চেয়েও দক্ষভাবে এবং সাধারণ মানুষের মন জয় করে সেবা দিতে শুরু করে, তখন অনেক সময় নীতিনির্ধারক করপোরেট মহলের একটি অংশের মধ্যে সুপ্ত হীনম্মন্যতা পরশ্রীকাতরতার জন্ম নেয়। ঢাকার বুকে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা পাঁচ তারকা বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চোখ ধাঁধানো আলো আর আকাশচুম্বী বিলের কাউন্টার যখন সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে, তখন আদ্-দ্বীন সেখানে এক মস্ত বড় কাঁটা। কারণ আদ্-দ্বীন দেখিয়েছে যে, নামমাত্র খরচেও আন্তর্জাতিক মানের এনআইসিইউ সেবা বা জটিল অস্ত্রোপচার করা সম্ভব। এই সাশ্রয়ী কিন্তু বিশ্বমানের সেবার কারণে বহু কর্পোরেট হাসপাতালের একচেটিয়া বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। ফলে, আদ্-দ্বীনের এই সংকটকে পুঁজি করে সেইসব প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করপোরেট লবি যে পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছে না, তার নিশ্চয়তা কী? স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই অতি-উৎসাহী 'শাটডাউন' তত্ত্বের পেছনে তাই স্বাভাবিকভাবেই কোনো বাণিজ্যিক বিদ্বেষ বা প্রশাসনিক হিংসা থাকার গন্ধ পাচ্ছে সাধারণ মানুষ।

একটি প্রতিষ্ঠিত সুনামধন্য প্রতিষ্ঠানকে এক ঝটকায় ধূলিসাৎ করে দিতে পারলে সেই বিশাল রোগী সাধারণের সিংহভাগ বাধ্য হয়েই ওইসব ব্যয়বহুল বাণিজ্যিক হাসপাতালের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়বে। অর্থাৎ, আদ্-দ্বীনের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে অন্য কোনো মহলের অতি-মুনাফার প্রাসাদ তৈরি হবে। কিন্তু এই মরণকামড় শেষ পর্যন্ত কার গায়ে লাগবে? এর চূড়ান্ত ভুক্তভোগী হবে এই দেশের সেইসব খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, যাদের বেসরকারি বড় হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য নেই। গত কয়েক দিনের চিত্রই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণসমস্ত নেতিবাচক প্রচারণা রহস্যের মেঘ ডিঙিয়ে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে আবারও জ্যামিতিক হারে রোগীর চাপ বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বহির্বিভাগে হাজার ৩৯ জন রোগী সেবা নিয়েছেন এবং ৭১ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা হাজারো বাবা-মায়ের এই স্বতঃস্ফূর্ত ভিড় প্রমাণ করে যে, আদ্-দ্বীনের ওপর তাঁদের আস্থা টলেনি।

একটি সভ্য দেশে বিচার সংশোধনের প্রক্রিয়া চলে আইনের শাসনে, প্রতিহিংসা বা বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে নয়। আদ্-দ্বীন হাসপাতালে যদি কোনো ত্রুটি থেকে থাকে, তবে তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী তার সমাধান হোক, কঠোর নজরদারির মধ্যে রেখে সেবার মান আরও উন্নত করতে বাধ্য করা হোক। কিন্তু কর্মচারীদের উগ্রতা বা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার অজুহাতে পুরো হাসপাতালটিকে বলির পাঁঠা বানানো কোনোভাবেই সুশাসনের লক্ষণ হতে পারে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত কোনো অদৃশ্য শক্তির ইশারায় বা সিন্ডিকেটের কলকাঠিতে পুতুল না সেজে, দেশের সাধারণ মানুষের চোখের ভাষা বোঝা। আদ্-দ্বীনের মতো একটি অনুকরণীয় স্বাস্থ্য মডেলকে বাঁচিয়ে রাখা এবং তাদের ত্রুটিগুলো পরিমার্জন করে আরও উন্নত সেবা দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়াটাই হবে প্রকৃত সমাধান। কারণ আদ্-দ্বীন বাঁচলে বাঁচবে দেশের হাজারো অসহায় মানুষের প্রাণ, সুসংহত হবে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা।

[প্রফেসর ডা. নাহিদ ইয়াসমিন বরেণ্য চিকিৎসক ও রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের মহাপরিচালক]