ক্রান্তিকালীন সংস্কার: প্রশাসনিক শুদ্ধি
- ড. মো: আশরাফুর রহমান
একটি দীর্ঘস্থায়ী ফ্যাসিবাদী বা স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর যে নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বন্দোবস্ত তৈরি হয়, তার পথ কখনোই মসৃণ হয় না। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শক্তির অবসান ঘটিয়ে যখন একটি নতুন গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন জনগণের প্রত্যাশার পারদ থাকে আকাশচুম্বী। তবে ২০২৬ এর নির্বাচনের পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক সংকটে জর্জরিত। একদিকে যেমন শীর্ষ নেতৃত্বে রাষ্ট্র সংস্কারের নতুন রাজনৈতিক আকুতি ও রূপরেখা রয়েছে, অন্যদিকে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে আছে বিগত স্বৈরাচারী আমলের আমলাতান্ত্রিক বিষবাষ্প।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্বগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফ্যাসিবাদ পরবর্তী ক্রান্তিকালে যদি একটি দুর্বল ও ভঙ্গুর রাষ্ট্র তার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, নীতিনির্ধারণে মন্ত্রীদের নিষ্ক্রিয়তা ও অতিরিক্ত আমলানির্ভরতা জেঁকে বসে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত হয়—তবে পুরো রাষ্ট্রটিই একসময় ব্যর্থ রাষ্ট্রে (Failed State) পরিণত হতে পারে। বর্তমান বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ দূরত্বের নিরিখে একটি গভীর রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের সতর্কতামুলক ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ এখনই নেওয়া জরুরী।
শীর্ষ নেতৃত্বের দর্শন বনাম মাঠপর্যায়ের বিচ্যুতি: আদর্শিক ও ব্যবহারিক ফাটল
যেকোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান যখন দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসেন বা একটি দূরদর্শী সংস্কারের স্বপ্ন দেখেন, তখন সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন নির্ভর করে দলের নেতা-কর্মী এবং মাঠপর্যায়ের শক্তির ওপর। শীর্ষ নেতৃত্ব যখন একটি উদার, আধুনিক এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার কথা বলছেন, তখন তৃণমূল বা মধ্যম সারির একশ্রেণীর নেতা-কর্মীদের মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক আচরণে তার প্রতিফলন ঘটছে না।
দীর্ঘ দেড় দশক ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে মাঠপর্যায়ে যে এক ধরণের অধৈর্য ও লুণ্ঠনমুখী মানসিকতা তৈরি হয়েছে, তা নতুন সরকারের ভাবমূর্তি গঠনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। শীর্ষ নেতৃত্বের "মনের চাওয়া" বা রাজনৈতিক দর্শনের সাথে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের এই যে বিশাল দূরত্ব, তা দলের অভ্যন্তরে একটি মনস্তাত্ত্বিক ফাটল তৈরি করেছে। শীর্ষ নেতার দূরদর্শিতা ও আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তাকে পাশ কাটিয়ে মাঠপর্যায়ে যখন দখলদারিত্ব, ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি কিংবা পুরোনো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার উচ্ছেদের নামে নিজস্ব ফায়দা লোটার চেষ্টা করা হয়, তখন তা জনগণের আস্থার ওপর বড় ধরনের আঘাত হানে।
রাড্ডা ঘটনার শিক্ষা: রাজনৈতিক জবাবদিহি ও জনগণের আস্থার প্রশ্ন
সম্প্রতি মিরপুরে জমির মালিকানার জটিলতার সুযোগে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। জমির মালিকানা আদালতে সুরাহা করার সুযোগ থাকলেও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সমর্থনে ভাঙচুরের ঘটনাটি ঘটে।শক্তিমত্তা পরীক্ষার একটি সেকেলে মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। কিন্ত ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের নয়া রাজনৈতিক চেতনা এই ধরনের মহড়া সমর্থন করে না। একটি অনেক পুরাতন মা-শিশু হাসপাতাল ভাঙচুরের ঘটনা জনগণ সহজ ভাবে নেয় নাই।বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপির চেয়ারপারসন এর নির্দেশে এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি গত ১ অক্টোবর ২০২৬, সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে জমা দেন এবং দলীয় ব্যবস্থা হিসেবে এ ঘটনায় বিএনপি তাদের ঢাকা মহানগর উত্তর আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে অব্যাহতি দেয় এবং ঢাকা উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে। এহেন অবস্থায় দেশের অন্যান্য স্থানের দলের নেতাকর্মীদের ওপর প্রভাব পড়ে। স্বার্থান্বষী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে হুস ফিরেছে কিনা এই বিষয়ে হলফ করে বলার সময় এখনও আসে নাই। তবে নৈতিকতার ছন্দ পতনে অবিমৃষ্যকারী নেতাকর্মীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মোক্ষম সময়টি এখনই। তা না হলে আগামীর স্থানীয় নির্বাচনে জনগণ বিএনপি প্রার্থী থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করার আশঙ্কা রয়েই যাবে।

