আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়েছে ৫ম নিউ ইয়র্ক ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ফেয়ার অ্যান্ড চেম্বার অ্যানুয়াল বিজনেস এক্সপো ২০২৬। বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ছয়জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে এবারের মেলায় প্রদান করা হয় মর্যাদাপূর্ণ ‘ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’।
বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ৫ম নিউ ইয়র্ক ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ফেয়ার অ্যান্ড চেম্বার অ্যানুয়াল বিজনেস এক্সপো ২০২৬ (5th New York International Trade Fair & Chamber Annual Business Expo 2026)। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৩০ মিনিটে ম্যানহাটনের বোরো অব ম্যানহাটন কমিউনিটি কলেজ (BMCC), ১৯৯ চেম্বার্স স্ট্রিটে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই মেলা ও এক্সপোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারকরণ এবং বিশ্ববাজারে যৌথ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরিতে এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। মেলায় যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, চীন, নেপাল ও পাকিস্তানসহ প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশের বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, প্রদর্শক, চেম্বার প্রতিনিধি ও পেশাজীবীরা অংশগ্রহণ করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ-ইউএস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ (MD, FASN), গ্রেটার নিউ ইয়র্ক চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট ও সিইও মার্ক জ্যাফে এবং ইউ.এস. স্মল বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের Administrator কেলি লফলার। তাঁদের অংশগ্রহণ উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ব্যবসার বিকাশ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির গুরুত্বকে তুলে ধরে।

কেলি লফলার তাঁর বক্তব্যে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের প্রতি গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে।

উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল বাংলাদেশি-আমেরিকান বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা ও পেশাজীবীদের সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। তিনি বাংলাদেশ-ইউএস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এবং গ্রেটার নিউ ইয়র্ক চেম্বার অব কমার্সের দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বের জন্য মার্ক জ্যাফে ও অ্যামিট শাহকে ধন্যবাদ জানান। ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেন, বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটি সংখ্যায় তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, শিক্ষা, ব্যবসা ও কমিউনিটি উন্নয়নে তাদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তিনি ফজলুর রহমান খান, সালমান খান, জাওয়েদ করিম, ড. আবুল হুসাম, আবদুস সাত্তার খান, ড. এম. জাহিদ হাসান এবং সৈয়দ জাকি হোসাইনের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাফল্যের উদাহরণ তুলে ধরেন।

তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিকভাবে লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং উল্লেখ করেন যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। একই সঙ্গে বাংলাদেশও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ করছে। তিনি এই এক্সপোকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে উল্লেখ করেন। গ্রেটার নিউ ইয়র্ক চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট ও সিইও মার্ক জ্যাফে তাঁর বক্তব্যে চেম্বারের ২৫ বছরের Chamber Business EXPO আয়োজনের অভিজ্ঞতা এবং গত পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশ-ইউএস চেম্বারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই এক্সপো বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরির পাশাপাশি বড় ব্যবসা এবং ছোট ও উদীয়মান ব্যবসাগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

মেলায় বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী ও ব্যবসায়ীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় ব্যবসায়ী, বাংলাদেশি-আমেরিকান ব্যবসায়ী, বাংলাদেশি ব্যবসায়ী এবং ভারত, চীন, নেপাল, পাকিস্তানসহ প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা মেলা ও সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন। এর ফলে বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ এবং নতুন ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়। মেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ ছিল বিজনেস-টু-বিজনেস ম্যাচমেকিং (Business-to-Business Matchmaking) কার্যক্রম। এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা সম্ভাব্য ক্রেতা, বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়িক অংশীদার ও সেবা প্রদানকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পান। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের পণ্য ও সেবা উপস্থাপন, নতুন বাজার সম্পর্কে ধারণা নেওয়া, ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ পায়।

মেলায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার ও ব্যবসায়িক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য Global Investment, Banking, Finance & Remittances Forum 2026, যেখানে বিনিয়োগ, ব্যাংকিং, অর্থায়ন ও রেমিট্যান্স খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও AI, কৌশলগত সোর্সিং ও সাপ্লাই চেইন, NRB বিনিয়োগ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কিং অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬ (International Business Excellence Awards 2026)। ব্যবসা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কমিউনিটি সেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ছয়জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন:
-
মি. সৈয়দ জাকি হোসাইন, সমাজসেবী ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মডার্ন প্যাকেজিং ইনক, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
-
মি. লিয়াকত হোসাইন, প্রতিষ্ঠাতা, অ্যাডভান্স ফার্মাসিউটিক্যাল ইনক, যুক্তরাষ্ট্র
-
প্রকৌশলী আবুবকর হানিপ, চেয়ারম্যান ও চ্যান্সেলর, WUST এবং প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, PeopleNTech
-
মি. কাজী হেলাল আহমেদ, প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (IFDC), যুক্তরাষ্ট্র
-
মি. গোলাম ফারুক ভূঁইয়া, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, GFB Group, যুক্তরাষ্ট্র
-
ড. আরিফুর রহমান, চেয়ারম্যান, প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি, ঢাকা, বাংলাদেশ
এই সম্মাননা তাদের ব্যবসায়িক অগ্রগতি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রদান করা হয়েছে।

এক্সপোতে বাংলাদেশি এবং ইউএসএর প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পণ্য ও সেবা আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের ক্রেতা, ব্যবসায়িক অংশীদার, বিনিয়োগকারী, পেশাজীবী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যবসা ও পণ্যের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ এবং প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই এক্সপো আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। প্রদর্শনী, সেমিনার, ব্যবসায়িক বৈঠক, নেটওয়ার্কিং এবং ম্যাচমেকিংয়ের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানের সুযোগ পাচ্ছেন।

আয়োজকরা মেলায় অংশগ্রহণকারী সকল ব্যবসায়ী, প্রদর্শক, স্পন্সর, বিশিষ্ট অতিথি, চেম্বার প্রতিনিধি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতায় International Trade Fair & Chamber Business Expo 2026 আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধির একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
