রাজধানীর আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলকে সমস্যার সর্বোত্তম সমাধান মনে করছে না বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক, হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএইচসিডিএ)। সংগঠনটির অফিস সম্পাদক আরিফ মাহমুদ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ মতামত তুলে ধরা হয়। বিবৃতিতে বিপিএইচসিডিএর মহাসচিব ডা. এ এম শামীম আদ-দ্বীন হাসপাতালের সাম্প্রতিক ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই মর্মান্তিক ঘটনায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সহানুভূতি জানানো হচ্ছে। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক, বেদনাদায়ক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। তদন্তের মাধ্যমে যদি কোনো ধরনের অবহেলা বা দায়িত্বে ঘাটতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও করা উচিত।
লাইসেন্স বাতিল স্থায়ী সমাধান নয়
বিবৃতিতে বলা হয়, একটি নির্দিষ্ট ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করে দেওয়া সমস্যার কার্যকর সমাধান নয়। বরং এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর, যারা ব্যয়বহুল হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের সামর্থ্য রাখেন না। সংগঠনটির মতে, দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে রোগীদের চিকিৎসা প্রাপ্তি ব্যাহত না হয় এবং একই সঙ্গে সেবার মানও নিশ্চিত করা যায়।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ তুলে ধরল বিপিএইচসিডিএ
বিপিএইচসিডিএ জানায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ও চিকিৎসাজনিত জটিলতার ঘটনা ঘটে থাকে। তবে এসব ক্ষেত্রে সাধারণত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, ত্রুটি নিরূপণ, সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর নীতিমালা ও তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়নের স্বার্থে বাংলাদেশেও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন বলে মনে করে সংগঠনটি।
শর্তসাপেক্ষে কার্যক্রম চালুর সুযোগ দেওয়ার আহ্বান
বিবৃতিতে বলা হয়, আদ-দ্বীন হাসপাতালকে প্রয়োজনীয় তদারকি, নির্দেশনা এবং সংশোধনমূলক শর্তসাপেক্ষে পুনরায় কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। সংগঠনটির মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তা যেন বিধিসম্মত, স্বচ্ছ এবং বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনার ভিত্তিতে হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
তদন্ত কমিটিতে প্রতিনিধি না থাকায় ক্ষোভ
এদিকে, ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বেসরকারি হাসপাতাল মালিকদের সংগঠনটি। বিবৃতিতে তারা বলেন, সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিশনে বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএইচসিডিএ) কোনো প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যা তাদের কাছে উদ্বেগের বিষয়। সংগঠনটির নেতারা মনে করেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের তদন্ত ও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে বাস্তবসম্মত, ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর সুপারিশ প্রণয়ন সহজ হবে। উল্লেখ্য, গত ২৭ মে রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। নোটিশের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় গত ১১ জুন হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের চূড়ান্ত আদেশ জারি করা হয়।
