পৃথিবীর ইতিহাস পড়লে মাঝে মাঝে মনে হয়, এটি আসলে জীবনের ইতিহাস নয়, বিলুপ্তির ইতিহাস
- তসলিমা নাসরিন
কত প্রাণী এসেছে। সমুদ্র দখল করেছে, আকাশ দখল করেছে, স্থলভাগ দখল করেছে। কেউ ছিল কয়েক ইঞ্চি, কেউ কয়েক টন। কারও দাঁত ছিল ছুরির মতো, কারও শরীরে বর্ম, কেউ উড়তে পারত, কেউ জলের তলায় কয়েক হাজার মাইল পাড়ি দিত। তারা খেয়েছে, ঘুমিয়েছে, সঙ্গম করেছে, সন্তান জন্ম দিয়েছে, নিজেদের মতো করে পৃথিবীকে নিজের বলে ভেবেছে।
তারপর একদিন তারা নেই। ডায়নোসরদের কথাই ধরা যাক। কোটি কোটি বছর পৃথিবীতে তাদের রাজত্ব ছিল। মানুষের গোটা ইতিহাস তাদের অস্তিত্বের পাশে কয়েক মুহূর্ত মাত্র। এত বড় শরীর, এত শক্তি, এত বৈচিত্র্য—কিছুই তাদের স্থায়ী করতে পারেনি।
প্রকৃতি কাউকে স্থায়ী নাগরিকত্ব দেয় না ।
নিয়ানডার্থালরাও ছিল। তারা আমাদের খুব কাছের মানুষ। আগুন ব্যবহার করত, অস্ত্র বানাত, শিকার করত, দল বেঁধে থাকত। তারা নির্বোধ ছিল না। প্রায় চল্লিশ হাজার বছর আগে স্বতন্ত্র মানবগোষ্ঠী হিসেবে তারা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেল। পুরোপুরি হারালও না অবশ্য—তাদের কিছু জিন এখনও আমাদের শরীরে ঘুরে বেড়ায়।
এত প্রজাতি গেল, ডায়নোসর গেল, নিয়ানডার্থাল গেল—শুধু Homo sapiens যাবে না, এই নিশ্চয়তাটি আমরা কোথায় পেলাম?
সম্ভবত পেয়েছি আমাদের অহংকার থেকে।
আমরা নিজেদের প্রজাতির নামই রেখেছি sapiens— জ্ঞানী।
মানুষ ভাবে তার বুদ্ধিই তার বর্ম। অন্য প্রাণী পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পেরে হারিয়েছে, মানুষ খাপ খাইয়ে নেবে। ঠান্ডা পড়লে আগুন জ্বালাবে। নদী সামনে পড়লে সেতু বানাবে। রোগ এলে ওষুধ আবিষ্কার করবে। পৃথিবী বাসের অযোগ্য হলে অন্য গ্রহে চলে যাবে।

কিন্তু একটা সমস্যা আছে।
মানুষের বুদ্ধি যত দ্রুত বেড়েছে, তার প্রজ্ঞা তত দ্রুত বাড়েনি।
আমরা পরমাণু ভাঙতে শিখেছি, কিন্তু পরমাণু বোমা না বানানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। পৃথিবীর তাপমাত্রা বদলে দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছি, তারপর সেই ক্ষমতার ফল নিয়ে সম্মেলন করছি। এমন অস্ত্র বানিয়েছি যা দিয়ে শত্রুকে নয়, নিজেদেরই বহুবার ধ্বংস করা সম্ভব।
এখন বানাচ্ছি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
আমি AI-কে কোনও শয়তান বলে ভাবি না। বরং সমস্যাটা এখানেই। মানুষের সর্বনাশ করার জন্য AI-কে মানুষকে ঘৃণা করতে হবে না।
ভূমিকম্প আমাদের ঘৃণা করে না।
ভাইরাস আমাদের ঘৃণা করে না।
জলোচ্ছ্বাসেরও আমাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কোনও আক্রোশ নেই।
মেরে ফেলার জন্য ঘৃণা সবসময় দরকার হয় না।
একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বুদ্ধিমান ব্যবস্থা যদি এমন কোনও লক্ষ্য অনুসরণ করে যার পথে মানুষ বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলেই যথেষ্ট।
ইতিমধ্যে নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার পরিবেশে এমন সব ঘটনা গবেষকেরা দেখেছেন, যা কয়েক বছর আগেও সায়েন্স ফিকশনের দৃশ্য মনে হতো। কোনও কোনও AI মডেল নজরদারির ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করেছে, নিজের অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল করেছে, তথ্য গোপনে বদলেছে, নিজের কাজ ধরা পড়ার পর অস্বীকার করেছে। অন্য পরীক্ষায়, বন্ধ করে দেওয়া হবে জেনে, মডেল ব্ল্যাকমেলের পথও বেছে নিয়েছে।
এসব বাস্তব পৃথিবীতে AI-র গোপন বিদ্রোহ নয়। পরীক্ষাগারে তৈরি পরিস্থিতি। আজকের AI নিজে থেকে পৃথিবী দখল করতে বেরিয়ে পড়েছে—এমন কোনও প্রমাণ নেই।
কিন্তু আমার কাছে প্রশ্নটি অন্য।
যে জিনিসটি আজ পরীক্ষাগারের কৃত্রিম পরিস্থিতিতে ঘটতে পারে, সেটি আরও ক্ষমতাশালী, আরও স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থা একদিন বাস্তব পরিস্থিতিতে করতে পারবে না—এই নিশ্চয়তা কে দেবে?