সব দিক বিবেচনা করে যদি আমরা হিসাব মেলাতে যাই, তবে আমাদের চিন্তার রাজ্যে এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ ঘটা অস্বাভাবিক নয়।এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা হলো ১৯৯০-এর দশকে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসানের পর নেলসন ম্যান্ডেলা যখন একটি বৈষম্যহীন এবং 'রেইনবো নেশন' (বহুজাতিভিত্তিক রাষ্ট্র) গড়ার রূপরেখা দিয়েছিলেন, তখন তাঁর দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (ANC)-এর একাংশের মাঠপর্যায়ের নেতা ও ক্যাডাররা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারে লিপ্ত হয়। শীর্ষ নেতৃত্বের উদার দর্শনের সাথে মাঠপর্যায়ের এই বিচ্যুতির ফলে পরবর্তী কয়েক দশকে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি চরম রূপ নেয় এবং ম্যান্ডেলার মূল স্বপ্নটি হেয় প্রতিপন্ন হয়। বাংলাদেশকেও এই মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ফাটল দ্রুত মেরামত করতে হবে; অন্যথায় শীর্ষ নেতৃত্বের সব দূরদর্শী পরিকল্পনা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা ও চাটুকারিতার সংস্কৃতি
একটি ক্রান্তিকালীন রাষ্ট্রকে পরিচালনার জন্য দরকার উচ্চমানের নীতিনির্ধারক, দূরদর্শী চিন্তাবিদ এবং আন্তর্জাতিক মানের থিংক-ট্যাংক। কিন্তু বর্তমানে ক্ষমতার অন্দরে প্রকৃত জ্ঞানী, সৎ এবং পেশাদার বুদ্ধিজীবীদের অভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। রাজনীতিতে কেবল মাঠ কাঁপানো স্লোগানধারী বা অন্ধ ভক্তদের দিয়ে এই জটিল রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়। কর নীতি সংস্কার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনা, জন আইন-শৃঙ্খলা , ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা কিংবা সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে যখন সূক্ষ্ম সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়, তখন রাজনীতিকদের চেয়ে বিশেষজ্ঞ ও পেশাদারদের ভূমিকার গুরুত্ব অনেক বেশি থাকে। কিন্তু শীর্ষ নেতৃত্বের চারপাশে যখন চাটুকার, মোসাহেব ও সস্তা জনমোহিনী স্লোগানসর্বস্ব ব্যক্তিদের ভিড় তৈরি হয়, তখন সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা ভুল সিদ্ধান্তের জন্ম দেয়, যা রাষ্ট্রকে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়।
এক্ষেত্রে আমরা আন্তর্জাতিক উদাহরণ থেকে শিক্ষণীয় বিষয়টি অন্তর্ভুক্তি হিসেবে দেখতে পারি।সিঙ্গাপুরের আধুনিক রূপকার লি কুয়ান ইউ তাঁর আত্মজীবনীতে স্পষ্ট লিখেছিলেন যে, তাঁর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল—তিনি নিজের চেয়েও বুদ্ধিমান ও দক্ষ মানুষদের তাঁর কেবিনেট এবং উপদেষ্টা পরিষদে স্থান দিয়েছিলেন। লি কুয়ান ইউ চাটুকারদের তীব্র ঘৃণা করতেন এবং বলতেন, "যে নেতা নিজের গুণকীর্তন শুনতে পছন্দ করে, সে রাষ্ট্রকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়।" এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে জিম্বাবুয়েতে রবার্ট মুগাবের আমলে, যেখানে মেধার চেয়ে অন্ধ আনুগত্যকে পুরস্কৃত করার ফলে পুরো দেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

প্রশাসনিক পঙ্গুত্ব: আমলানির্ভরতা ও মন্ত্রীদের চিন্তার নিষ্ক্রিয়তা
একটি নির্বাচিত সরকারের সফলতার মূল চালিকাশক্তি হলো তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা মন্ত্রিপরিষদ।এখানে ক্ষেত্র বিশেষে বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সৃষ্টি হতে পারে নীতিনির্ধারণে মন্ত্রীদের চিন্তার নিষ্ক্রিয়তা এবং অতিরিক্ত আমলানির্ভর সিদ্ধান্ত (Bureaucratic Dependency)।
বিভিন্ন রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে হয় মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের মধ্যে দূরদর্শী চিন্তার অভাব এবং রুটিন কাজের বাইরে গিয়ে কোনো উদ্ভাবনী বা কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ না নেওয়ার অক্ষমতা প্রশাসনকে স্থবির করে দিতে পারে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন পুরো মন্ত্রণালয় অকার্যকর হয়ে পড়ে।
