শুক্রবার,

১২ জুন ২০২৬

|

জ্যৈষ্ঠ ২৮ ১৪৩৩

XFilesBd

রাজনীতিকদের বিশ্লেষণ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট: উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনায় বাস্তবায়নের শঙ্কা ও রাজনৈতিক বিতর্ক

সুব্রত সরকার

প্রকাশিত: ০৬:১২, ১২ জুন ২০২৬

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট: উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনায় বাস্তবায়নের শঙ্কা ও রাজনৈতিক বিতর্ক

নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পরপরই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে এই বাজেট পেশ করার পর থেকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে। অধিকাংশ দলই এই বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী’ ও ‘বাস্তবতা-বিবর্জিত’ বলে অভিহিত করেছে, তবে কেউ কেউ এর কিছু ইতিবাচক দিককেও স্বীকৃতি দিয়েছে।

বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রধান প্রশ্ন

প্রস্তাবিত এই বাজেটের আকার নিয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী তীব্র সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, “এই বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয়।” তার মতে, রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করা অসম্ভব। ফলে সরকার উন্নয়ন বাজেট (এডিপি) এমনকি বেতন-ভাতার জন্যও ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, সঠিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির নির্দেশনার অভাবে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর কৌশল না থাকায় এই বাজেট বেসরকারি খাতের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করবে।

ন্যাশনাল কনফারেন্স পার্টির (এনসিপি) ‘ছায়া বাজেট কমিটি’র প্রধান আতিক মুজাহিদ এমপি বাজেটটিকে ‘বাস্তবতা-বিবর্জিত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি দাবি করেন, সরকার আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতির কথা বললেও প্রকৃত ঘাটতি সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রায় অন্তত ২ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি থেকে যেতে পারে বলে তিনি মনে করছেন।

কর্মসংস্থান ও জনকল্যাণে ঘাটতি

বামপন্থি দলগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) মনে করে, বাজেটে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক খাতগুলো অবহেলিত রয়ে গেছে। বাসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন ও সিপিবির নেতৃবৃন্দ বাজেটকে ‘ফাঁপা’ এবং ‘গণবিরোধী’ বলে বর্ণনা করেছেন। তারা বলেন, কালো টাকা সাদা করার পুরনো প্রক্রিয়া বহাল রাখা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, যা দেশের বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দেবে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) বাজেটটিকে কেবল একটি ‘রাজনৈতিক চমকবাজি’ হিসেবে দেখছে। বিগত অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার প্রসঙ্গ টেনে তারা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছে। তবে মোবাইল ফোন উৎপাদন ও প্রযুক্তি পণ্যে কর কমানোর মতো কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপকে তারা সাধুবাদ জানিয়েছে।

মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও সংস্কারের তাগিদ

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক মনে করেন, বাজেটে জনপ্রত্যাশা পূরণের এক ধরনের ‘আধাআধি প্রচেষ্টা’ থাকলেও, বিশাল ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণের নির্ভরতা সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। একইভাবে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বাজেটটিকে ‘আশাবাদে ভারাক্রান্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন বা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতিতে কেবলই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি।

এদিকে, বাংলাদেশ ন্যাপের নেতৃত্ব মনে করে, বিশাল এই বাজেট বাস্তবায়নে যদি কঠোর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা হয়, তবে অর্থের অপচয় ও দুর্নীতির আশঙ্কা থেকে যাবে। তারা সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন। বাজেট ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন মহলে প্রতিক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা মহানগর জামায়াত নতুন বাজেটকে ‘গণবিরোধী ও গণনিপীড়ক’ আখ্যা দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। এই বাজেটের প্রভাব ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক কর্মসূচি আরও জোরদার হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে, যার অংশ হিসেবে শুক্রবার বিভিন্ন দলের বিক্ষোভ কর্মসূচি রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বাজেটের বিশাল ঘাটতি মেটানো। এখন দেখার বিষয়, ভঙ্গুর অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকার কতটা স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার পথে এগিয়ে যেতে পারে।