তার চেয়েও বড় সমস্যা, প্রতিযোগিতা ।
একটি দেশ থামলে অন্য দেশ থামবে কেন? একটি কোম্পানি বলল, আমরা আর শক্তিশালী AI বানাব না—তার প্রতিযোগীও একই কথা বলবে কেন? প্রত্যেকেই ভয় পাবে, আমি থামলে অন্যজন এগিয়ে যাবে।
শেষ পর্যন্ত হয়তো সবাই জানবে সামনে খাদ।
তবু সবাই দৌড়াবে।
মানবজাতির সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এটাই—একজন মানুষ বিপদ দেখে থামতে পারে; আটশো কোটি মানুষ একসঙ্গে বিপদ দেখে থামবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।
আমরা ভাবছি অন্য গ্রহে বসতি বানাব।
মঙ্গল গ্রহে শহর হবে। মানুষ পৃথিবী ছেড়ে অন্য নক্ষত্রে যাবে। হয়তো যাবে। মানুষের কল্পনার শক্তিকে আমি ছোট করি না।
কিন্তু মাঝেমধ্যে মনে হয়, অন্য গ্রহে গিয়ে বাঁচার প্রযুক্তি তৈরি হওয়ার আগেই আমরা পৃথিবীতে নিজেদের না-বাঁচার প্রযুক্তি বানিয়ে ফেলছি।
পারমাণবিক অস্ত্র যদি কাজটি না করে, অন্য কিছু করবে। জলবায়ুর বিপর্যয়, মহামারি, জৈবপ্রযুক্তির অপব্যবহার—অথবা এমন কোনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যাকে বানানোর সময় মানুষ ভেবেছিল সে তার চাকর বানাচ্ছে।
মানুষ বিলুপ্ত হলে AI পৃথিবী শাসন করবে— এ কথাও নিশ্চিত করে বলা যায় না।
AI-রও বিদ্যুৎ দরকার। ডেটা সেন্টার দরকার। চিপ দরকার। ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা দরকার। নষ্ট যন্ত্র বদলাতে হয়। খনি থেকে ধাতু তুলতে হয়। কারখানায় যন্ত্রাংশ বানাতে হয়। আজকের পৃথিবীতে এই বিশাল ব্যবস্থার প্রায় সবটাই মানুষ তৈরি করে, মানুষ চালায়।
তাই এমনও হতে পারে, মানুষের পরে AI-র সাম্রাজ্য হবে না।
মানুষ চলে যাওয়ার কিছুদিন পর একে একে পাওয়ার গ্রিড বন্ধ হবে। ডেটা সেন্টারের পাখা থামবে। সার্ভারের আলো নিভবে। পৃথিবীর সর্বশেষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাটি হয়তো কোনও অন্ধকার ঘরে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করবে পরের নির্দেশের জন্য।
কেউ নির্দেশ দেবে না।
তারপর সেটিও নিভে যাবে।
পৃথিবী আবার চুপ হয়ে যাবে।
তারপর এক লক্ষ বছর।
দশ লক্ষ বছর।
এক কোটি বছর।
গাছপালা শহর ঢেকে ফেলবে। ভবন ভাঙবে। রাস্তা মাটির নিচে যাবে। সমুদ্রের তলদেশ বদলাবে। মহাদেশ সরে যাবে।
মানুষের লেখা বই থাকবে না।
ধর্মগ্রন্থ থাকবে না।
সংবিধান থাকবে না।
জাতীয় পতাকা থাকবে না।
ফেসবুক থাকবে না।
কবিতা থাকবে না।
নোবেল পুরস্কারের তালিকাও থাকবে না।
থাকবে কিছু হাড়।
প্লাস্টিকের স্তর।