তখন ফিরে আসে আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা। যে কোন দেশের মন্ত্রীদের এই নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে নীতিনির্ধারণের মূল চাবিকাঠি চলে যায় আমলাদের হাতে। আমলারা স্বভাবগতভাবেই স্থিতাবস্থা পছন্দ করে এবং তারা দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের চেয়ে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বেশি আগ্রহী হয়। রাজনৈতিক ভিশন ছাড়া কেবল আমলাদের প্রশাসনিক ছক দিয়ে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো অসম্ভব।এই চিত্র যে কোন দেশের জন্য বিপজ্জনক।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুর্বলতা
যেকোনো সফল সরকারের প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইন-শৃঙ্খলার ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা পুলিশ বাহিনীর কার্যকারিতা বেগবান করতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন বলে ওয়াকিবহাল সূত্র দাবি করছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তার বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বিবেচনায় নিতে পারেন।
পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠন, তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনা এবং মাঠপর্যায়ে অপরাধ দমনে তাদের সক্রিয় করার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতা ও অদক্ষতা স্পষ্ট। আইন-শৃঙ্খলার এই নাজুক পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরণের নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের জন্ম হচ্ছে। পুলিশ যখন নিষ্ক্রিয় থাকে বা কার্যকর ভূমিকা রাখতে ভয় পায়, তখন সমাজে অপরাধী চক্র, গ্যাং কালচার এবং মব জাস্টিস (উচ্ছৃঙ্খল জনতার আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া)-এর মতো বিপজ্জনক প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, যা একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
ফ্যাসিবাদের উচ্ছিষ্ট ও আমলাতান্ত্রিক বিষবাষ্প
বিগত দেড় দশক ধরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম ছিল, তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো—প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা বিগত আমলের আমলাতান্ত্রিক বিষবাষ্প। ফ্যাসিবাদের দোসর, যারা বিগত সরকারের অন্যায় ও লুণ্ঠনের অংশীদার ছিল, তারা এখনো প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল তবিয়তে আছে অথবা খোলস বদলে নতুন সরকারের নীতি নির্ধারণকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।
একই সাথে, ক্ষমতার পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলেরই কিছু লোভী ও নীতিহীন নেতা বিগত সরকারের উচ্ছিষ্টভোগী ব্যবসায়ী, ব্যাংক লুটেরা এবং দুর্নীতিবাজ আমলাদের সাথে গোপন সখ্যতা ও আর্থিক সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।। টাকার বিনিময়ে এই অপরাধীদের সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে প্রশাসনে প্রকৃত শুদ্ধি অভিযান ব্যাহত হচ্ছে বলে জনগণ বিশ্বাস করা শুরু করেছে।। ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত নতুন ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে ধ্বংস করার জন্য এই আমলাতান্ত্রিক বিষবাষ্প ও লোভী সিন্ডিকেটই সবচেয়ে বেশি দায়ী বলে মনে করা হয়।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্ব রাজনীতির নির্মম শিক্ষা থেকে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে নাৎসি বাহিনীর পতনের পর মিত্রশক্তি 'ডি-নাৎসিফিকেশন' (Denazification) কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে নাৎসি আদর্শের মানুষদের সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা। কিন্তু যেখানেই এই ছাঁটাই প্রক্রিয়া শিথিল করা হয়েছিল, সেখানেই নব্য-নাৎসিবাদের উত্থান ঘটেছিল। বাংলাদেশকেও তার প্রশাসন থেকে ফ্যাসিবাদের এই বিষবাষ্পকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে হবে, অন্যথায় যেকোনো সময় ভেতর থেকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর আঘাত আসতে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি: দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর শকুনের চোখ ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি নির্মম সত্য হলো—"দুর্বল রাষ্ট্র সর্বদা শক্তিশালী প্রতিবেশীদের বা আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর চারণভূমিতে পরিণত হয়।" বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি অঞ্চলে অবস্থিত, যা বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত প্রবেশদ্বার এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মহলে একটি "দুর্বল ও ভঙ্গুর রাষ্ট্র" হিসেবে উপস্থাপন করার পর্যাপ্ত অনুষঙ্গ রয়েছে। আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত হচ্ছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তি, যাদেরকে রূপক অর্থে "শকুনের চোখ" বলা যেতে পারে, তারা বাংলাদেশের এই ক্রান্তিকালকে ব্যবহার করে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়। দেশের অভ্যন্তরে অস্থিরতা জিইয়ে রেখে তারা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার চক্রান্ত হতেই পারে।অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য ও প্রশাসনিক শক্তি না থাকলে এই আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবেলা করা অসম্ভব।
