শনিবার,

৩০ আগস্ট ২০২৫

|

ভাদ্র ১৪ ১৪৩২

XFilesBd

ব্রেকিং

২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন অর্থ-উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। মোট বাজেট -৭,৯০,০০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা-৫,৬৪,০০০ কোটি টাকা বাজেট ঘাটতি -২,২৬,০০০ কোটি টাকা (জিডিপির ৩.৬%) জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা-৫

প্রতিদিনই কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে সাগরে ডুবে। কে রাখে তার খোঁজ

হয় মৃত্যু না হয় ভূমধ্যসাগর পাড়ি। স্বপ্ন ছুঁতে গিয়ে সলিল সমাধি

ড. অখিল পোদ্দার (Dr. Akhil Podder)

প্রকাশিত: ০১:৫০, ১৩ আগস্ট ২০২৫

আপডেট: ০৪:৪০, ১৪ আগস্ট ২০২৫

হয় মৃত্যু না হয় ভূমধ্যসাগর পাড়ি। স্বপ্ন ছুঁতে গিয়ে সলিল সমাধি

মৌলভীবাজার জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে ২৬ বছরের মিনহাজ উদ্দিন পরিবারের সবার কাছ থেকে ধার করে ১৩ লাখ টাকা দেন এক স্থানীয় দালালকে। প্রতিশ্রুতি ছিল—তিন মাসের মধ্যে ইতালিতে পৌঁছে যাবে এবং সেখানে রেস্তোরাঁয় চাকরি করবে। কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেছে, মিনহাজ এখন লিবিয়ার একটি অচেনা বন্দিশিবিরে বন্দি, প্রতিদিন তাকে মারধর করা হচ্ছে পরিবারের কাছ থেকে আরও টাকা আদায়ের জন্য। মিনহাজের মতো হাজারো মানুষ প্রতি বছর এইভাবে বিদেশগামী স্বপ্নের ফাঁদে পা দেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে কমপক্ষে ২,৭৫০ বাংলাদেশি মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে লিবিয়া, টিউনিশিয়া, ও মরক্কো হয়ে ইউরোপগামী রুটই সবচেয়ে বেশি প্রাণ কেড়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে এই চক্র খুব সুসংগঠিত। গ্রামের ‘বিশ্বস্ত’ কোনো ব্যক্তি বা পুরনো বিদেশফেরতকে সামনে রেখে তারা প্রথমে আস্থা অর্জন করে। এরপর ‘প্যাকেজ ডিল’—যেখানে ভিসা, টিকেট, কাজ সব অন্তর্ভুক্ত—প্রদর্শন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এদের হাতে থাকে না কোনো বৈধ নথি। প্রথমে বিমান ভিসার কথা বললেও, পরে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার জন্য মরুভূমি, সমুদ্র কিংবা লরির ভেতরে অবৈধভাবে পাঠানো হয়। যাত্রাপথে ভুক্তভোগীদের নানা ধরনের নৃশংসতার শিকার হতে হয়। লিবিয়ার মিজদাহ শহরে ২০২০ সালে একটি বন্দিশিবিরে গুলিতে নিহত হন ২৬ বাংলাদেশি অভিবাসী—এ ঘটনার পেছনেও ছিল দালাল চক্রের হাত। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNHCR) জানিয়েছে, লিবিয়ার পাচারকারীরা প্রায়শই বন্দি করে রাখা অভিবাসীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায় এবং পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করে।

মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর টুটুল এক্সফাইলসকে বলেন, এখানকার বেশ কটি গ্রামে দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। আমাদের কাছে সন্ধান আছে। আমরা আটক করেছি বেশ কিছু দালালকে। কিন্তু গ্রেফতারের চেয়ে সচেতনতা বড্ড বেশি দরকার। আমরা সেদিকটায় নজর দিচ্ছি। মানুষের পেটে ক্ষুধা থাকলে সে বিকল্প উপায়ে তা নিবৃত্তির চেষ্টা করবে। তেমনি স্বপ্ন যার আছে বিদেশে যাবার সে যখন সুন্দরভাবে যেতে না পারে তা যেভাবেই হোক সেখানে যাবার জন্য মরিয়া হবেই। এটাকে এডভেঞ্চার মনে করে কেউ কেউ। সুতরাং পুলিশ দিয়ে ধরে বেঁধে এটি দমনের চেয়ে আমরা বোঝানোর চেষ্টা করছি। আশাকরি তাতে কাজ দেবে কিছুটা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করে, প্রায়ই এই দালাল চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়। তবে তদন্তে দেখা গেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা অনেকেই ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। গ্রেপ্তার হলেও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও সাক্ষী-প্রমাণের অভাবে অনেকেই শাস্তি এড়িয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দালালদের দমন করতে হলে শুধু সীমান্তে নজরদারি নয়, দেশের ভেতরে গ্রাম পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ পুলিশের মানবপাচার প্রতিরোধ ইউনিটের এক কর্মকর্তা জানান, “মানুষকে বোঝাতে হবে, ইউরোপে পাড়ি দেওয়া মানেই সাফল্য নয়—অবৈধ পথে গেলে এটি অনেক সময় মৃত্যুর যাত্রা হয়ে দাঁড়ায়।”তবুও স্বপ্নের টানে মানুষ দালালদের কাছে নিজেদের সমর্পণ করছেন। বাড়িতে ফিরে আসা কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা শুনলে বোঝা যায়, ইউরোপে পৌঁছানোর আগে অনেকেই দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হন—যার অনেকটাই চিরতরে শেষ করে দেয় তাদের জীবনযাত্রা।

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিনই মানুষ পাড়ি জমাচ্ছেন ইউরোপের পথে—কেউ বৈধভাবে, কিন্তু অনেকে অবৈধ রুটে। ‘দালালের মাধ্যমে দ্রুত ইউরোপ’—এই স্বপ্নের ফাঁদে পা দিয়ে অসংখ্য মানুষ ফেঁসে যাচ্ছেন মৃত্যু, নির্যাতন ও প্রতারণার জালে। এদের রুট বাংলাদেশ → দুবাই/ওমান → সুদান/মিশর → লিবিয়া → ভূমধ্যসাগর → ইতালি/স্পেন। তারপর সেখান থেকে দালালদের মাধ্যমে অন্য কোথাও। এই রুটে যাত্রীরা প্রথমে পর্যটক বা ভুয়া কাজের ভিসায় মধ্যপ্রাচ্যে যান। সেখান থেকে পাচারকারীরা মরুভূমি পাড়ি দিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যায়, যেখানে বন্দিশিবিরে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। এরপর ছোট নৌকা বা ট্রলারে করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে হয়। হিসাব বলছে, ২০১৯–২০২৪ অব্দি মৃত/নিখোঁজ বাংলাদেশীর সংখ্যা ২,৭৫০। লিবিয়ায় বন্দি ১,২০০ জন। আর সাগরে ডুবে মৃত্যু হয়েছে ১,৫০০। (তথ্যসূত্র: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, IOM, UNHCR)। ভুক্তভোগীর মিনহাজ উদ্দিন বলেন, আমাদের গ্রামে একজন বিদেশফেরত ভাই ছিল। সে বলল, ইউরোপে যাওয়া সহজ, শুধু টাকা দিতে হবে। আমি বাবার জমি বিক্রি করে ১১ লাখ টাকা দিই। অতপর ঢাকা থেকে দুবাই, সেখান থেকে সুদান হয়ে মরুভূমি পাড়ি দিই। ৮ দিন গাড়ি ও পায়ে হাঁটতে হয়েছে। খাওয়ার পানি ছিল কম, ২ জন মরেও যায় পথেই।

লিবিয়ায় গিয়ে কী হয়েছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে মিনহাজ বলেন, আমাদের ৩০ জনকে একটা ঘরে আটকে রাখে। প্রতিদিন মারধর করত। পরিবারকে ফোন দিয়ে বলত, আরও টাকা পাঠাও। ২ মাস পর মুক্তি পাই, কিন্তু নৌকায় চড়ে সাগরে নামতেই নৌকা ডুবে যায়। আমি সাঁতরে বেঁচে যাই, কিন্তু ১২ জন মারা যায়। এখন দেশে ফিরে এসেছি, কিছুই নেই। শুধু ঋণ আর দুঃস্বপ্ন আছে।