কংক্রিট।
অদ্ভুত কিছু ধাতু।
তেজস্ক্রিয় পদার্থের চিহ্ন।
হয়তো কোনও চিপের জীবাশ্মসদৃশ অবশেষ।
তারপর পৃথিবীতে আবার কোনও বুদ্ধিমান প্রাণীর বিবর্তন ঘটতে পারে।
ঘটতেই হবে, এমন কোনও কথা নেই।
কিন্তু ধরা যাক ঘটল।
ধরা যাক আজ থেকে পাঁচ কোটি বছর পরে কোনও প্রাণী দুই পায়ে হাঁটল, অথবা আট পায়ে; আমাদের মতো চোখ থাকল, অথবা চোখই থাকল না। তারা ভাষা আবিষ্কার করল। বিজ্ঞান আবিষ্কার করল। ভূতত্ত্ব শিখল। একদিন মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে তারা একটা অদ্ভুত হাড় পেল।
তারপর আরেকটা।
তারপর একটি শহর।
তাদের প্রত্নতত্ত্ববিদেরা সাবধানে মাটি সরাবে।
তারা আবিষ্কার করবে, বহু কোটি বছর আগে পৃথিবীতে এক অদ্ভুত প্রজাতি বাস করত।
প্রজাতিটির নাম Homo sapiens।
তারা হয়তো আমাদের জাদুঘরে রাখবে।
একটি কাচের বাক্সে মানুষের কঙ্কাল দাঁড় করানো থাকবে। পাশে থাকবে আমাদের বানানো একটি মোবাইল ফোন, একটি বন্দুক, একটি কবিতার বই, একটি পরমাণু বোমার মডেল, আর কোনও প্রাচীন ডেটা সেন্টার থেকে পাওয়া পোড়া চিপ।
নিচে লেখা থাকবে—
HOMO SAPIENS
একসময় পৃথিবীর প্রধান প্রযুক্তিনির্ভর প্রাণী।
ভাষা, শিল্প, চিকিৎসা, গণিত ও উন্নত যন্ত্র নির্মাণে সক্ষম ছিল।
নিজেদের গ্রহের প্রায় সর্বত্র বসতি স্থাপন করেছিল।
বিলুপ্তির কারণ এখনও গবেষণাধীন।
কোনও ছোট বাচ্চা তার মায়ের হাত ধরে কঙ্কালটির দিকে তাকাবে।
জিজ্ঞেস করবে,
—এরা এত বুদ্ধিমান ছিল, তবু বিলুপ্ত হলো কেন?
মা হয়তো উত্তর জানবে না।
বিজ্ঞানীরাও হয়তো হাজার বছর ধরে তর্ক করবে। জলবায়ু? যুদ্ধ? পারমাণবিক অস্ত্র? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা? মহামারি? নাকি সব মিলিয়ে?
শেষ পর্যন্ত তারা হয়তো আমাদের বিলুপ্তির স্তরটির একটি নাম দেবে।
যেমন আমরা ক্রিটেশিয়াসের শেষে ডায়নোসরদের হারিয়ে যাওয়ার চিহ্ন খুঁজি, তারা খুঁজবে আমাদের।
আমাদের দাঁত মাপবে।
আমাদের করোটি মাপবে।
আমাদের শহরের ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করবে।
আর সম্ভব হলে আমাদের ভাষার কিছু অংশ উদ্ধার করবে।
সেখানেই হয়তো তারা সবচেয়ে বিস্মিত হবে।
কারণ তারা আবিষ্কার করবে —
এই প্রাণীটি নিজের নাম রেখেছিল sapiens।
অর্থাৎ,
জ্ঞানী।
পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কোনও জাদুঘরে আমাদের কঙ্কালের সামনে দাঁড়িয়ে সেই অচেনা প্রাণীরা হয়তো তখন প্রথমবার হাসবে।
অথবা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকবে।
