মঙ্গলবার,

০৯ জুন ২০২৬

|

জ্যৈষ্ঠ ২৫ ১৪৩৩

XFilesBd

পাওয়া যাবে ঢাকা ও বিভাগীয় শহরে

শব্দশ্রমিক ও ঋজু কণ্ঠস্বর: ওবায়েদ আকাশের সৃজনশীল তিন দশক ও সুবর্ণযাত্রা

অখিল পোদ্দার

প্রকাশিত: ০৪:০৮, ৯ জুন ২০২৬

শব্দশ্রমিক ও ঋজু কণ্ঠস্বর: ওবায়েদ আকাশের সৃজনশীল তিন দশক ও সুবর্ণযাত্রা

শব্দশ্রমিক ও ঋজু কণ্ঠস্বর: ওবায়েদ আকাশের সৃজনশীল তিন দশক ও সুবর্ণযাত্রা

      - অখিল পোদ্দার

বাংলা সাহিত্যের সমকালীন ভূখণ্ডে ওবায়েদ আকাশ এক অনিবার্য নাম। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন কবিতার শৈল্পিক উৎকর্ষ, মননশীল গদ্যের নির্মাণ এবং মানসম্মত সাহিত্য সম্পাদনার ক্ষেত্রে। সম্প্রতি তাঁর পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে কবি ও নন্দনতাত্ত্বিক মাহফুজ আল-হোসেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থ ‘সুবর্ণ আকাশ’ যেন তাঁর দীর্ঘ বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের এক সার্থক দলিল। যা তিনি ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন। যেখানে এই আখ্যানের ব্যাপ্তি ও তীব্রতা সাহিত্যপ্রেমীদের উষ্ণতা তো দিয়েছেই পাশাপাশি গর্ব করার মতো একখানা স্মারকও দীপ্তমান ওবায়েদ আকাশের সাহিত্য গগনে।

কবিতার নির্মাণ ও নিরীক্ষা: নব্বইয়ের দশকের সেই অস্থির ও রূপান্তরকামী সময়ে ওবায়েদ আকাশের কাব্যযাত্রার সূচনা। তাঁর কবিতায় জীবন ও জগতের প্রতি এক প্রকার দার্শনিক দৃষ্টি লক্ষ্য করা যায়। তিনি গতানুগতিক ছক ভেঙে কবিতার ভাষায় এক ধরনের তীক্ষ্ণতা ও আধুনিকতা নিয়ে এসেছেন। নাগরিক জীবনের নিঃসঙ্গতা, প্রেম, অস্তিত্বের সংকট এবং বৈশ্বিক সাহিত্যের আবহে নিজের স্বরকে তিনি করেছেন অনন্য। দীর্ঘ এই পথচলায় তিনি বহু কাব্যগ্রন্থ উপহার দিয়েছেন, যা পাঠক ও সমালোচক মহলে নতুন আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। তাঁর কবিতার শব্দচয়ন ও চিত্রকল্প বাংলা কবিতায় এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বহন করে।

সম্পাদনার আপসহীন ঘরানা: কেবল ‘শালুক’ নয় ওবায়েদ আকাশের পরিচিতির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তাঁর সম্পাদনা। ‘শালুক’ পত্রিকাটিকে তিনি বাংলা সাহিত্যচর্চার অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। তবে তাঁর সম্পাদনার পরিধি কেবল একটি পত্রিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন সময়ে তিনি সাহিত্যের নানামুখী সংকলন সম্পাদনা করেছেন, যেখানে নবীন ও প্রবীণ লেখকদের যুগপৎ উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন। সম্পাদনার ক্ষেত্রে তিনি ‘মান’ ও ‘মেধা’কে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। বর্তমান সময়ের সাহিত্যপত্রিকা যখন কেবলই সংখ্যাপূরণের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, তখন ওবায়েদ আকাশ ধারাবাহিকভাবে সাহিত্যের রুচি ও মান রক্ষায় একাকী লড়াই করে গেছেন। নতুন লেখকদের খুঁজে বের করা এবং তাদের মানসম্মত পাঠের ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়ার পেছনে তাঁর নিরলস শ্রম বাংলা সাহিত্যের জন্য এক বড় সম্পদ। পাশাপাশি দৈনিক সংবাদ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি যেভাবে সাহিত্যসাধনার অংশীজন তাতে তাঁকে স্যালুট করতেই হয়। মাসের পর মাস একাগ্রচিত্তে দেশের সবচেয়ে শক্তিমান ঐতিহ্যের পত্রিকার মাধ্যমে দেশে বিদেশে গড়ে তুলেছেন বিশাল এক লেখকশ্রেণি।

