সোমবার,

২৯ জুন ২০২৬

|

আষাঢ় ১৪ ১৪৩৩

XFilesBd

তিনদিনের এ অনুষ্ঠান আলো ছড়ালো বহুমাত্রিক

চরনিকেতনে নববর্ষের শোভাযাত্রা ও সাহিত্য আসর: সংস্কৃতির নবজাগরণের সূচনা

নিজস্ব সংবাদদাতা, পাবনা থেকে

প্রকাশিত: ০১:৫৫, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

আপডেট: ১৯:২৪, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

চরনিকেতনে নববর্ষের শোভাযাত্রা ও সাহিত্য আসর: সংস্কৃতির নবজাগরণের সূচনা

পাবনার চরনিকেতন প্রাঙ্গণে ওসাকা (OSACA) আয়োজিত সাহিত্য উৎসব বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন বছর এক ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছেযেখানে সাহিত্য, সংস্কৃতি নাগরিক চেতনার এক সমন্বিত রূপ প্রত্যক্ষ করেছে জেলার মানুষ। সময়ের পরিবর্তনে যখন গ্রামীণ শহুরে সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে, তখন এই আয়োজন যেন সেই ব্যবধান ঘুচিয়ে এক নতুন সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের ইঙ্গিত দিয়েছে।

উৎসবের সূচনা ঘটে ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই। চরনিকেতনের বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ তখন লাল-সাদা রঙে সেজে ওঠেবাংলা নববর্ষের চিরায়ত প্রতীকী রূপে। সকাল আটটার দিকে শুরু হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, যা দ্রুতই উৎসবের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। শোভাযাত্রায় অংশ নেয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন, স্থানীয় শিল্পী সাধারণ মানুষ। কারও হাতে পালকি, কারও হাতে মুখোশ, কেউবা আবার গ্রামীণ জীবনের প্রতীকী উপকরণ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। ঢোল, কাঁসর, বাঁশির তালে তালে এগিয়ে চলা এই শোভাযাত্রা যেন বহন করে বাঙালির বহু শতাব্দীর সাংস্কৃতিক স্মৃতি।

উন্নয়ন সংস্থা ওসাকার প্রধান নির্বাহী পরিচালক কবি গল্পকার উপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক মজিদ মাহমুদের তত্ত্বাবধানে দুই বাংলার সাহিত্যিকেরা তুলে ধরেন বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্যের বহুমাত্রিক ধারণা। দিনভর কবিতা আবৃত্তি, ডকুমেন্টারি প্রদর্শন, বিষয়ভিত্তিক আলোচনা-সমালোচনা ও সঙ্গীতের মুর্ছনা ছড়িয়ে পড়ে বহুদূর। 

শোভাযাত্রা শেষে আয়োজিত হয় উদ্বোধনী পর্ব। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বাংলা নববর্ষের তাৎপর্য, সাহিত্যচর্চার প্রয়োজনীয়তা এবং বর্তমান প্রজন্মের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন, “শুধু উৎসব পালন করলেই হবে না, এর ভেতরের চেতনা ধারণ করতে হবেযেখানে মানবতা, সহমর্মিতা সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে।

উদ্বোধনী পর্বের পরপরই শুরু হয় সাহিত্য আসর, যা ছিল আয়োজনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এই পর্বে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কবি লেখকরা তাঁদের সৃষ্টিকর্ম পাঠ করেন। কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধবিভিন্ন ধারার সাহিত্য উপস্থাপনায় উঠে আসে সমকালীন সমাজের নানা চিত্র, ব্যক্তিগত অনুভূতি জাতীয় চেতনার প্রতিফলন। বিশেষ করে তরুণ লেখকদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য, যা প্রমাণ করে যে নতুন প্রজন্মও সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী এবং তারা নিজেদের বক্তব্য প্রকাশের জন্য একটি মঞ্চ খুঁজছে।

এই সাহিত্য আসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিলমুক্ত আলোচনাপর্ব, যেখানে উপস্থিত দর্শকরাও অংশগ্রহণের সুযোগ পান। সাহিত্য সমাজ, প্রযুক্তির প্রভাব, পাঠাভ্যাসের পরিবর্তনএমন নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। অনেকেই মত দেন যে, ডিজিটাল যুগে বইয়ের প্রতি আগ্রহ কমে গেলেও সাহিত্যচর্চার প্রয়োজনীয়তা কমেনি; বরং নতুন মাধ্যমের মাধ্যমে তা আরও বিস্তৃত হতে পারে।

উৎসবের প্রথমার্ধেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়; বরং একটি চিন্তার প্ল্যাটফর্ম, যেখানে অতীত বর্তমানের মধ্যে সংলাপ সৃষ্টি হচ্ছে। চরনিকেতন প্রাঙ্গণ যেন একদিনের জন্য রূপ নেয় একটি মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়েযেখানে বই, গান, আলোচনা মানুষের মিলনেই গড়ে ওঠে এক নতুন বোধের জগৎ।

এই আয়োজনের পেছনে ওসাকার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একটি স্বেচ্ছাসেবী সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে তারা দীর্ঘদিন ধরে পাবনা অঞ্চলে সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে। এবারের আয়োজন তাদের সেই প্রচেষ্টারই একটি বিস্তৃত রূপ, যেখানে স্থানীয় উদ্যোগ জাতীয় পরিসরে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

প্রথম পর্বের সমাপ্তিতে বলা যায়, উৎসবের সূচনা এবং সাহিত্যকেন্দ্রিক আয়োজনই প্রমাণ করেছেপাবনার মাটিতে এখনও সাহিত্য সংস্কৃতির শক্ত ভিত রয়েছে।

এই ভিতকে আরও সুদৃঢ় করতে প্রয়োজন ধারাবাহিক উদ্যোগ, যা হয়তো এই ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়েই সম্ভব। আলোচনায় অন্যদের মধ্যে অংশ নেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ডীন ও বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ডক্টর শেখ মুহ. রজিকুল ইসলাম, কলকাতার কবি মানিক পণ্ডিত, বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও প্রকাশনা সংস্থা প্রকৃতির কর্ণধার কবি সৈকত হাবিব, নোঙর সম্পাদক প্রফেসর হাসানুজ্জামান, সাংবাদিক ও গবেষক ড. অখিল পোদ্দার, প্রফেসর ড. আনোয়ারুল হক, জাহাঙ্গীর ফিরোজ প্রমুখ।