বাংলাদেশের আসন্ন সংসদ নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক ধোঁয়াশা ধীরে ধীরে কিছুটা পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। যদিও এখনো বহু প্রশ্নের জবাব অমীমাংসিত, তবু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তৎপরতা, কূটনৈতিক বার্তা, নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি এবং ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলগুলোর অবস্থান বিশ্লেষণ করলে একটি সম্ভাব্য চিত্র ফুটে উঠছে।
গত কয়েক মাস ধরে নির্বাচনের সময়সূচি, অংশগ্রহণমূলকতা এবং গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলেছে। একদিকে ক্ষমতাসীন দল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কথা তুলে ধরে নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে অনড় অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি নিরপেক্ষ পরিবেশ ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলে নির্বাচন বর্জনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা হালনাগাদ, সীমানা নির্ধারণ ও নির্বাচনী আচরণবিধি চূড়ান্ত করার কাজে দৃশ্যমান গতি এনেছে, যা নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের চাপ ও পর্যবেক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা বারবার তুলে ধরেছে। কূটনৈতিক তৎপরতা ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নির্বাচন প্রসঙ্গের ঘনঘটা থেকে বোঝা যাচ্ছে, নির্বাচন আর শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে।
বিরোধী দলের ভেতরেও একক অবস্থান নেই। কেউ কেউ আন্দোলনের মাধ্যমে দাবিদাওয়া আদায়ের পক্ষে থাকলেও, আবার একটি অংশ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভেতরে থেকেই রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার যুক্তি দিচ্ছে। এই দ্বিধা বিরোধী রাজনীতিকে কিছুটা দুর্বল করলেও একই সঙ্গে আলোচনার নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেষ মুহূর্তে সমঝোতার কোনো পথ বের হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাড়তে পারে, যা নির্বাচনকে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য রূপ দিতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, সম্ভাব্য সময়সূচি মাথায় রেখেই মাঠ প্রশাসনকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নির্বাচনী সহিংসতার ঝুঁকি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব মোকাবিলায় আলাদা পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা ও ফল ঘোষণার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর কথাও আলোচনায় আছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা পুরোপুরি কাটেনি।তবে অনিশ্চয়তার ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে একটি স্পষ্ট দিগন্ত ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। নির্বাচন নির্ধারিত সময়েই হবে—এই ধারণা শক্ত হচ্ছে, তবে সেটি কতটা অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হবে, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সংলাপের সম্ভাবনা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার ওপর। এই মুহূর্তে দেশ দাঁড়িয়ে আছে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। তবে ডক্টর ইউনূসের প্রশাসন ও ইলেকশন কমিশন যেকোনোভাবে বদ্ধপরিকর-ঘোষিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে। ইতোমধ্যে প্রার্থীদের হালনাগাদ তথ্য ও আনুসাঙ্গিক বিষয়াদী বেশ কঠোরভাবেই দেখভাল করতে শুরু করেছে। নির্বাচনের দিন-ক্ষণ এগিয়ে আসতেই আরও কিছু পরিবর্তন চোখে পড়বে বলে ধারণা করছেন বোদ্ধামহল।