মননশীল গদ্য ও নন্দনতাত্ত্বিক ভাবনা: কবিতার পাশাপাশি ওবায়েদ আকাশের গদ্য সাহিত্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা সাহিত্যের ক্ল্যাসিক ধারার লেখক থেকে শুরু করে সমকালীন সাহিত্য প্রবণতা-সবকিছু নিয়েই তাঁর বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর গদ্যের ভঙ্গি ঋজু, যৌক্তিক এবং নন্দনতাত্ত্বিক। বিভিন্ন সাহিত্য-তত্ত্ব ও দর্শনের আলোকে সাহিত্যের পাঠোদ্ধার করার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা তাঁকে প্রাবন্ধিক হিসেবে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

সুবর্ণজয়ন্তী ও বন্ধুত্বের অনন্য স্বাক্ষর: ‘সুবর্ণ আকাশ’: সম্প্রতি তাঁর পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে প্রকাশিত ৮০০ পৃষ্ঠার বিশাল স্মারকগ্রন্থ ‘সুবর্ণ আকাশ’ যেন তাঁর কর্মজীবনের এক সামগ্রিক স্বীকৃতি। মাহফুজ আল-হোসেনের সম্পাদনায় এই গ্রন্থে দেশের শীর্ষস্থানীয় লেখক থেকে প্রতিশ্রুতিশীল তরুণরা ওবায়েদ আকাশের কর্ম ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে কলম ধরেছেন। এই আয়োজন প্রসঙ্গে ওবায়েদ আকাশ জানান, ‘মাহফুজ ভাই কেবল একজন বন্ধু নন, তিনি আমার কাজের একজন নিষ্ঠাবান পর্যবেক্ষক। আমার সাহিত্য ও সম্পাদনা নিয়ে যারা এত পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখেছেন, তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’ এই স্মারকগ্রন্থটির দাম মাত্র ৭০০ টাকা রাখা হয়েছে, যা তাঁর শিল্পবোধের মতোই সাধারণ পাঠকদের প্রতি দায়বদ্ধতারই বহিঃপ্রকাশ।

সাহিত্যচর্চায় প্রভাব: ওবায়েদ আকাশ কেবল লেখক বা সম্পাদক নন, তিনি সাহিত্যের একজন অভিভাবকও বটে। নতুন প্রজন্মের কবি-লেখকদের তিনি যেভাবে দিকনির্দেশনা ও উৎসাহ দেন, তা বর্তমান সময়ে বিরল। তিনি বিশ্বাস করেন, সাহিত্যের কোনো সীমানা নেই, বরং মানসম্মত কাজের চর্চাই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। তাঁর এই বিশ্বাস ও চর্চাই তাঁকে আজকের ‘ওবায়েদ আকাশ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সাহিত্যের এই উজ্জ্বল ধ্রুবতারাকে আরও কাছ থেকে বুঝতে ‘সুবর্ণ আকাশ’ গ্রন্থটি পাঠকদের সংগ্রহে রাখার মতো একটি কাজ। বইটি পাওয়া যাচ্ছে: ঢাকা: শাহবাগ পাঠক সমাবেশ কেন্দ্র; আজিজ সুপার মার্কেটের জনান্তিক, তক্ষশিলা ও কবি প্রকাশনী এবং বাংলা মোটর বাতিঘর।  এছাড়া চট্টগ্রাম বাতিঘর, রাজশাহী বাতিঘর ও সিলেট বাতিঘর।

ওবায়েদ আকাশের এই সুবর্ণযাত্রায় আমরা তাঁর দীর্ঘায়ু ও আরও সৃজনশীল কর্মময় জীবনের প্রত্যাশা করি। তাঁর কলম ও সম্পাদনার মুন্সিয়ানা বাংলা সাহিত্যকে আগামী দিনে আরও সমৃদ্ধ করবে-এটাই সকল সাহিত্যপ্রেমীর প্রত্যাশা।