শুক্রবার,

১২ জুন ২০২৬

|

জ্যৈষ্ঠ ২৮ ১৪৩৩

XFilesBd

বারবার রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক!

রাজা বদলালে পাহাড়াদার বদল হয় ইসলামী ব্যাংকে

সুলতান মাহমুদ রেজা

প্রকাশিত: ০০:০১, ১১ জুন ২০২৬

আপডেট: ০০:২২, ১১ জুন ২০২৬

রাজা বদলালে পাহাড়াদার বদল হয় ইসলামী ব্যাংকে

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বহু বছর ধরেই এটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সরকারের পালাবদল, ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর উত্থান-পতন কিংবা রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাস—প্রতিবারই এই ব্যাংককে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে নিয়ন্ত্রণের লড়াই। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, দেশের অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় ইসলামী ব্যাংকই কেন বারবার রাজনৈতিক দাবা খেলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটিতে পরিণত হচ্ছে? ব্যাংকটির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় এটি জামায়াতে ইসলামীর ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ইসলামী সংস্থার প্রভাবাধীন ছিল বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্ব এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই ব্যাংক ধীরে ধীরে দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। আমানত, বিনিয়োগ, শাখা বিস্তার এবং গ্রাহকসংখ্যার বিচারে এটি দীর্ঘদিন ধরেই দেশের শীর্ষ ব্যাংকগুলোর একটি।

২০১৭ সালে ব্যাংকটির মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরিচালনা পর্ষদে প্রবেশ করেন। এর মাধ্যমে কার্যত ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তিত হয়। সে সময় বিভিন্ন মহলে অভিযোগ ওঠে, সরকারি সমর্থন ও প্রশাসনিক প্রভাবের মাধ্যমে এই পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট পক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। পরবর্তী কয়েক বছরে ইসলামী ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অর্থ স্থানান্তর নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যালোচনা, গণমাধ্যমের অনুসন্ধান এবং অর্থনীতিবিদদের বক্তব্যে ব্যাংকটির সম্পদের মান, খেলাপি ঋণ এবং তারল্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংকটির আর্থিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার ঝড় ওঠে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে দায়িত্ব নেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এর পরপরই দেশের কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইসলামী ব্যাংকও এর বাইরে ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয় এবং আগের প্রভাববলয় ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়।

এই পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক দেখা দেয়। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, ব্যাংকটির নতুন ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন ব্যক্তিরা জায়গা পাচ্ছেন, যাদের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বা জামায়াতে ইসলামীর ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থকরা দাবি করেন, এসব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মূলত পেশাগত যোগ্যতা বিবেচনায় এবং ব্যাংকটিকে আগের আর্থিক সংকট থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য। এ পর্যন্ত প্রকাশ্যে এমন কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি, যেখানে বলা হয়েছে যে এনসিপি বা জামায়াতে ইসলামী সংগঠিতভাবে ব্যাংকটি “লুটপাট” করেছে। তবে নিয়োগ, প্রভাব বিস্তার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে আগ্রহের অন্যতম কারণ এর বিপুল আর্থিক শক্তি। প্রায় কয়েক কোটি গ্রাহক, কয়েক লাখ কোটি টাকার আমানত, দেশের সর্ববৃহৎ শাখা নেটওয়ার্কগুলোর একটি এবং প্রবাসী আয় আহরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে ব্যাংকটির ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের একটি বড় মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির বিভিন্ন মহল থেকেও ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন নিয়ে আগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে, ভবিষ্যতে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা কাঠামো নিয়েও নতুন করে সমীকরণ তৈরি হতে পারে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী-সমর্থক বিভিন্ন মহল মনে করে, ব্যাংকটি তাদের ঐতিহাসিক প্রভাববলয়ের বাইরে চলে গিয়েছিল এবং সেটিকে পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন রয়েছে। যদিও দলটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাংকটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সমস্যার মূল কারণ ব্যক্তি বা দল নয়, বরং ব্যাংকিং খাতের দুর্বল সুশাসন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ বারবার বলেছেন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাব কমানো ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহিতা এবং স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত না হলে মালিকানা বা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, ইসলামী ব্যাংকের গল্প আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি। এক সময় জামায়াতপন্থী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, পরে এস আলম গ্রুপ, এরপর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভিন্ন শক্তির প্রভাব—প্রতিটি পর্যায়ে ব্যাংকটি ক্ষমতার বলয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেছে। তাদের মতে, একটি ব্যাংক যখন কয়েক লাখ কোটি টাকার আমানত, বিশাল গ্রাহকভিত্তি এবং বিস্তৃত সামাজিক নেটওয়ার্কের অধিকারী হয়, তখন সেটি শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে। আর সেই কারণেই বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক যুগে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে নতুন নতুন হিসাব-নিকাশ তৈরি হয়েছে।

সবশেষে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এটি কোনো রাজনৈতিক শক্তির প্রভাবাধীন থাকবে, নাকি সত্যিকার অর্থে একটি পেশাদার, স্বচ্ছ ও স্বাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে পারবে তার ওপর। কারণ ব্যাংকটির মালিক প্রকৃত অর্থে কোনো রাজনৈতিক দল নয়; এর প্রকৃত মালিক কোটি কোটি আমানতকারী ও সাধারণ গ্রাহক।