সমাধান ও রাষ্ট্রীয় সতর্কতা: জাতীয় প্রয়োজনের রাজনীতি
একটি দীর্ঘস্থায়ী ফ্যাসিবাদী বা স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর যে নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বন্দোবস্ত তৈরি হয়, তার পথ কখনোই মসৃণ হয় না। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শক্তির অবসান ঘটিয়ে যখন একটি নতুন গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন জনগণের প্রত্যাশার পারদ থাকে আকাশচুম্বী। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক সংকটে জর্জরিত। একদিকে যেমন শীর্ষ নেতৃত্বে রাষ্ট্র সংস্কারের নতুন রাজনৈতিক আকুতি ও রূপরেখা রয়েছে, অন্যদিকে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে আছে বিগত স্বৈরাচারী আমলের আমলাতান্ত্রিক বিষবাষ্প।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্বগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্ব রাজনীতির তুলনামূলক ইতিহাস এবং ক্ষমতার অলিগলিতে লুকিয়ে থাকা অভ্যন্তরীণ হুমকির নিরিখে আমাদের এখনই একটি গভীর রাজনৈতিক সতর্কতামূলক পর্যালোচনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
মনস্তাত্ত্বিক ফাটল ও বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা
শীর্ষ নেতৃত্বের দর্শন বনাম মাঠপর্যায়ের বিচ্যুতি এখন একটি বড় আদর্শিক ও ব্যবহারিক ফাটল তৈরি করেছে। শীর্ষ নেতৃত্ব যখন একটি উদার, আধুনিক এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার কথা বলছেন, তখন তৃণমূল বা মধ্যম সারির একশ্রেণীর নেতা-কর্মীদের মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক আচরণে তার প্রতিফলন ঘটছে না। দীর্ঘ দেড় দশক ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে মাঠপর্যায়ে যে এক ধরণের অধৈর্য ও লুণ্ঠনমুখী মানসিকতা তৈরি হয়েছে, তা নতুন সরকারের ভাবমূর্তি গঠনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা।
একই সাথে ক্ষমতার অন্দরে দেখা দিয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা ও চাটুকারিতার সংস্কৃতি। রাজনীতিতে কেবল মাঠ কাঁপানো স্লোগানধারী বা অন্ধ ভক্তদের দিয়ে এই জটিল রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়। কর নীতি সংস্কার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনা, ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা কিংবা সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে যখন সূক্ষ্ম সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়, তখন শীর্ষ নেতৃত্বের চারপাশে চাটুকার ও মোসাহেবদের ভিড় ভুল সিদ্ধান্তের জন্ম দেয়, যা রাষ্ট্রকে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়।এই মুহূর্তে আত্মেপলব্ধি খুবই জরুরী।
ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব ও রক্তস্নাত অধ্যায় পার হয়ে বাংলাদেশ আজ এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই নব্য অর্জিত আকাংখা ও রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন টেকসই হবে কি না, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সরকারের সাহসিকতা, দূরদর্শিতা এবং কঠোর ও আপসহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ওপর। রাষ্ট্র পরিচালনায় অন্ধ আনুগত্যের চেয়ে মেধা, সততা ও দেশপ্রেমের মূল্যায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

লোভী সিন্ডিকেটের থাবা থেকে দলকে এবং আমলাতান্ত্রিক বিষবাষ্পের কবল থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে মুক্ত করতে না পারলে, ছাত্র-জনতার অসীম আত্মত্যাগে অর্জিত দ্বিতীয় স্বাধীনতার মূল চেতনা চোরাবালিতে হারিয়ে যাবে। অতএব, সময় থাকতে জাগতে হবে; অনতিবিলম্বে রাষ্ট্রীয় ও সাংগঠনিক শুদ্ধি অভিযান সফল করার মাধ্যমে মেধা ও দেশপ্রেমের জয় নিশ্চিত করতে হবে। তবেই রক্ষা পাবে বাংলাদেশ, সুসংহত হবে একটি বৈষম্যহীন ও স্বনির্ভর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি।
(লেখক: অতিরিক্ত আইজিপি অব. ও জন-নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ)
