রুবেল মিয়া এসি–ফ্রিজ মেকানিক। গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ। এক সময় নিজের গ্রাম টঙ্গীবাড়ি ছেড়ে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন একেবারে খালি হাতে। না ছিল পুঁজি, না ছিল নিশ্চিত কোনো আশ্রয়। জীবনের প্রয়োজনে কখনো ফুটপাতে রাত কাটিয়েছেন, কখনো পরিচিত-অপরিচিত মানুষের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। জীবিকা খুঁজতে এক পর্যায়ে পাড়ি জমান দুবাইতেও। কিন্তু প্রবাসের স্বপ্ন সেখানে বারবার ভেঙে গেছে। কাজের নামে, ভিসার নামে, সুযোগের নামে বহু মানুষের দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন তিনি। তবু ভেঙে পড়েননি।

ঢাকায় ফিরে আবার শুরু করেন এসি ও ফ্রিজ মেরামতের কাজ। বাংলামোটর পুকুরপাড়ে একটি ছোট খুপরি দোকানই ছিল তার সবকিছু। জায়গা ছিল সংকীর্ণ, যন্ত্রপাতি সীমিত, আয়ও অনিশ্চিত। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার ভেতরেও তিনি কখনো ছাড় দেননি নিজের আচরণে আর কাজে। গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলতেন বিনয়ের সঙ্গে, সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, আর যে কাজের দায়িত্ব নিতেন—তা শেষ না করে ফিরতেন না। সময়মতো কাজ শেষ করা, কাজের পরও কোনো সমস্যা হলে ফোন ধরার মানসিকতা—এই কমিটমেন্টই ধীরে ধীরে তাকে আলাদা করে তুলতে থাকে।
রুবেল মিয়ার কাজের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ছিল তার ব্যবহার আর সততা। এক গ্রাহক আরেক গ্রাহককে তার নাম বলতেন। কেউ এসি ঠিক করাতে এসে ফ্রিজের কাজও দিয়ে যেতেন, কেউ আবার দূরের আত্মীয়ের বাসায় কাজের জন্য তাকে ডাকতেন। এভাবেই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে কাজের চাপ, বাড়তে থাকে বিশ্বাস।

এক সময় বুঝতে পারেন, একা সব সামলানো সম্ভব নয়। তখনই তিনি নিজের মতো করে কয়েকজন তরুণকে কাজে যুক্ত করেন। কাউকে শেখান এসি সার্ভিসিং, কাউকে ফ্রিজ রিপেয়ারিং। মালিক হিসেবে নয়, সহকর্মী হিসেবেই তিনি তাদের সঙ্গে চলেন। সময়মতো বেতন, শেখার সুযোগ আর সম্মান—এই তিনটি জিনিস তিনি নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন সব সময়।
আজ সেই রুবেল মিয়া আর খুপরি দোকানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। তিনি এখন একটি বড় দোকানের মালিক। আধুনিক যন্ত্রপাতি, সুসজ্জিত কর্মপরিবেশ আর নিয়মিত গ্রাহক—সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন তিনি। তার প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ৮ থেকে ১০ জন কর্মচারী কাজ করছেন। শুধু নিজের জীবনই বদলায়নি, বদলেছে আরও কয়েকটি পরিবারের ভবিষ্যৎ। বাংলামো্টর ঢাল অর্থাৎ পুকুরপাড় রোডে আরেকটি শো রুম চালু করেছেন তিনি। ৫ জানুয়ারি সোমবার রাতে ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এলাকার গণমান্যদের নিয়ে নতুন শো রুম উদ্বোধন করেন তিনি।

রুবেল মিয়ার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির গল্প আসলে শুধু আর্থিক সাফল্যের গল্প নয়। এটি ধৈর্য, পরিশ্রম আর আত্মসম্মানের গল্প। প্রতারণা, ব্যর্থতা আর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়েও যে সততা আর কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা মানুষকে সামনে এগিয়ে নেয়—রুবেল মিয়া তার জীবন্ত প্রমাণ। ছোট একটি দোকান থেকে বড় ব্যবসা গড়ে তোলার এই যাত্রা অনেক তরুণের জন্যই হতে পারে নীরব এক অনুপ্রেরণা।
